মার্কিন ট্রেজারি বন্ড বাজারের অনিশ্চয়তা কমাতে বাণিজ্য অংশীদারদের ওপর ডোনাল্ড ট্রাম্পের চাপানো উচ্চ শুল্কহার ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে বলে প্রত্যাশা করছেন বন্ড বাজারে বিনিয়োগকারীদের অনেকে। তাদের মতে, অতিরিক্ত আমদানি শুল্ক থেকে পাওয়া রাজস্ব সরকারি ব্যয় নির্বাহ, হ্রাসকৃত কর পূরণ ও সার্বভৌম ঋণ (সভরেন ডেট) নিয়ন্ত্রণে রাখতে সহায়ক হবে। যদিও অর্থনীতিবিদদের বড় একটি অংশ বলছেন, এ শুল্কহার স্বল্পমেয়াদে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের রাজস্ব বাড়াবে ঠিকই। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে আমদানি হ্রাস, ভোক্তা ব্যয় বৃদ্ধি ও চাহিদায় পতন, মূল্যস্ফীতি এবং আমদানি কমিয়ে দেয়ার মাধ্যমে ওয়াশিংটনের রাজস্ব আহরণে আরো বড় চাপের কারণ হয়ে উঠতে পারে। এর ধারাবাহিকতায় সরকারের ঋণচাপ বেড়ে বন্ড বাজার আরো অস্থিতিশীল হয়ে পড়ার আশঙ্কাকেও উপেক্ষা করতে পারছেন না বিশেষজ্ঞরা।
ট্রাম্পের শুল্কবিবাদ বছরের প্রথম প্রান্তিকে (জানুয়ারি-মার্চ) মার্কিন বন্ড বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। যদিও বাজার মনোভাবে এখন কিছুটা পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। অনেক বিনিয়োগকারীই এখন মনে করছেন, আরোপিত বাড়তি শুল্ক যুক্তরাষ্ট্র সরকারের ঋণ পোর্টফোলিও ব্যবস্থাপনাকে আরো সহজ করে তুলবে।
গত এপ্রিলে ডোনাল্ড ট্রাম্প বাণিজ্য সহযোগীদের ওপর বিস্তৃত মাত্রায় শুল্ক ধার্য করেন। তবে মার্কিন অর্থনীতি নিয়ে উদ্বেগ বেড়ে যাওয়ায় এক পর্যায়ে কিছু শুল্ক স্থগিতও করেন তিনি। আগস্টে দেশটিতে নতুন হারে শুল্ক কার্যকর হয়েছে। কোনো কোনো দেশের ওপর আরোপিত শুল্কহার ৫০ শতাংশ, এমনকি ক্ষেত্রবিশেষে পণ্যভেদে ৬০ শতাংশও ছাড়িয়েছে।
বাজারে বিনিয়োগকারীদের অনেকেরই ধারণা, আমদানি বাণিজ্য থেকে যুক্তরাষ্ট্রে বছরে কয়েকশ বিলিয়ন ডলার রাজস্ব আহরণ হবে, যা দেশটির সরকারের আয় বাড়িয়ে ঋণ গ্রহণের প্রবণতায় লাগাম টেনে ধরবে। যদিও অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এটি স্বল্পমেয়াদে রাজস্ব বাড়ালেও দীর্ঘমেয়াদে বাজারকে অস্থিতিশীল এমনকি যুক্তরাষ্ট্র সরকারকে আরো ঋণগ্রস্ত করে তুলতে পারে।
ন্যাটঅ্যালায়েন্স সিকিউরিটিজের ইন্টারন্যাশনাল ফিক্সড ইনকাম বিভাগের প্রধান অ্যান্ডি ব্রেনার বলেন, ‘সংক্ষিপ্ত সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে সরকারি ঋণ কমাতে পারে শুল্ক রাজস্বের ব্যবহার। তবে ঝুঁকি যে নেই, তা নয়। যদি হঠাৎ করে এ শুল্ক আহরণ বন্ধ হয়ে পড়ে বা কমে যায়, তাহলে সরকারি ব্যয় নির্বাহ ও ঋণ পরিশোধের নতুন উপায় খুঁজতে হবে। এতে বাজার আরো অস্থিতিশীল হওয়ার পাশাপাশি সরকারি ঋণের পরিমাণ বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি দেখা দিতে পারে।’
যুক্তরাষ্ট্রের গত মাসে কংগ্রেশনাল বাজেট অফিস (সিবিও) এক পূর্বাভাসে জানিয়েছিল, ডোনাল্ড ট্রাম্প আরোপিত শুল্ক কার্যকর থাকলে আগামী দশকে মার্কিন সরকার ৪ ট্রিলিয়ন বা ৪ লাখ কোটি ডলার রাজস্ব পাবে। এটি ট্রাম্পের আলোচিত ‘ওয়ান বিগ বিউটিফুল বিল অ্যাক্ট’ বাবদ হ্রাসকৃত করের বিপরীতে রাজস্ব আহরণ বাড়াতে সাহায্য করবে বলে প্রত্যাশা সিবিওর। পূর্বাভাস অনুসারে, একই সময়ের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ঋণ বাড়বে ৪ লাখ ১০ হাজার কোটি ডলার।
অর্থনীতিবিদদের বড় একটি অংশের মতে, ডোনাল্ড ট্রাম্প যেসব দেশের ওপর শুল্কহার অতিমাত্রায় বাড়িয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের মোট আমদানির বড় অংশে ওই দেশগুলোর অবদান অন্যদের চেয়ে বেশি। দেশটির ভোক্তা ও শিল্পপণ্যের বড় একটি অংশের সরবরাহ এসব দেশ থেকে আসে। দেশগুলো থেকে আমদানীকৃত পণ্যের ওপর অতিরিক্ত শুল্কের চাপ শেষ পর্যন্ত মার্কিন ভোক্তাদেরই বহন করতে হবে।
ইয়েল বাজেট ল্যাবের তথ্যানুযায়ী, ট্রাম্প প্রশাসনের আরোপিত শুল্কের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ একটি খানার বার্ষিক গড় ব্যয় বাড়তে পারে অন্তত ২ হাজার ৪০০ ডলার। ট্রাম্পের শুল্কনীতি আরোপের আগে চলতি বছরের এপ্রিল-জুলাই পর্যন্ত চার মাসেই পণ্য আমদানিনির্ভর সাধারণ ছোট ব্যবসাগুলোর গড় শুল্কচাপ বেড়েছে ৯০ হাজার ডলারের বেশি। এ হারে চলতে থাকলে এসব ব্যবসার বার্ষিক শুল্কচাপ বাড়ার পরিমাণ দাঁড়াতে পারে ১ লাখ ডলারে। ট্রাম্পের শুল্কনীতি পূর্ণরূপে কার্যকর হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে সামনের দিনগুলোয় ছোট ব্যবসা ও ভোক্তাদের ব্যয়চাপ আরো ব্যাপক মাত্রায় বেড়ে যেতে পারে। এ পরিস্থিতিতে ভোক্তা চাহিদা কমে যুক্তরাষ্ট্রে পণ্য আমদানি ব্যাপক হারে কমে যাওয়ার জোর আশঙ্কা রয়েছে। সেক্ষেত্রে চাপে পড়ে যেতে পারে আমদানি শুল্ক বাবদ রাজস্ব আহরণও। ফলে ট্রাম্পের শুল্কনীতি প্রয়োগের মাধ্যমে সরকারি ব্যয় নির্বাহে ঋণনির্ভরতা কমার বিষয়টি নিয়েও রয়েছে বড় ধরনের সংশয়। সেক্ষেত্রে বন্ড বাজারে অস্থিতিশীলতা না কমে বরং আরো বেড়ে যেতে পারে। শুল্ক থেকে কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় রাজস্ব আহরণ করতে না পারলে যুক্তরাষ্ট্র সরকারকে বাজারে আরো ট্রেজারি বন্ড ছাড়তে হতে পারে। সেক্ষেত্রে দেশটির সরকারি ঋণ পরিস্থিতি ওয়াশিংটনের জন্য আরো প্রতিকূলে চলে যেতে পারে।
বাজারে বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগকে বাড়িয়ে দিয়েছে ফেডারেল রিজার্ভের (ফেড) ওপর ট্রাম্পের ক্রমবর্ধমান আক্রমণ। আবার এ শুল্ক ব্যবস্থা এখনো পুরোপুরি নিষ্কণ্টক নয়। সপ্তাহখানেক আগে নিউইয়র্কের এক আপিল আদালত বলেছেন, কিছু ক্ষেত্রে শুল্ক আরোপ করতে গিয়ে প্রেসিডেন্টের এখতিয়ারের সীমা অতিক্রম করে গেছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। এর আগে একই রায় দিয়েছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের ইন্টারন্যাশনাল ট্রেড কোর্ট। অবশ্য হোয়াইট হাউজ সুপ্রিম কোর্টে না যাওয়া পর্যন্ত এ শুল্ক কার্যকর রাখার অনুমতি দিয়েছেন আপিল আদালত। এ রায়ের কারণে গত মঙ্গলবার ও বুধবার যুক্তরাষ্ট্রে বন্ড বাজারে অস্থিরতা দেখা যায়।
আন্তর্জাতিক দুই ঋণমান সংস্থা এসঅ্যান্ডপি ও ফিচ জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের ঋণমান নির্ধারণের জন্য তারা এখন দেশটির শুল্ক রাজস্ব আহরণের দিকে মনোযোগ বাড়িয়েছে। বিশ্বের শীর্ষ অর্থনীতির ঋণমান কমিয়ে দেয়ার সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে বিষয়টি প্রভাব ফেলেছে বলে জানিয়েছে সংস্থা দুটি।
তবে শেষ পর্যন্ত এ শুল্ক যুক্তরাষ্ট্রে রাজস্ব আহরণ বাড়াতে পারে বলে আশাবাদী ম্যাকয়ার গ্রুপের গ্লোবাল রেটস স্ট্র্যাটেজিস্ট থিয়েরি উইজম্যান। তিনি বলেছেন, ‘ট্রাম্পের শুল্কের বড় একটি অংশ যদি আদালত বাতিল করে দেয়, এতে কিছু বিশ্লেষক খুশি হবেন। কারণ এতে মূল্যস্ফীতি কমবে। প্রবৃদ্ধি বাড়বে এবং ফেড মুদ্রানীতি শিথিলের দিকে আরো মনোযোগী হতে পারবে। তবে ঋণ ও বাজেট ঘাটতির দিক থেকে বন্ড মার্কেটে অস্থিরতার আশঙ্কাও রয়েছে।










