আগামী জাতীয় বাজেটে ব্যক্তিশ্রেণীর করমুক্ত আয়সীমা ৪ লাখ টাকা থেকে বৃদ্ধি করে সাড়ে ৪ লাখ টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব দিয়েছে ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন দ্য ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার্স অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এফবিসিসিআই)।
গতকাল বিকালে রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁওয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) পরামর্শক কমিটির ৪৪তম সভায় এ প্রস্তাব তুলে ধরেন এফবিসিসিআই সভাপতি মাহবুবুল আলম। এনবিআর ও এফবিসিসিআই এ সভার আয়োজন করেছে।
এ সময় এফবিসিসিআই সভাপতি বলেন, ‘দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য সহায়ক পরিবেশকে আরো সুদৃঢ় ও জোরদার এবং চলমান বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা, দেশের বিনিয়োগ ও উৎপাদনশীল খাতকে দৃঢ় ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত দেখতে চান ব্যবসায়ীরা। সেই লক্ষ্যে শিল্প ও বিনিয়োগবান্ধব বাজেট প্রণয়ন করতে হবে। এ সরকার চতুর্থবারের মতো দায়িত্ব গ্রহণ করায় আগামী বাজেটকে ঘিরে জনগণের ব্যাপক প্রত্যাশার সৃষ্টি হয়েছে। অর্থনৈতিক উন্নয়নের ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে একটি জনমুখী ব্যবসাবান্ধব বাজেট প্রণীত হবে বলে আশা করছি।’
ব্যবসায়ীদের ওপর থেকে করের বোঝা কমানো, আমদানীকৃত কাঁচামাল ও মধ্যবর্তী পণ্যসহ শিল্প উপকরণের ওপর আরোপিত অগ্রিম আয়কর (এআইটি), আগাম কর (এটি) প্রভৃতি প্রত্যাহার, ব্যাংক ঋণের সুদহার হ্রাসসহ আমদানি পণ্যের যথাযথ শুল্কায়ন এবং পণ্য খালাসের জটিলতা দূর করতে রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় অটোমেশন বাস্তবায়নের প্রস্তাব তুলে ধরেন মাহবুবুল আলম। পাশাপাশি কর হার কমিয়ে আয়কর ও মূসকের আওতা সম্প্রসারণ করে রাজস্ব আয় বাড়ানো, সক্ষম ব্যক্তিদের করের আওতায় আনার মাধ্যমে ট্যাক্স-জিডিপি অনুপাত বৃদ্ধি এবং রফতানিতে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়াতে স্থানীয় বাজার থেকে সংগৃহীত পণ্য, কাঁচামাল ও সেবা ক্রয়কে ভ্যাটের আওতামুক্ত রাখার আহ্বান জানান এফবিসিসিআই সভাপতি।
আর্থিক খাতের শৃঙ্খলা ও সুশাসন নিশ্চিতকরণে ব্যাংকিং কমিশন গঠন কিংবা ব্যাংক খাত সংস্কার কর্মসূচি গ্রহণের ওপর গুরুত্ব দেন মাহবুবুল আলম। সেই সঙ্গে মূল্যস্ফীতি এবং মানুষের প্রকৃত আয় বিবেচনায় রেখে আগামী জাতীয় বাজেটে ব্যক্তি শ্রেণীর করমুক্ত আয়সীমা ৪ লাখ টাকা থেকে বৃদ্ধি করে সাড়ে ৪ লাখ টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব দেন তিনি।
মাহবুবুল আলম বলেন, ‘বর্তমান পরিস্থিতিতে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও বাজার মনিটরিং, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, রেমিট্যান্স প্রবাহ, রফতানি বৃদ্ধি, বহুমুখীকরণ, সম্প্রসারণ ও নতুন বাজার সংযোজন, মানব সম্পদ উন্নয়ন ও উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, সুদের হার এবং আর্থিক ও ব্যাংক খাতের সংস্কার, ট্রেড ফ্যাসিলিটেশন কার্যক্রম জোরদারকরণ, ট্যাক্স-জিডিপি রেশিও বৃদ্ধিকরণ, রাজস্ব নীতির সংস্কার এবং মুদ্রা ও রাজস্ব নীতির মধ্যে সমন্বয়, সর্বস্তরে সুশাসন এবং সর্বোপরি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাই জাতীয় অর্থনীতিতে প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে পরিলক্ষিত হচ্ছে।
শুল্ক, মূসক ও আয়কর কর্মকর্তাদের কর ফাঁকি বের করতে পুরস্কার দেয়া হয়। এর ফলে আইনের অপপ্রয়োগ হয়। অনেক সৎ ব্যবসায়ী ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই সরকারি কর্মকর্তাদের স্বেচ্ছা ক্ষমতা কমানোর জন্য পুরস্কার প্রথা বাতিল করে বিকল্প প্রণোদনার ব্যবস্থা করার প্রস্তাব তুলে ধরা হয়। ইএফডি মেশিনকে অধিক কার্যকর করতে অনলাইন ট্র্যাকিংয়ের আওতায় আনার প্রস্তাব করা হয়।
সভায় প্রধান অতিথি অর্থমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী বলেন, ‘দেশ আরো এগিয়ে যাবে। আরো উন্নতি হবে। সেই লক্ষ্যেই আমরা কাজ করছি। আজকের সভায় আপনারা পাবলিকলি আপনাদের কথাগুলো তুলে ধরতে পেরেছেন। আমরা আপনাদের সুচিন্তিত মতামতগুলো অবশ্যই বিবেচনা করব। আমাদের কাজগুলো সবসময় চলমান। কোনো কিছুরই শেষ কথা নেই। আমাদের প্রধানমন্ত্রী সবার কথাই শুনতে চান। যার যেটা ন্যায্য পাওনা সেটা নিশ্চিত করতে চান। সেই লক্ষ্যে তিনি সারা দেশে উন্নয়নকাজ বাস্তবায়ন করছেন।’
দেশের অর্থনীতিকে মজবুত করতে রফতানি বহুমুখীকরণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন বিশেষ অতিথি অর্থ প্রতিমন্ত্রী ওয়াসিকা আয়শা খান। তিনি বলেন, ‘কর ন্যায়পাল নিয়োগের বিষয়টি ভেবে দেখা যেতে পারে। বিভিন্ন সমস্যা মোকাবেলা করেই দেশের অর্থনীতি এগিয়ে যাচ্ছে। এর সঙ্গে আপনারা সবাই সম্পৃক্ত। বেসরকারি খাত আসলে বাংলাদেশের অর্থনীতির চালিকাশক্তি। আজ যে আলোচনাগুলো হলো সেগুলো প্রণিধানযোগ্য। আশা করি জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সেগুলো আমলে নেবে। আমাদের রফতানিমুখী হতে হবে। নয়তো ডলার সংকট কমবে না। রফতানি বাড়লেই ডলার আসবে।
সভায় সভাপতিত্ব করেন এনবিআরের চেয়ারম্যান আবু হেনা মো. রহমাতুল মুনিম। তিনি বলেন, ‘যেখানে যেটা প্রযোজ্য, আমরা সেটা সমন্বয় করব। কিছু ক্ষেত্রে ইচ্ছা থাকলেও আমরা অবারিত সুবিধা দিতে পারি না। কারণ আমার ঘাড়ে রেভিনিউ কালেকশনের লোড রয়েছে। আমরা মুখে বলি উন্নত দেশ হব, কিন্তু উন্নত দেশের যে রেভিনিউ প্র্যাকটিস, রেভিনিউ লোড, সেটা আমরা মানি না। এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন মানে কিন্তু সক্ষমতা বৃদ্ধি। সুবিধার জায়গাগুলো সংকুচিত করে আনার জন্য আমাদের ওপর উন্নয়ন অংশীদারদের চাপ রয়েছে। সেটা গ্রহণ করার জন্য আমাদের মানসিক প্রস্তুতি থাকতে হবে। উন্নত দেশ হতে চাইলে আমাদের সক্ষমতা বাড়াতে হবে। ব্যবসায়ীদের মধ্যে কোনো অসন্তোষ থাকলে সেগুলো সমাধানে এনবিআর কাজ করবে বলেও জানান তিনি।
বিকেএমইএর নির্বাহী সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, ‘বাংলাদেশের কর ব্যবস্থাই বিনিয়োগ ও ব্যবসার পরিপন্থী। রিসাইকেলের ওপর ভ্যাট প্রত্যাহার চান বিটিএমএ সভাপতি মোহাম্মদ আলী খোকন।’ বারবিডা সভাপতি হাবিব উল্লাহ ডন অবচয় বাড়িয়ে ৫০ শতাংশ করার দাবি জানান।
সভায় ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন এফবিসিসিআইয়ের সিনিয়র সহসভাপতি মো. আমিন হেলালী। এ সময় অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন এফবিসিসিআইয়েরর সাবেক সভাপতি মাহবুবুর রহমান, সহসভাপতি রাশেদুল হোসেন চৌধুরী (রনি), মো. মুনির হোসেন প্রমুখ।










