আন্তর্জাতিক বাণিজ্য করিডর ও বাজারের গতিপ্রকৃতিও দ্রুত বদলাচ্ছে। বাংলাদেশ ভৌগোলিকভাবে চীন ও ভারতের নিকটবর্তী হওয়ায় আন্তঃএশীয় বাণিজ্যপ্রবাহে অনুকূল অবস্থানে রয়েছে। ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিস্থিতি উন্নত করা গেলে এ দেশের প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে। এ সুযোগকে কাজে লাগাতে হবে। রাজধানীর একটি হোটেলে গতকাল এক আলোচনা সভায় এ কথা বলেন বক্তারা। ‘‌বাংলাদেশ অ্যান্ড দি ওয়ার্ল্ড: ইকোনমিক প্রস্পেক্টস ফর ২০২৬ অ্যান্ড বিয়োন্ড’ শীর্ষক এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে দ্য হংকং অ্যান্ড সাংহাই ব্যাংকিং করপোরেশন লিমিটেড (এইচএসবিসি)। এতে দেশের শীর্ষস্থানীয় আর্থিক প্রতিষ্ঠানের চিফ ফাইন্যান্সিয়াল অফিসার (সিএফও) ও আর্থিক খাতের পেশাদাররা অংশগ্রহণ করেন।

অনুষ্ঠানে ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন এইচএসবিসি গ্লোবাল রিসার্চের চিফ এশিয়া ইকোনমিস্ট ও কো-হেড ফ্রেডরিক নিউম্যান। তিনি বলেন, ‘বর্তমানে ভোক্তারা পণ্যের চেয়ে সেবায় বেশি ব্যয় করছেন। কভিড মহামারীর সময় পণ্যের চাহিদা বেড়েছিল, সেবার চাহিদা কমেছিল। এ পুনর্বিন্যাস কতদিন চলবে, তা এখনই বলা যাচ্ছে না। আশা করি পণ্য ও সেবার মধ্যে ব্যয়ের ভারসাম্য ধীরে ধীরে ফিরবে। বৈশ্বিক বাণিজ্যের এ প্রবাহে বাংলাদেশের সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে। যদিও অবকাঠামোগত ঘাটতি রয়েছে। যদি দেশের করভিত্তি বাড়ানো ও রাজস্ব আহরণ জোরদার করে অপচয় কমানো যায়, তাহলে আর্থিক খাত টেকসই হবে। এছাড়া এলডিসি উত্তরণের পর বাংলাদেশ কতটা দক্ষতার সঙ্গে বাণিজ্য সুবিধা ও প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বজায় রাখতে পারে তার ওপরও অনেক কিছু নির্ভর করছে।’

ফ্রেডরিক নিউম্যান আরো বলেন, ‘গত কয়েক বছরে নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করেও বাংলাদেশ দৃঢ়তার সঙ্গে এগিয়েছে। এইচএসবিসির পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৫ শতাংশ এবং পরবর্তী বছরে সাড়ে ৫ শতাংশ হতে পারে। ২০২৬ পঞ্জিকাবর্ষে রফতানি আয়ের প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ১ শতাংশ হতে পারে। আনুষ্ঠানিক চ্যানেলে আস্থা বাড়ার ফলে রেমিট্যান্স প্রবাহও প্রতি বছর বাড়ছে। মূল্যস্ফীতি প্রশমনের সঙ্গে মিলিতভাবে এটি ব্যক্তি খাতের ভোগ ব্যয়কে সহায়তা করবে। সদ্যসমাপ্ত জাতীয় নির্বাচনের পর দেশী ও বিদেশী বিনিয়োগ ধীরে ধীরে বাড়তে পারে, তবে এর গতি অনেকাংশে নির্ভর করবে নতুন সরকার আইন-শৃঙ্খলা জোরদার ও বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠায় কতটা সক্ষম হয় তার ওপর।’

অনুষ্ঠানে শুভেচ্ছা বক্তব্য দেন এইচএসবিসি বাংলাদেশের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মো. মাহবুব উর রহমান। তিনি বলেন, ‘২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বের নবম বৃহত্তম ভোক্তা বাজারে পরিণত হবে বাংলাদেশ। একই সঙ্গে এ সময় শীর্ষ ৩০ অর্থনীতির একটি হিসেবে উঠে আসার সম্ভাবনাও রয়েছে। এর পরও দেশের আর্থিক খাতে এখনো নানা চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় বাড়ছে, তারল্য সংকটও তীব্র হচ্ছে। ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় আরো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। আর্থিক দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যবসার ব্যয়, মুদ্রা বিনিময় হার ও সুদহার বৃদ্ধি এবং ঋণের চাহিদা কমে যাওয়া, সব মিলিয়ে আর্থিক খাতে একটি জটিল পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এর সহজ কোনো সমাধান আছে বলেও মনে হয় না।’

মো. মাহবুব উর রহমান আরো বলেন, ‘বিশ্ববাণিজ্য আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি বৈশ্বিক হয়েছে। নিয়ার-শোরিং ও প্রতিযোগিতামূলক সুবিধার বিষয়টি সামনে এলেও শুল্ক, দ্বিপক্ষীয় অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য চুক্তি এবং মুক্ত বাণিজ্য চুক্তিগুলো এখন প্রতিযোগিতার কাঠামোকে সরাসরি প্রভাবিত করছে। বাণিজ্য করিডর ও বাজারের গতিপ্রকৃতিও বদলে যাচ্ছে। যেমন বর্তমানে দ্রুততম বর্ধনশীল বাণিজ্য করিডর হয়ে উঠছে উপসাগরীয় অঞ্চল ও চীনের মধ্যকার করিডরগুলো। একই সঙ্গে আন্তঃএশীয় বাণিজ্যপ্রবাহ ও বৈশ্বিক বাণিজ্য প্রবৃদ্ধির বড় অংশ এখন এশিয়ায়ই হচ্ছে। চীন ও ভারতের ভৌগোলিক অবস্থান নিকটবর্তী হওয়ায় বাংলাদেশ একটি অনুকূল অবস্থানে রয়েছে। এ সুযোগগুলো কাজে লাগাতে হবে।’

সভায় আরো বক্তব্য দেন এইচএসবিসি বাংলাদেশের সিএফও জিগনেশ রূপারেল, দি ইনস্টিটিউট অব কস্ট অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অ্যাকাউন্ট্যান্টস অব বাংলাদেশের (আইসিএমএবি) প্রেসিডেন্ট কাউসার আলমসহ দেশী-বিদেশী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সিএফও ও অংশীদাররা।