যুক্তরাষ্ট্রে জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় বাড়তি কাজ করছে তরুণদের বড় একটি অংশ। বিশেষ করে জেনারেশন জেড বা জেনজি ও মিলেনিয়ালদের মধ্যে এ প্রবণতা বেশি দেখা গেছে। সাম্প্রতিক জরিপের তথ্যানুযায়ী, প্রতি ১০ জন জেনজির আটজনই মূল চাকরির পাশাপাশি বাড়তি কাজ করছে। মিলেনিয়ালদের ক্ষেত্রেও এ হার ৭৭ শতাংশ। তাদের বড় অংশ বলছেন, বাড়তি আয় ছাড়া দৈনন্দিন খরচ মেটানো সম্ভব নয়। খবর ফরচুন।
গোল্ডম্যান স্যাকসের এক নতুন জরিপে এসব তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিষ্ঠানটির সাম্প্রতিক অবসরসংক্রান্ত জরিপে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন বয়স ও আয়ের মানুষের আর্থিক পরিস্থিতি তুলে ধরা হয়েছে। এতে দেখা গেছে, জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ায় তরুণদের অনেকেই বাড়ি কেনা, অবসরের জন্য সঞ্চয়সহ গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে দোটানায় পড়ছে।
জেনজি বলতে সাধারণত ১৪-২৯ বছর বয়সীদের বোঝানো হয়। মিলেনিয়ালদের বয়স ৩০-৪৫ বছর। গোল্ডম্যান স্যাকসের জরিপে দেখা গেছে, শুধু তরুণরাই অবসর নিয়ে উদ্বিগ্ন নন। বয়স ও আয়ের বিভিন্ন স্তরের মার্কিনদের মধ্যেই অবসরের প্রস্তুতি নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে।
জরিপের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ৫৮ শতাংশ মানুষ মনে করে অবসরে যাওয়ার জন্য যথেষ্ট সঞ্চয় তাদের কাছে আছে। গত বছর এ হার ছিল ৬৮ শতাংশ। এক বছরের ব্যবধানে অবসরের পর নিশ্চিত জীবন কাটানো নিয়ে ১০ শতাংশ মানুষের আত্মবিশ্বাস কমে গেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এর পেছনে জীবনযাত্রার বাড়তি ব্যয় বড় কারণ হয়ে উঠেছে। যুক্তরাষ্ট্রে বাড়ির ঋণের সুদহার এখন গত কয়েক দশকের তুলনায় অনেক বেশি। একই সঙ্গে বাড়ির দামও অনেকের নাগালের বাইরে। এর সঙ্গে চাপ রয়েছে মূল্যস্ফীতির। একই সময় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) কারণে চাকরির বাজারের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
গোল্ডম্যান স্যাকসের মতে, বর্তমান সময়ে বাসাভাড়া ও নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচের কারণে ভবিষ্যতের জন্য অর্থ জমানো কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে মানুষ দৈনিক চাহিদা মেটাতে গিয়ে অবসরের সঞ্চয় কমিয়ে দিতে বাধ্য হচ্ছে।
গোল্ডম্যান স্যাকস অ্যাসেট ম্যানেজমেন্টের জ্যেষ্ঠ কৌশলবিদ ক্রিস সিডার জানান, সাধারণ মানুষের সঞ্চয় করার গতি থমকে গেছে।
জরিপে অংশ নেয়া কর্মীদের ৬১ শতাংশ বলছেন, তারা মূল কাজের বাইরে বাড়তি কোনো না কোনো কাজ করছেন। তবে তরুণদের মধ্যে এ হার অনেক বেশি। জেনজিদের প্রতি ১০ জনের মধ্যে আটজন একই সঙ্গে দুটি চাকরি করছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বাড়তি কাজ থেকে পাওয়া আয় তাদের অনেকের জন্য কোনো অতিরিক্ত সুবিধা নয়, বরং প্রয়োজন। জরিপে দেখা গেছে, জেনজিদের ৭৬ শতাংশ ও মিলেনিয়ালদের ৭৩ শতাংশ বলেছেন, বাড়তি আয় না থাকলে তাদের পক্ষে দৈনন্দিন খরচ মেটানো সম্ভব হতো না। অর্থাৎ মূল চাকরি থেকে পাওয়া আয় অনেকের প্রয়োজনীয় ব্যয়ের জন্যও যথেষ্ট নয়।
আর্থিক চাপের প্রভাব শুধু আয়-ব্যয়ের হিসাবেই সীমাবদ্ধ নেই। কর্মক্ষেত্রেও এর প্রভাব পড়ছে। জেনজিদের ৬৯ শতাংশ জানায়, ঋণ বা পরিবারের খরচ নিয়ে দুশ্চিন্তার কারণে কাজে মনোযোগ দিতে তাদের অসুবিধা হয়। মিলেনিয়ালদের মধ্যেও একই ধরনের প্রতিবন্ধকতার কথা বলেন ৬৭ শতাংশ।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের অর্থনৈতিক ধাক্কা। জ্বালানি তেল ও ডিজেলের ক্রমবর্ধমান মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব শেষ পর্যন্ত পড়ছে সাধারণ ভোক্তার ওপর।
ফলে যুক্তরাষ্ট্রের ভোক্তাদের আস্থা প্রায় সাড়ে ১২ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। সেপ্টেম্বরে দেশটির ভোক্তা আস্থা সূচক ৬ দশমিক ৭ পয়েন্ট কমে ৮১ দশমিক ৯-এ নেমে এসেছে, যা ২০১৪ সালের পর সর্বনিম্ন। মধ্যপ্রাচ্য সংঘাত, ক্রমবর্ধমান সুদহার ও সংকুচিত হতে থাকা শ্রমবাজার মিলে ত্রিমুখী সংকটকে এ অবনতির মূল কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন বিশ্লেষকরা।
ভোক্তা আস্থা হলো সাধারণ ক্রেতাদের চোখে দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও ভবিষ্যতে নিজের আর্থিক নিরাপত্তার মাপকাঠি। সহজ কথায়, চাকরির বাজার, আয়-উপার্জন ও নিত্যপণ্যের দাম নিয়ে সাধারণ মানুষ কতটা স্বস্তি বা দুশ্চিন্তায় আছে, তার ওপর নির্ভর করে এ আস্থা সূচক ওঠানামা করে।
চলমান মার্কিন-ইসরায়েল যুদ্ধ বিশ্বজুড়ে জ্বালানির দর বাড়িয়ে দিয়েছে। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি যুক্তরাষ্ট্রে নতুন করে উসকে দিয়েছে মূল্যস্ফীতি। এর জের ধরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে দীর্ঘ তিন বছর পর গত সেপ্টেম্বরে প্রথমবারের মতো সুদহার বাড়ায় দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভ (ফেড)।
সুদহার বৃদ্ধি ও জীবনযাত্রার চড়া খরচের প্রভাব সরাসরি গিয়ে পড়ছে যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ পরিবারের ওপর। সুপারমার্কেটের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য, পেট্রল পাম্পের জ্বালানি থেকে শুরু করে আবাসন খাতের বন্ধকি ঋণের (মর্টগেজ) সুদহারসহ সবখানেই মূল্যবৃদ্ধির ধাক্কা অনুভূত হচ্ছে। এমনকি ডিজেলের দাম এখন দেশটির ইতিহাসে সর্বকালের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছে গেছে।









