একদিকে নভেল করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে চলমান টানা লকডাউন, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে অভ্যন্তরীণ বাজারেও ইতিহাসের সর্বোচ্চ দাম—এ দুইয়ের নেতিবাচক প্রভাব পড়তে যাচ্ছে ভারতের স্বর্ণ খাতে। দেশটিতে কমতির দিকে রয়েছে স্বর্ণের চাহিদা। এর জের ধরে চলতি বছর ভারতে স্বর্ণের চাহিদা আগের বছরের তুলনায় অর্ধেকে নামতে পারে। এর মধ্য দিয়ে দেশটির বাজারে মূল্যবান ধাতুটির চাহিদা তিন দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন অবস্থানে নেমে আসার সম্ভাবনা রয়েছে। এমনটাই মনে করছে অল ইন্ডিয়া জেম অ্যান্ড জুয়েলারি কাউন্সিল। খবর বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড ও ইকোনমিক টাইমস।

প্রতিষ্ঠানটির এক নোটে বলা হয়েছে, ২০২০ সালে ভারতে স্বর্ণের সম্মিলিত চাহিদা ৩৫০-৪০০ টনের মধ্যে নেমে আসার সম্ভাবনা রয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় অর্ধেক। গত বছর দেশটিতে স্বর্ণের চাহিদা ছিল ৬৯০ টনের কিছু বেশি। একই সঙ্গে চলতি বছর ভারতে মূল্যবান ধাতুটির চাহিদা ১৯৯১ সালের পর সর্বনিম্ন অবস্থানে নামতে পারে।

অল ইন্ডিয়া জেম অ্যান্ড জুয়েলারি কাউন্সিলের চেয়ারম্যান এন আনন্দ পদ্মনন্দন বলেন, এমন পরিস্থিতিতে ভারতের স্বর্ণ খাত আগে কখনই পড়েনি। লকডাউন শুরুর পর থেকে স্বর্ণ বিক্রি কার্যত বন্ধ রয়েছে। মূল্যবান ধাতুটির চাহিদায় এ পতন নজিরবিহীন। এটা ভারতীয় স্বর্ণ খাতের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে।

নভেল করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের অংশ হিসেবে গত ২৪ মার্চ থেকে ভারতে টানা লকডাউন শুরু হয়েছে। এমন এক সময় দেশটি এ পরিস্থিতির মুখে পড়েছে, যখন বিয়েসহ সামাজিক উৎসবের মৌসুম শুরু হওয়ার কথা ছিল। লকডাউনের কারণে সব উৎসব বাতিল হয়ে গেছে। ভারতীয় স্বর্ণ শিল্পে বিয়ের মৌসুম ও ধর্মীয় উৎসবের সময়টায় চাহিদা ও বেচাকেনা তুঙ্গে থাকে। এসব উৎসবকে ঘিরে ভারতীয় জুয়েলাররা সবচেয়ে বেশি স্বর্ণ বিক্রি করেন। চলতি বছর মহামারীর কারণে উৎসব বাতিল হওয়ায় তাদের ব্যবসায় ভাটা পড়েছে। কমতে শুরু করেছে স্বর্ণের চাহিদা।

একই সঙ্গে বৈশ্বিক মহামারী আন্তর্জাতিক বাজারে নিরাপদ বিনিয়োগ উৎস হিসেবে পরিচিত স্বর্ণের দাম বাড়িয়ে দিয়েছে। বর্তমানে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি আউন্স স্বর্ণ ১ হাজার ৭৫০ ডলারের আশপাশে বিক্রি হচ্ছে। ইতিহাসের সর্বোচ্চ দাম থেকে স্বর্ণের আউন্স সাকল্যে ১৫৫ ডলার দূরে রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে ভারতের বাজারেও দাম বেড়েছে স্বর্ণের। ইতিহাসের সর্বোচ্চ অবস্থানে উঠেছে মূল্যবান ধাতুটির দাম। প্রতি ১ গ্রাম স্বর্ণ বিক্রি হচ্ছে ৪৬ হাজার ৮৭৯ রুপির (ভারতীয় মুদ্রা) ওপরে।

অল ইন্ডিয়া জেম অ্যান্ড জুয়েলারি কাউন্সিলের চেয়ারম্যান বলেন, মহামারী ও লকডাউনের কারণে মানুষের আয় কমে গেছে। অনেকেই বেকার হয়ে পড়েছেন। এ পরিস্থিতিতে মানুষ খাবার ও নিত্যপণ্য কেনার চিন্তা করছেন। তাদের মাথায় স্বর্ণের মতো বিলাসপণ্য কেনার চিন্তা একেবারেই নেই। লকডাউন উঠে গেলেও পরিস্থিতি সহসাই আগের মতো হবে না। মানুষের জীবন, জীবিকা এবং আয় নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়ে যাবে। ফলে স্বর্ণের চাহিদা বছরজুড়েই কমতির দিকে থাকতে পারে। এটা ভারতীয় স্বর্ণ শিল্পের জন্য বড় একটি চ্যালেঞ্জ।

তিনি আরো বলেন, লকডাউন ও মহামারীর কারণে এবারের বিয়ের মৌসুমের ব্যবসাটা আমরা (ভারতীয় জুয়েলাররা) ধরতে পারিনি। এখন বাকি রয়েছে দুর্গাপূজা, দীপাবলি, দশেরাসহ ধর্মীয় উৎসবগুলো। ওই সময় স্বর্ণের চাহিদা কিছুটা হলেও বাড়তে পারে। তবে বিশ্বব্যাংকসহ আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো চলতি বছর ভারতীয় অর্থনীতি শ্লথ হয়ে আসার ইঙ্গিত দিয়েছে। সম্ভাব্য এ অর্থনৈতিক শ্লথতা মানুষের আয় কমিয়ে দিলে তারা আর স্বর্ণ কিনতে চাইবে না। ফলে বছরজুড়েই মূল্যবান ধাতুটির চাহিদা কমতির দিকে থাকতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। এমনকি স্বর্ণের সম্মিলিত চাহিদা তিন দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন অবস্থানে নেমে আসতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।