স্বাস্থ্য খাতে জিডিপির মাত্র ১ শতাংশ বরাদ্দ, অপ্রতুল অবকাঠামো, নতুন প্রযুক্তি ব্যবহারে পশ্চাৎপদতা, দক্ষ মানবসম্পদের ঘাটতি, সেবা গ্রহণে উচ্চ ব্যয়, ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এবং বিদ্যমান নীতিমালা তদারকির অভাবে খাতটিতে কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন পরিলক্ষিত হয়নি। তাই স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়নে সরকারি ও বেসরকারি খাতের সমন্বয়ের পাশাপাশি জনগণের সম্পৃক্ততাও বাড়াতে হবে। দেশীয় স্বাস্থ্যসেবায় আস্থা বৃদ্ধিতে কাঠামোগত সংস্কার ও কার্যকর প্রয়োগের বিকল্প নেই। গতকাল ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) আয়োজিত ‘বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবা খাতে আস্থা বৃদ্ধি: মান নিয়ন্ত্রণে কৌশলগত কাঠামো নিশ্চিতকরণ’ শীর্ষক সেমিনারে আলোচকরা এসব কথা বলেন।
ডিসিসিআই সভাপতি তাসকীন আহমেদের সভাপতিত্বে সেমিনারে প্রধান অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতির সভাপতি জাতীয় অধ্যাপক এ কে আজাদ খান। এতে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ইউনাইটেড হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও ঢাকা চেম্বারের সাবেক ঊর্ধ্বতন সহসভাপতি মালিক তালহা ইসমাইল বারী।
সেমিনারে স্বাগত বক্তব্যে ঢাকা চেম্বারের সভাপতি তাসকীন আহমেদ বলেন, ‘দেশে মানসম্মত ও রোগীবান্ধব সেবা নিশ্চিতে এখনো কাঠামোগত ঘাটতি রয়ে গেছে, এছাড়া সরকারি-বেসরকারি খাতে স্বাস্থ্যসেবা মানের অসমতা, প্রশিক্ষিত মানবসম্পদের ঘাটতি, অনুমোদনহীন ক্লিনিক ও ফার্মেসি, ভুল ডায়াগনস্টিক রিপোর্ট, আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারে সীমাবদ্ধতা এবং সর্বোপরি বিদ্যমান আইন বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্টদের উদাসীনতা আমাদের জনস্বাস্থ্য নিরাপত্তা ও খাতের প্রতি জনগণের আস্থাকে ক্রমাগত ক্ষতিগ্রস্ত করছে। বাংলাদেশে স্বাস্থ্য বীমা ব্যবস্থাপনার কার্যকর ব্যবহার না থাকার কারণে মোট স্বাস্থ্য ব্যয়ের প্রায় ৭৪ শতাংশ ব্যক্তিকে বহন করতে হয়। এর ফলে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের জনগোষ্ঠী আর্থিকভাবে বড় ঝুঁকিতে পড়ে। এ অবস্থায় দেশে একটি টেকসই স্বাস্থ্য ব্যবস্থা নিশ্চিতের লক্ষ্যে এ খাতে বিদেশী বিনিয়োগ, সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব জোরদার, আধুনিক চিকিৎসা প্রযুক্তি, নার্সিং, ল্যাব সায়েন্স ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনায় দক্ষ জনবল উন্নয়ন, সঠিক নীতিমালা বাস্তবায়ন এবং দক্ষ ব্যবস্থাপনার সমন্বিত প্রয়োগ অপরিহার্য। পাশাপাশি বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের স্বাস্থ্যবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিতে একটি শক্তিশালী হেলথ রেগুলেটরি ফ্রেমওয়ার্ক গড়ে তোলা জরুরি।’
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতির সভাপতি এ কে আজাদ খান বলেন, ‘আমাদের স্বাস্থ্যসেবায় বেশ অর্জন রয়েছে। তবে সামগ্রিকভাবে এ খাতে কাঙ্ক্ষিত মান নিশ্চিত করা যায়নি। দেশের স্বাস্থ্যসেবার মান উন্নত দেশগুলোর মতো নয়, এমনকি পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর চেয়েও আমরা পিছিয়ে রয়েছি। বাংলাদেশের পক্ষে এখনই ইউনিভার্সাল স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা হয়তো সম্ভব নয়। তবে আমাদের প্রাইমারি হেলথ কেয়ারের ওপর বেশি জোর দিতে হবে। এক্ষেত্রে সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে। স্বাস্থ্য খাতের ব্যবস্থাপনায় উন্নয়নের পাশাপাশি বিকেন্দ্রীকরণের কোনো বিকল্প নেই। ডিজিটাল হেলথ কেয়ার কার্যক্রম সম্প্রসারণের মাধ্যমে গ্রামীণ পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবার সম্প্রসারণ করা সম্ভব।’
সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনকালে মালিক তালহা ইসমাইল বারী বলেন, ‘স্বাস্থ্য খাতে বাংলাদেশ সরকারের জনপ্রতি বার্ষিক ব্যয় ১ হাজার ৭০ টাকা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে, দেশের প্রায় ৪৯ শতাংশ জনগণ গুণগত স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত।’
তিনি আরো বলেন, ‘যদিও বর্তমানে এ খাতের মোট বাজার প্রায় ১৪ বিলিয়ন ডলার এবং ২০৩৩ সালে এটি ২৩ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তা সত্ত্বেও স্বল্প বাজেট বরাদ্দ ও অদক্ষ ব্যবস্থাপনা, শহর ও গ্রামে স্বাস্থ্যসেবার বৈষম্য, সেবার মান ও আস্থার ঘাটতি, দক্ষ স্বাস্থ্যকর্মীর সংকট, ক্রমবর্ধমান স্বাস্থ্যসেবা ব্যয়, অপ্রতুল অবকাঠামো এবং নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার দুর্বলতা এ খাতের অন্যতম প্রতিবন্ধকতা। তুলনামূলক ভালো স্বাস্থ্যসেবার জন্য জনগণের একটি বড় অংশ অন্যান্য দেশে চিকিৎসা নিচ্ছে এবং এ বাবদ প্রতি বছর প্রায় ৫ বিলিয়ন ডলার বাইরে চলে যাচ্ছে। বিদ্যমান অবস্থার উন্নয়নে এ খাতে স্থানীয় ও বিদেশী বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং ঋণ সহায়তা প্রাপ্তির প্রক্রিয়া সহজীকরণ করতে হবে। এছাড়া অবকাঠামো উন্নয়ন, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিতকরণ, মানবসম্পদের দক্ষতা উন্নয়ন এবং বিদ্যমান নীতিমালার যুগোপযোগীকরণ করতে হবে।’
অনুষ্ঠানে গ্রিন লাইফ সেন্টারের চিফ কনসালট্যান্ট অধ্যাপক সৈয়দ আতিকুল হক বলেন, ‘যেহেতু দেশের বেশির ভাগ লোকই সরকারি খাতের হাসপাতালে চিকিৎসাসেবা নিয়ে থাকে, তাই সরকারি হাসপাতালগুলোর সর্বোত্তম মান উন্নয়ন ও নিশ্চিতের কোনো বিকল্প নেই। এ খাতের সর্বস্তরে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।’
ইউনিভার্সাল মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের চেয়ারম্যান প্রীতি চক্রবর্তী বলেন, ‘দেশীয় স্বাস্থ্য খাতের বাজার ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। আমাদের চিকিৎসা শিক্ষায় অংশ নেয়া বিদেশী শিক্ষার্থীরা প্রতি বছর ২ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করেন। যদিও কাঙ্ক্ষিত চিকিৎসার জন্য অনেক বাংলাদেশী অন্য দেশে সেবা নিয়ে থাকেন, তবু বিষয়টি নিয়ে সচেতনভাবে চিন্তার প্রয়োজন রয়েছে। এ খাতের প্রতি মানুষের আস্থা ফেরাতে সরকারি-বেসরকারি খাত ও জনগণকে একযোগে কাজ করতে হবে।’










