বৈরী আবহাওয়ার কারণে লাতিন আমেরিকার দেশগুলোয় ভুট্টা উৎপাদন লম্বা সময় ধরেই বিপর্যয়ের মুখে। এতে বিশ্ববাজারে কৃষিপণ্যটির সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে। এর মধ্যেই নতুন উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে ইউক্রেন সংকট। এ পরিস্থিতিতে আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে যুক্তরাষ্ট্রের ভুট্টা।

বাজার গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর তথ্য বলছে, বাজারে সংকট ও মূল্যবৃদ্ধির আশঙ্কা তীব্র হয়ে উঠছে। আমদানিকারক দেশগুলো ভুট্টার সরবরাহ নিশ্চিতে অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে। সংকট থেকে উত্তরণের লক্ষ্যে অনেক দেশই যুক্তরাষ্ট্র থেকে ভুট্টা আমদানি বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে।

এসঅ্যান্ডপি গ্লোবাল প্লাটসের খাদ্যশস্য ও তেলবীজ বিশ্লেষণ বিভাগের প্রধান পিটার মেয়ার বলেন, লাতিন আমেরিকাজুড়ে ভুট্টা উৎপাদন অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে। নতুন করে যুক্ত হয়েছে রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে রাজনৈতিক অস্থিরতা। পরিস্থিতি যখন নেতিবাচক দিকে মোড় নিচ্ছে, তখন আশার আলো দেখাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। চলতি ২০২১-২২ মৌসুমে দেশটির ভুট্টা রফতানি মার্কিন কৃষি বিভাগের (ইউএসডিএ) করা প্রাক্কলনের তুলনায় ৫ শতাংশ বাড়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

তথ্য বলছে, ব্রাজিল ও আর্জেন্টিয়ায় আবাদের প্রথম ধাপে ভুট্টা উৎপাদন রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছনোর পূর্বাভাস মিলেছিল। গবেষকরা তখন দেশগুলোয় আগাম বৃষ্টিপাতের প্রত্যাশা করছিলেন। কিন্তু ভুট্টার ফলন আসার সবচেয়ে উপযুক্ত সময়ে দেশগুলোয় আবারো ভয়াবহ আকার ধারণ করে খরা। ফলে উৎপাদন পূর্বাভাস কমাতে বাধ্য হন সংশ্লিষ্টরা।

যদিও বছরের প্রথমার্ধে ব্রাজিল তুলনামূলক কম ভুট্টা রফতানি করে। দ্বিতীয়ার্ধে রফতানি বেড়ে যায়। তবে এবার ভুট্টার স্বল্প মজুদ নিয়েই বছর শুরু করেছে ব্রাজিল। কারণ গত বছর খরার কারণে দেশটিতে উৎপাদন বিপর্যয়ের মুখে পড়ে। আশঙ্কাজনক হারে কমে ভুট্টার মজুদ। স্বল্প মজুদের কারণে চলতি বছর শুধু প্রথমার্ধেই নয়, দ্বিতীয়ার্ধেও দেশটির রফতানি ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

ইউএসডিএ জানায়, ২০২১-২২ বিপণন মৌসুমে যুক্তরাষ্ট্র ৩৮ কোটি ৩৯ লাখ ৪০ হাজার টন ভুট্টা উৎপাদন করতে সক্ষম হবে। এ মৌসুমে দেশটির রফতানি দাঁড়াবে ৬ কোটি ১৬ লাখ টনে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কিছুদিন আগে ইউএসডিএ যুক্তরাষ্ট্রের ভুট্টা রফতানি পূর্বাভাস কমিয়ে এনেছিল। কারণ তখন অন্যান্য দেশের সঙ্গে রফতানি প্রতিযোগিতা ছিল তীব্র। তবে দক্ষিণ আমেরিকা বৈরী আবহাওয়ার কবলে পড়ায় এ প্রতিযোগিতা কমেছে। অন্যদিকে শীর্ষ দুটি ভুট্টা উৎপাদক দেশ রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে বিরোধ দেখা দেয়ায় এসব দেশের রফতানিও বাধার মুখে পড়তে পারে। এ সুযোগ ভালোভাবেই কাজে লাগাতে চায় যুক্তরাষ্ট্র।

চীন বিশ্বের শীর্ষ ভুট্টা আমদানিকারক দেশ। ইউক্রেন থেকে দেশটি সবচেয়ে বেশি ভুট্টা আমদানি করে। বর্তমানে দুই দেশের মধ্যে ভুট্টা বাণিজ্য স্থিতিশীল বলে জানিয়েছেন বিশ্লেষকরা। তবে ইউক্রেন ইস্যুতে মস্কোর আগামী পদক্ষেপের ওপরই বাণিজ্য নির্ভর করছে। পণ্যবাজার বিশেষজ্ঞ টেরি রেইলি বলেন, রাশিয়ার সঙ্গে বিরোধের জেরে ইউক্রেনের ভুট্টা রফতানি বাধাগ্রস্ত হলে চীন যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে স্থানান্তর হবে।

এদিকে আগামী দশকে ভুট্টার বৈশ্বিক ব্যবহার ২৫ শতাংশ বাড়ার পূর্বাভাস মিলেছে। সম্প্র্রতি রাবোব্যাংক এক প্রতিবেদনে এ পূর্বাভাস দিয়েছে। ভুট্টা বাণিজ্যের ক্ষেত্রে আরো শক্তিশালী প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দিয়েছে নেদারল্যান্ডসভিত্তিক আর্থিক সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানটি।

রাবোব্যাংকের খাদ্যশস্য ও তেলবীজ বিভাগের ঊর্ধ্বতন বিশ্লেষক মার্সেলা মারিনি বলেন, আগামী দশকে ভুট্টা আবাদের ক্ষেত্রে বিশ্বের শীর্ষস্থানে অবস্থান করবে দক্ষিণ আমেরিকা। আমাদের প্রত্যাশা, ২০৩০ সালের মধ্যে শীর্ষ চার রফতানিকারক দেশে ভুট্টা উৎপাদন ১৫ কোটি ৯০ লাখ টন বেড়ে ৬৮ কোটি ২০ লাখ টনে উন্নীত হবে।