ভারতীয় অর্থনীতিতে গত কয়েক বছরে গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক হয়ে উঠেছে স্টার্টআপ। আন্তর্জাতিক বাজার মন্থর হলেও ভারতীয় পরিবেশে নতুন ব্যবসা গড়ে ওঠার সূচক ঊর্ধ্বমুখী রয়েছে। ২০৩০ সালের মধ্যে ভারতীয় স্টার্টআপে বৈশ্বিক ভেঞ্চার ক্যাপিটালের বিনিয়োগ দ্বিগুণ বাড়বে। সম্প্রতি এমনটাই পূর্বাভাস দিয়েছে আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান এসঅ্যান্ডপি গ্লোবাল।
এস অ্যান্ড পি গ্লোবালের জরিপ অনুযায়ী, ২০২২ সালে স্টার্টআপের তালিকায় ভারতের অবস্থান ছিল চতুর্থ। আন্তর্জাতিক আর্থিক বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের ৪ দশমিক ২ শতাংশের গন্তব্য ছিল ভারত, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রে ছিল ৪১, চীনে ১৮ ও যুক্তরাজ্যে ৬ শতাংশ। তাছাড়া ভারতীয় স্টার্টআপ প্রতিষ্ঠানগুলো খুব দ্রুত বিপুল পুঁজি সংগ্রহ করছে সাম্প্রতিক দিনগুলোয়। অর্থনৈতিক মন্থরতা সত্ত্বেও আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলো ভারতে বিনিয়োগ করতে আগ্রহ দেখাচ্ছে। এর প্রধান কারণ দেশটির ১৪০ কোটির বিশাল জনগোষ্ঠী। ২০৩০ সালের মধ্যে দেশটি তৃতীয় বৃহৎ অর্থনীতির দেশে পরিণত হবে বলে মনে করছেন অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা।
ক্রমবর্ধমান ইন্টারনেট পরিষেবা ও সরকারি সহযোগিতার কারণে দেশে নতুন ব্যবসা গড়ে ওঠার হার বেড়েছে। ২০১৬ সালের শেষদিকে রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের হাত ধরে দেশব্যাপী ইন্টারনেটের ব্যাপক বিস্তার ঘটেছে। ২০১৫ সালে ভারতীয় মোবাইল ব্যবহারকারীদের ফোরজির আওতায় ছিল মাত্র দশমিক ৭ শতাংশ, যা ২০২১ সালের মধ্যে ৬৩ দশমিক ১ শতাংশে উন্নীত হয়। আর ইন্টারনেট পরিষেবার এ অগ্রগতি প্রভাব ফেলেছে স্থানীয় ব্যবসাকে, যারা লাখো ভোক্তার কাছে দ্রুত সময়ে পৌঁছে দিচ্ছে পরিষেবা।
বৈশ্বিক নেতিবাচক পরিস্থিতির মধ্যেও ২০২২ সালে ভারতে নতুন নিবন্ধন করা স্টার্টআপের সংখ্যা ছিল ২৬ হাজার ৫৪২টি। ২০২৩ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারির জরিপ অনুযায়ী, দেশটির শিল্প ও অভ্যন্তরীণ বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের (ডিপিআইআইটি) স্বীকৃত স্টার্টআপের সংখ্যা ৯২ হাজার। তরুণ উদ্যোক্তাদের সংখ্যা বেড়েছে ব্যাপকভাবে। কেবল ২০২১-২২ সালে দেশের অর্থনৈতিক প্রযুক্তি খাতে ৯৭০ কোটি ডলার বিনিয়োগ করা হয়েছে।
বিনিয়োগকারীরা প্রধানত ফিনটেক খাতকে সবচেয়ে প্রাধান্য দিচ্ছেন। সরকার এপিআই খাতকে সমৃদ্ধ করার জন্য সম্প্রতি ভর্তুকির ঘোষণা দিয়েছে, তার মধ্য দিয়েও গড়ে উঠছে ছোট ছোট প্রতিষ্ঠান। দ্বিতীয় প্রধান খাত হিসেবে দাঁড়িয়েছে ফুড ডেলিভারি পরিষেবা ও ই-কমার্স। বিভিন্ন অ্যাপের মাধ্যমে মধ্যবিত্ত ও নিম্ন মধ্যবিত্ত ভারতীয়রা নতুন গড়ে ওঠা উদ্যোক্তাদের থেকে পরিষেবা গ্রহণ করতে পারছেন।
দেশের বিদ্যুচ্চালিত গাড়ি (ইভি) উৎপাদন খাত উল্লেখযোগ্য হারে সম্প্রসারিত হয়েছে গত কয়েক বছরে। সরকারি লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে হলে খাতটিতে আরো ২৬ হাজার ৬০০ কোটি ডলার বিনিয়োগ প্রয়োজন চলতি দশকে। দেশটির সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে মোট উৎপাদিত গাড়ির মধ্যে ৩০ শতাংশে উন্নীত করতে চায় ইভিকে। ফলে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীরাও খাতটিতে কাজ করতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন। এছাড়া মহাকাশ প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ড্রোন, রোবটিকস ও নবায়নযোগ্য শক্তি খাতে বিনিয়োগ বাড়ছে। খাতগুলো এখনো শুরুর দিকে হলেও এর মধ্যেই সম্ভাবনাময় প্রতীয়মান হয়েছে। গড়ে উঠছে ছোট ছোট বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান। দীর্ঘমেয়াদে এপিআই খাতের প্রবৃদ্ধিও অন্যান্য উদ্যোক্তা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে সহায়তা করবে। ফার্মাসিউটিক্যাল খাতে চীনের ওপর নির্ভরতা কমাতে দেশটি নতুন স্কিম চালু করেছে উদ্যোক্তাদের সহযোগিতায়।
ভারতীয় স্টার্টআপ বাড়ার ব্যাপারে ইতিবাচক পূর্বাভাস দিয়েছেন লন্ডন চেম্বার্স অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা রিচার্ড বার্গ। তিনি বলেছেন, ‘ভারত ব্যবসা সম্প্রসারণে দারুণ এক জায়গা। কিছু প্রতিবন্ধকতা সব জায়গায়ই রয়েছে। তবে যারা ব্যবসা শুরু করতে যাচ্ছে, তাদের জন্য ভারত সুযোগ তৈরি করে দেয়।’










