যেদিন নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য ভূষিত হলো জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি), সেদিনই
বিশ্ব খাদ্যনিরাপত্তার জন্য এক সতর্কবার্তা দিল যুক্তরাষ্ট্র কৃষি বিভাগ। তাদের প্রতিবেদন বলছে, শস্যের সরবরাহ কমে যাচ্ছে বলে বিশ্বে খাদ্যনিরাপত্তাহীনতা ও বৈষম্যের সংকট প্রকট রূপ ধারণ করতে পারে। খবর ব্লুমবার্গ।
যুক্তরাষ্ট্র কৃষি বিভাগ মাসের সেপ্টেম্বর মাসের পর্যবেক্ষণ শেষে শুক্রবার প্রতিবেদন পেশ করে। তাতে আশঙ্কা প্রকাশ করে বলা হয়, বিশ্বে সয়াবিনের মজুদ প্রত্যাশার তুলনায় অনেক কম থাকবে, গমের চালান নিয়ে বিশ্বে প্রতিযোগিতার সৃষ্টি হবে এবং শুষ্ক আবহাওয়া দক্ষিণ আমেরিকা ও ইউরোপের বহু অঞ্চলে শস্যের আবাদ হুমকির মুখে ফেলে দেবে।
সব সূচক মিলিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বৈশ্বিক খাদ্যমূল্য বাড়তেই থাকবে, পর্যাপ্ত পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ হয়ে পড়বে বেশ ব্যয়বহুল, কেননা মহামারীর কারণে বহু মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়েছে এবং দেশে দেশে অর্থনীতিতে নেমে এসেছে হাহাকার।
ঠিক গত সপ্তাহেই বৈশ্বিক খাদ্যমূল্য নিয়ে এক হিসাবে জাতিসংঘ বলেছে, সেপ্টেম্বরে বৈশ্বিক খাদ্যমূল্য বেড়েছে ২ দশমিক ১ শতাংশ। এর পেছনে মূলত ভূমিকা রেখেছে শস্য আর সয়াবিন তেল। সেপ্টেম্বরে ভোজ্যতেলের গড় মূল্যসূচক দাঁড়িয়েছে ১০৪ দশমিক ৬ পয়েন্ট, আগের মাসের তুলনায় যা বেড়েছে ৬ শতাংশ। এ নিয়ে টানা চার মাস ধরেই আন্তর্জাতিক বাজারে ভোজ্যতেলের দাম বাড়তির দিকে রয়েছে। সেপ্টেম্বরে ভোজ্যতেলের গড় মূল্যসূচক গত জানুয়ারির পর সর্বোচ্চে উঠেছে। এর কারণ বিশ্বজুড়ে মহামারীর প্রকোপ। তাই গত মাসে বাজারে পামওয়েল, সূর্যমুখী তেল ও সয়াবিন তেল সব পণ্যের দামই বাড়তির দিকে ছিল।
জানুয়ারি থেকে দাম বাড়ার পর এখনো সেই ধারায় রয়েছে এবং অনেক পণ্যের দামই গত কয়েক বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। যুক্তরাষ্ট্র কৃষি বিভাগ বলছে, চীনের আমদানি পরিকল্পনার কারণে দামের এ ঊর্ধ্বগতি অব্যাহত থাকতে পারে। বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল দেশ চীন আরো বেশি সয়াবিন ও গম আমদানি করবে, যা বৈশ্বিক ব্যালান্সশিটকে আঁটসাঁট করে তুলবে। চীন গম আমদানি করবে যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স ও অস্ট্রেলিয়া থেকে।
কভিড-১৯ মহামারীর প্রভাবে বিশ্বজুড়ে খাদ্য অপনিরাপত্তা নিয়ে সতর্কবার্তা থাকায় খাদ্যমূল্য বাড়তির দিকেই রয়েছে। সব মিলিয়ে এ বছর বিশ্বজুড়ে ১৩ কোটি ২০ লাখ মানুষ ক্ষুধার কবলে পড়তে পারে। এর মধ্যে এমন কিছু অঞ্চল থাকবে যারা চিরাচরিতভাবে অনেকটা সংহত।
বৈশ্বিক শস্য ও তৈলবীজ সরবরাহ তুলনামূলকভাবে ভালো থাকলেও সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের আইওয়ায় ঘূর্ণিঝড়ের কারণে ফসল প্রত্যাশার তুলনায় অনেক কম হবে। যুক্তরাষ্ট্রে ভুট্টা ও সয়াবিনের আবাদ সর্বোচ্চ পরিমাণে হলেও এখনো বহু একর জায়গায় আবাদ বাকি রয়েছে।
যদিও এসবের মধ্যে বৈশ্বিক খাদ্যনিরাপত্তার জন্য সুখবর হলো রাশিয়ায় গমের বাম্পার ফলনের পূর্বাভাস। ২০২০-২১ মৌসুমে দেশটিতে ৮ কোটি ৩০ লাখ টন গম উৎপাদিত হবে বলে পূর্বাভাসে জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র কৃষি বিভাগ। এটা ইতিহাসের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ গমের আবাদ। যদিও যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, ইউক্রেন ও আর্জেন্টিনায় গমের ফলন কমবে। আর্জেন্টিনা ও ইউক্রেনের শুষ্ক আবহাওয়ার কারণে ফলন কম হবে বলে পূর্বাভাসে বলা হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগোয় ভোগ্যপণ্যের দামের ঊর্ধ্বগতি দেখা গেছে। সেখানে বিনিয়োগকারীরা অতিরিক্ত মুনাফা করার সুযোগ লুফে নিচ্ছেন। নভেম্বর মাসের জন্য সয়াবিনের মূল্য ২ দশমিক ৮ শতাংশ বেড়ে হয়েছে ১০ দশমিক ৭৯ ডলার, ২০১৮ সালের মার্চের পর যা সর্বোচ্চ। আবার গত সপ্তাহে গমের মূল্য পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চে পৌঁছেছে।
বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি সতর্ক করে দিয়ে আগেই জানিয়েছে, তারা ও অন্য সংস্থাগুলো এ খাতে তাদের কাজ করার জন্য প্রয়োজনীয় আর্থিক সহযোগিতা না পেলে ‘অকল্পনীয় হারে ক্ষুধার সংকট’
তৈরি হতে পারে। তাদের সতর্কবার্তার কিছুদিনের মধ্যেই শস্য উৎপাদনের সংকট আর মূল্যবৃদ্ধির খবর আসা শুরু করল।










