বাংলাদেশের সেরা রফতানিকারকদের দশমবারের মতো পুরস্কৃত করতে যাচ্ছে দ্য হংকং অ্যান্ড সাংহাই ব্যাংকিং করপোরেশন (এইচএসবিসি) বাংলাদেশ। যেকোনো যোগ্য স্থানীয় রফতানিকারক প্রতিষ্ঠান ‘এইচএসবিসি এক্সপোর্ট এক্সিলেন্স অ্যাওয়ার্ডস’-এর জন্য আবেদন করতে পারবে। এজন্য এইচএসবিসির গ্রাহক হওয়া বাধ্যতামূলক নয়। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও ঢাকায় ব্রিটিশ হাইকমিশনের পৃষ্ঠপোষকতায় এবং আর্নেস্ট অ্যান্ড ইয়ংয়ের কারিগরি সহযোগিতায় এ পুরস্কার দেওয়া হবে।
মঙ্গলবার রাজধানীর একটি পাঁচ তারকা হোটেলে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানানো হয়।
সংবাদ সম্মেলনে এইচএসবিসি বাংলাদেশের কান্ট্রি হেড অব কমিউনিকেশনস তালুকদার নোমান আনোয়ার ‘এইচএসবিসি এক্সপোর্ট এক্সিলেন্স অ্যাওয়ার্ডস ২০২৬’-এ অংশগ্রহণের নিয়মাবলি তুলে ধরেন। তিনি জানান, প্রতিবছরের ন্যায় এবারও মোট চারটি শ্রেণিতে এ পুরস্কার দেয়া হবে। তৈরি পোশাক ও বস্ত্রশিল্পে যাদের বার্ষিক রফতানি আয় ন্যূনতম ১০ কোটি ডলার; পোশাক খাতের ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ বা সংযোগ শিল্পে যাদের বার্ষিক আয় অন্তত ৫ কোটি ডলার; ইলেকট্রনিকস, চামড়া, প্লাস্টিক, আসবাব ও প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্যের মতো উদীয়মান ও অপ্রচলিত উৎপাদন খাতের যেসব প্রতিষ্ঠানের রফতানি আয় অন্তত ১ কোটি ডলার এবং উদীয়মান সেবা রফতানিকারক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে যাদের ন্যূনতম আয় ৫০ লাখ ডলার—তারা এ পুরস্কারের জন্য আবেদন করতে পারবে।
তালুকদার নোমান আনোয়ার জানান, দেশের টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে বাংলাদেশী রফতানিকারকদের অবদানের স্বীকৃতি দিতেই ২০১০ সাল থেকে এ অ্যাওয়ার্ড দেওয়া হচ্ছে। বিজয়ী নির্বাচনের ক্ষেত্রে দেশের রফতানি ও সামগ্রিক অর্থনীতিতে অবদান, সামাজিক দায়িত্ববোধ, টেকসই পরিচালন প্রক্রিয়া, বৈচিত্রায়ণ, নিয়মনীতি অনুসরণ ইত্যাদি দিকও বিবেচনা করা হবে। ২০২৬ সালের পুরস্কারের জন্য কোনো প্রতিষ্ঠান নিজেই আবেদন করতে পারবে অথবা অন্য কেউ তার হয়ে আবেদন করতে পারবে। এজন্য কোনো ধরনের এন্ট্রি ফি দিতে হবে না। আগামী ২০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত www.business.hsbc.com.bd/EEA2026 ওয়েবসাইটে গিয়ে আবেদন করা যাবে।
এইচএসবিসি বাংলাদেশের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মো. মাহবুব উর রহমান বলেন, ‘বাংলাদেশের মতো যেকোনো উদীয়মান অর্থনীতির জন্য রফতানি খাতের বহুমাত্রিক প্রভাব রয়েছে। কারণ, রফতানি হলো একটি দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তিগুলোর অন্যতম। এটি দেশের অভ্যন্তরে বিপুল কর্মসংস্থান সৃষ্টির পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রা আয় ও রিজার্ভে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে; যা দিয়ে আমরা সামগ্রিক আমদানির খরচ মেটাই। বিগত নয়টি সংস্করণে আমরা ৪০টি করপোরেট প্রতিষ্ঠানকে এ পুরস্কার দিয়েছি। এর মধ্যে ২০টি প্রতিষ্ঠানই পোশাক ও টেক্সটাইল-বহির্ভূত খাতের। এর অর্থ হলো, পোশাক ছাড়াও অন্যান্য খাতে আমাদের রফতানি সক্ষমতা রয়েছে।’
সংবাদ সম্মেলনের আগে মাহবুব উর রহমানের সঞ্চালনায় একটি থিমেটিক সেশন অনুষ্ঠিত হয়। এতে আলোচক হিসেবে অংশগ্রহণ করেন গতবারের বিজয়ী প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের চেয়ারম্যান ও সিইও আহসান খান চৌধুরী, সেমিকন্ডাক্টর ডিজাইন ও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান উলকাসেমির সিইও ও প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ এনায়েতুর রহমান এবং পোশাকশিল্প প্রতিষ্ঠান উর্মি গ্রুপের পরিচালক ও সিইও আসিফ আশরাফ।
এ সময় আসিফ আশরাফ জানান, এ মুহূর্তে জ্বালানি ও দুর্বল অবকাঠামোই রফতানি প্রসারে সবচেয়ে বড় বাধা। তিনি বলেন, নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করাই এই মুহূর্তে আমাদের প্রধান চ্যালেঞ্জ। জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা গেলে যেকোনো খাতের রফতানি আদেশ পাওয়া কোনো সমস্যাই হবে না। বাংলাদেশে নিজস্ব তুলা বা পলিমারের মতো মৌলিক কাঁচামাল না থাকা সত্ত্বেও আমরা বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক রফতানিকারক দেশে পরিণত হয়েছি। গত ৩০-৪০ বছরে আমরা আমাদের উদ্যোক্তাদের মনোভাব, কঠোর পরিশ্রমী শ্রমিক এবং সহায়ক সেবার ওপর ভর করে এই বিশ্বমানের ইকোসিস্টেম তৈরি করেছি। প্রযুক্তিগত দক্ষতা বৃদ্ধি, তরুণদের প্রশিক্ষিত করা এবং তৈরি পণ্যের মান উন্নত করাই এখন বাংলাদেশের পরবর্তী পদক্ষেপ।
মোহাম্মদ এনায়েতুর রহমান বলেন, সঠিক পদক্ষেপ নিতে পারলে আমাদের ভবিষ্যৎ অনেক উজ্জ্বল। বাংলাদেশের বিশাল তরুণ জনগোষ্ঠী রয়েছে এবং তারা যথেষ্ট মেধাবীও। তাদের সঠিকভাবে দক্ষ করে কাজে লাগানো গেলে দেশেই সেমিকন্ডাক্টর ও চিপ উৎপাদনের বিশাল সম্ভাবনা রয়েছে। প্রকৃতপক্ষে, আজ থেকে ২০ বা ৩০ বছর আগেই সেমিকন্ডাক্টর উৎপাদন বাংলাদেশে আসা উচিত ছিল। আমাদের একটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো বিদেশের মাটিতে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি প্রতিষ্ঠা করা, বিশেষ করে হাই-টেক বা উচ্চপ্রযুক্তির শিল্প নিয়ে কথা বলার ক্ষেত্রে। কারণ, আন্তর্জাতিক গ্রাহকেরা প্রায়ই ডেটা সিকিউরিটি এবং আমাদের দুর্বল ইন্টারনেট অবকাঠামো নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। এ ছাড়া বিদ্যুৎ ও অবকাঠামোর নির্ভরযোগ্যতা এখনো একটি বড় সমস্যা। কারণ, সেমিকন্ডাক্টর ডিজাইনের কাজে মাত্র ১ মিলিসেকেন্ডের জন্য বিদ্যুৎবিভ্রাট হলে টানা কয়েক দিন ধরে চলা সার্ভার প্রক্রিয়াকরণ বন্ধ হয়ে যায় এবং সবকিছু নতুন করে শুরু করতে হয়।
প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের চেয়ারম্যান ও সিইও আহসান খান চৌধুরী বলেন, ‘আমরা অনেক সময় খুব বেশি বিনয়ী বা গুটিয়ে থাকি, যার ফলে আমাদের পণ্যগুলো বিশ্ববাজারে যথাযথভাবে প্রচার ও পরিচিতি পায় না। প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ এখন বিশ্বমানের ব্র্যান্ড হওয়ার দিকে নজর দিচ্ছে। দেশের অবকাঠামো মাঝে মাঝে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়, কিন্তু আমাদের সবচেয়ে বড় সহায়ক শক্তি হলো মানুষ। আমাদের মানুষ অত্যন্ত পরিশ্রমী, মেধাসম্পন্ন এবং উদ্ভাবনী উদ্যোক্তা মনোভাবাপন্ন। ব্যবসা করার জন্য মানবসম্পদই সবচেয়ে বড় শক্তি। মানুষ যদি ইতিবাচক চিন্তা করতে শুরু করে, তবে বাংলাদেশে কাজের ক্ষেত্রে যেসব চ্যালেঞ্জ আছে, তা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব। ইতিবাচক মানসিকতার একটি দল যেকোনো প্রতিকূলতাকে সুযোগে রূপান্তর করতে পারে।’
অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন ব্রিটিশ হাইকমিশনের ডেপুটি ডিরেক্টর অব ট্রেড অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট সাইয়াব আহমেদ এবং আর্নেস্ট অ্যান্ড ইয়ং বাংলাদেশের পার্টনার ও ম্যানেজিং ডিরেক্টর নওশাদ ইকরামুল্লাহ প্রমুখ।










