বৈশ্বিক বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ করিডোর পানামা ও সুয়েজ খাল। এ দুই খালে একই সময়ে চলমান পৃথক সংকট বৈশ্বিক বাণিজ্যের সরবরাহ চেইনকে হুমকিতে ফেলেছে, যা বড়দিনের আগের অর্থনীতিতে আঘাত হেনেছে। খবর ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস।

জাহাজ মালিক ও আমদানিকারকরা সতর্ক করেছেন যে পানামা খালে পানি প্রবাহ হ্রাস এবং সুয়েজ খালে ১১ হাজার ৫০০ কিলোমিটারের মধ্যে পণ্যবাহী জাহাজে ধারাবাহিক হামলা আসন্ন উৎসব মৌসুমে পণ্য পরিবহনে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে।

পানামা খালের মধ্য দিয়ে পণ্য পরিবহন করতে কয়েক মাস পর্যন্ত বিলম্ব হচ্ছে। পরিস্থিতি এমন আকার ধারণ করতে পারে যে আইফোনের মতো ইলেকট্রনিকস পণ্য যুক্তরাজ্যের বাজারে পাওয়া দুর্লভ হয়ে উঠতে পারে। এছাড়া আমদানিকারকদের পক্ষে সময়মতো বড়দিনের ডেকোরেশন-সামগ্রী পাওয়া কঠিন বলে মনে হচ্ছে। ইয়েমেনভিত্তিক বিদ্রোহীরা সুয়েজ খালের আশপাশে আক্রমণ আরো বাড়াতে পারে। এর প্রভাব পানামা খালে চলমান বিধিনিষেধের সঙ্গে মিলেমিশে ‘‌বিপর্যয়কর’ পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে।

যুক্তরাজ্যের আমদানিকারকদের সংগঠন ইনস্টিটিউট অব এক্সপোর্ট অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল ট্রেডের মহাপরিচালক মার্কো ফোরজিওন বলেন, ‘‌বড়দিনের আগে সব সরবরাহ এখানে পৌঁছবে না।’

বাণিজ্য বিশ্লেষক সংস্থা এমডিএস ট্রান্সমোডালের তথ্য অনুসারে, এ বছরের তৃতীয় ত্রৈমাসিকে পানামা বা সুয়েজ খাল অতিক্রম করার জন্য জাহাজ ভাড়ার সংখ্যা প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে।

অন্তত ১৯৫০ সালের পর থেকে চলতি বছরের অক্টোবরে পানামা খাল অঞ্চলে সবচেয়ে কম পানিপ্রবাহ ছিল। খাল কর্তৃপক্ষের মতে, এল নিনোর কারণে বিশ্বব্যাপী তাপমাত্রা এবং কম বৃষ্টিপাতে খালটি প্রভাবিত হয়েছে। কর্তৃপক্ষ প্রথমবারের মতো ক্রসিংয়ের সংখ্যা কমিয়েছে। আগামী বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত দৈনিক সর্বোচ্চ ১৮টি জাহাজ পানামা খাল পার হতে পারবে।

বিশ্বের পঞ্চম বৃহত্তম পণ্যবাহী জাহাজ কোম্পানি জার্মানির হ্যাপাগ-লয়েডের প্রধান নির্বাহী রল্ফ হ্যাবেন জ্যানসেন বলেন, ‘‌পানামা খালের কম প্রবাহ একটি গুরুতর উদ্বেগের বিষয়।’

ট্রেড অ্যানালাইসিস গ্রুপ মেরিন ট্রাফিকের তথ্য অনুসারে, ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে অন্তত ১৬৭টি জাহাজ পানামা খাল অতিক্রম করেছে, যা গত বছরের একই সময়ে ছিল ২৩৮টি।

পানামা খাল কর্তৃপক্ষের মতে, বুকিং ছাড়া জাহাজগুলো প্রশান্ত মহাসাগর থেকে আটলান্টিক পর্যন্ত ৫০ মাইল দীর্ঘ খাল অতিক্রম করতে গড়ে ১২ দশমিক ২ দিন অপেক্ষা করতে হচ্ছে। কিছু জাহাজ দুই সপ্তাহেরও বেশি সময় আটকে থাকছে।

জাহাজ পৌঁছতে বিলম্ব হওয়ায় হ্যাপাগ-লয়েড দীর্ঘ এবং আরো ব্যয়বহুল রুট বেছে নিতে বাধ্য হয়েছে। এশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলাচলকারী কমপক্ষে ৪২টি জাহাজ পানামা থেকে সুয়েজ খালে ঘুরিয়ে নেয়া হয়েছে।

যা হোক, ইয়েমেনভিত্তিক হুতিদের জাহাজের ওপর আকস্মিক আক্রমণ বিশ্ব বাণিজ্যকে শঙ্কিত করেছে। তবে হুতিরা দাবি করেছে যে তারা কেবল ইসরায়েলের সঙ্গে যুক্ত জাহাজগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করছে।

একটি ইউরোপীয় জাহাজের মালিক এবং পণ্য পরিবহন ব্যবসায়ী (আক্রমণের আশঙ্কায় প্রতিবেদনে নাম উল্লেখ করা হয়নি) বলেন, ‘‌হুতিরা কীভাবে বুঝবে কে জাহাজের মালিক? তারা ভাবতে পারে, জাহাজটি ইসরায়েলে যাচ্ছে, এটি আক্রমণ করি।’

তিনি জানান, পানামা খাল প্রায় বন্ধ রয়েছে। সুয়েজের ক্ষেত্রেও যদি একই ঘটনা ঘটে, তাহলে বিশ্বজুড়ে পণ্যসামগ্রী বিশেষ করে খাদ্যপণ্য সরবরাহ কঠিন হয়ে যাবে। তখন জাহাজ ভাড়া বাড়তে থাকবে।

হ্যাপাগ-লয়েডের প্রধান নির্বাহী রল্ফ হ্যাবেন জ্যানসেন আরো বলেন, ‘ইসরায়েলের সঙ্গে যুক্ত কোনো জাহাজ নেই আমাদের। তবে আমরা পরিস্থিতি ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করছি। প্রয়োজনে আমরা জাহাজগুলো ঘুরিয়ে নিতে দ্বিধা করব না।’

এরই মধ্যে কয়েকটি কোম্পানি জাহাজ ভাড়া বৃদ্ধি করেছে। হ্যাপাগ-লয়েড গত সপ্তাহ থেকে ইসরায়েলে পণ্য আনা-নেয়ার জন্য ৮০ ডলার পর্যন্ত ঝুঁকি সারচার্জ”ঘোষণা করেছে। এমডিএস ট্রান্সমোডাল জানায়, পানামা থেকে সুয়েজ পর্যন্ত রুট পরিবর্তন করলে নিউইয়র্ক ও সাংহাইয়ের মধ্যে ১৬ নটিক্যাল গতিতে চলাচলকারী জাহাজের জন্য পাঁচদিন অতিরিক্ত যোগ করতে হয়। আর সুয়েজ খাল এড়িয়ে আফ্রিকার উত্তমাশা অন্তরীপের রুট ব্যবহার করলে অতিরিক্ত ছয় দিন যোগ করতে হয়।