বিশ্বের কোকো উৎপাদনের দুই-তৃতীয়াংশই আসে পশ্চিম আফ্রিকার দেশ ঘানা ও আইভরি কোস্ট থেকে। কিন্তু জ্বালানি তেল উত্তোলনকারী দেশগুলোর মতো তারা কোকোর দামের ওপর সেই অর্থে প্রভাব ফেলতে পারে কমই। এমনকি পণ্যটির আন্তর্জাতিক বাজারে তাদের অংশীদারিত্বও ভয়াবহভাবে কম। এই কোকোর দাম ঐতিহাসিকভাবেই এতটা কম থাকে যে ক্ষুদ্র চাষীদের জীবন-জীবিকা চালানোই কঠিন হয়ে পড়ে। তবে এখন পশ্চিম আফ্রিকার দেশগুলো কোকোর বাজারে নিজেদের অধিকার ও কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠায় মরিয়া। খবর এএফপি।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে খাতসংশ্লিষ্ট এক বিশেষজ্ঞ বলেন, একুয়েডর, ক্যামেরুন ও নাইজেরিয়ার মতো অন্য বড় কোকো উৎপাদনকারী দেশগুলোর সঙ্গে যদি তারা জোটবদ্ধ হতে পারে, তবে বাজারমূল্য নির্ধারণের ব্যাপারে তারাই সিদ্ধান্ত নিতে পারবে। যদিও এখানে সত্যিকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব রয়েছে।
২০১৯ সাল থেকে বিষয়টি নিয়ে গুরুত্বের সঙ্গে ভাবতে থাকে আবিদজান ও আক্রা। তখন তারা কোকো ও নেসলের মতো চকোলেটের মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে প্রতি টন কোকো বিনের ওপর ৪০০ ডলারের ‘লিভিং ওয়েজ প্রিমিয়াম’ আদায় করে নেয়।
কোকো আবাদকারীদের পরিবারের অত্যাবশ্যক চাহিদা ও জরুরি ব্যবস্থা নিয়ে পরিচালিত স্টাডির ভিত্তিতে ব্রিটিশ এনজিও ফেয়ারট্রেড ‘লিভিং ইনকাম রেফারেন্স প্রাইস’ বাস্তবায়নে কাজ করে। এটা ২০২০-২১ শস্য আবাদ মৌসুমের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, যা এ মাসেই শুরু হয়েছে।
এতে আইভরি কোস্টের কোকো আবাদকারীদের আয় ২০ শতাংশ বাড়বে, প্রতি কিলোগ্রামে যা ১ হাজার সিএফএ ফ্রাঙ্ক (১ দশমিক ৬৬ ডলার)। এর মধ্য দিয়ে বহু বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো পশ্চিম আফ্রিকার দুই প্রতিবেশী দেশে কোকোর দাম কাছাকাছি অবস্থানে পৌঁছে এবং আইভরি কোস্ট ও ঘানার বর্ধনশীল কোকো বাজারের অচলাবস্থারও অবসান ঘটে। বিশ্বের কোকো বাজারে আইভরি কোস্টের দখল ৪০ ভাগ আর ঘানা ২০ ভাগ নিয়ে আছে দুইয়ে।
বিশ্লেষকরা মনে করেন, কোকোর মূল্য অনেকটা অনুমাননির্ভর, যেমনটি রয়েছে আরো কিছু কৃষিপণ্যে। এখানে দামটা প্রকৃত অর্থনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন। লন্ডন ও নিউইয়র্ক স্টক এক্সচেঞ্জে চার বছর ধরে কোকোর মূল্য ২-৩ হাজার ডলারের মধ্যে ওঠানামা করেছে।
প্রকৃত অর্থে ১৯৬০-এর দশকে কোকোর যে দাম ছিল এখন তার অর্ধেক এবং ১৯৭০-এর দশকের এক-চতুর্থাংশ! বিশ্বব্যাংকের মতে, ১৯৭০-এর দশক ছিল আইভরি কোস্টের অর্থনীতির সবচেয়ে সেরা সময়, যাকে বলা হয় ‘ইকোনমিক মিরাকল’।
বাজারের অবস্থাটা ক্রেতাদের জন্য আশীর্বাদ আর গ্রীষ্মপ্রধান অঞ্চলের আবাদকারীদের জন্য অভিশাপ, যারা প্রতি বছর বৈশ্বিক কোকো ও চকোলেট শিল্পে উত্পন্ন ১০০ বিলিয়ন ডলারের মধ্যে মাত্র ৬ শতাংশ পায়।
ব্যারি ক্যালেবাউট, মন্দেলেজসহ আরো কিছু শীর্ষ বহুজাতিক কোম্পানি প্রকাশ্যেই কোকোচাষীদের ‘লিভিং ওয়েজ প্রিমিয়াম’-এর প্রতি সমর্থন জ্ঞাপন করেছে। অন্যদিকে ভোক্তারা কোকো বাণিজ্যকে ‘আরো নৈতিক’ অবস্থানে দেখতে চান বলে দাবি তুলেছেন।
ফরাসি চকোলেট গ্রুপ চিমোইয়ের চেয়ারম্যান ও উৎপাদনকারী সিন্ডিকেটের প্রেসিডেন্ট প্যাট্রিক পোইরিয়ার বলেন, আইভরি কোস্ট ও ঘানার মধ্যকার সমন্বয় খুবই ইতিবাচক ব্যাপার। বাজারে আরো শক্তিশালী হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করা এখন তাদের নিজেদের প্রয়োজনেই করতে হবে।
সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো জোট গঠনের ক্ষেত্রে সবসময় বাধার সম্মুখীন হয় কোকো উৎপাদনকারী জাতিগুলো। যদিও তারা চাইলে জ্বালানি তেল উত্তোলনকারী দেশগুলোর সংগঠন ওপেকের মতো বাজার নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম।
খাতটি একটু ভিন্নও বটে। পোইরিয়ার বলেন, একজন কোকো উৎপাদনকারী ২০ বছরের কথা চিন্তা করে গাছ লাগান। তাকে তো আর বলা যাবে না, আপনি এ বছর কম উৎপাদন করুন।
দুই দশক ধরেই প্রতি দুই বছরের মধ্যে এক বছর বৈশ্বিক শস্য উৎপাদন চাহিদার চেয়ে বেশি হয়ে যায়, যার সুযোগ নিয়ে লাভবান হয় ক্রেতারা এবং দরপতন ঘটে। আবার ভঙ্গুর ও নষ্টযোগ্য পণ্য কোকো সংরক্ষণের সুযোগও কম। এজন্য গত সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে আবিদজান ও সান পেদ্রো বন্দরে তিন লাখ টন ধারণক্ষমতার দুটি স্টোরেজ ওয়্যারহাউজ তৈরির ঘোষণা দেয় আইভরি কোস্ট।
ইন্টারন্যাশনাল কোকো অর্গানাইজেশনের সাবেক চেয়ারম্যান ফিলিপ্পে ফন্টাইন বলেন, ওপেকের সমতুল্য হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে চাইলে সব উৎপাদনকারী দেশকে অংশগ্রহণ করতে হবে।










