ইউক্রেনে রাশিয়ার দখলদারিত্ব ও চলমান যুদ্ধ এরই মধ্যে বৈশ্বিক কৃষির সব খাতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। খাদ্যশস্য বাণিজ্যে এ প্রভাব দীর্ঘমেয়াদি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা। আন্তর্জাতিক কৃষিবিষয়ক তথ্য ও দাম মূল্যায়নকারী প্রতিষ্ঠান এগ্রিব্রিফিং সম্প্রতি এক ওয়েবিনারে এ আশঙ্কার কথা জানিয়েছে।

ওয়েবিনারটিতে বিশ্লেষকরা বর্তমান বাজার পরিস্থিতির নানা বিষয় তুলে ধরেন। কৃষ্ণ সাগরীয় অঞ্চলে চলমান সংকট কীভাবে কৃষির প্রত্যেক ধাপে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে, তা উঠে এসেছে ওয়েবিনারে। উৎপাদন ব্যয় থেকে শুরু করে ভোক্তা পর্যন্ত সব ক্ষেত্রেই যুদ্ধের প্রভাব দৃশ্যমান বলে জানিয়েছেন বিশ্লেষকরা। তবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত খাদ্যশস্য ও তেলবীজের বৈশ্বিক বাজার। এ বিষয়ে একমত পোষণ করেছেন বেশির ভাগ বিশ্লেষক।

বৈশ্বিক ভুট্টা রফতানির প্রায় ২০ শতাংশই আসে রাশিয়া ও ইউক্রেন থেকে। এছাড়া বৈশ্বিক গম রফতানির ৩০ শতাংশই করে দেশ দুটি। ইউক্রেন এককভাবেই বিশ্বের শীর্ষ সূর্যমুখী তেল উৎপাদক ও সরবরাহকারী দেশ। কিন্তু গত ২৪ ফেব্রুয়ারি দেশটিতে রাশিয়া আক্রমণ করলে পরিস্থিতি পাল্টে যায়। যুদ্ধ শুরুর পরই বন্ধ হয়ে যায় দেশটির সব বন্দর। অন্যদিকে পশ্চিমা দেশগুলোর কয়েক দফা নিষেধাজ্ঞার কারণে রাশিয়াও তাদের পণ্য রফতানি সীমিত করতে বাধ্য হয়েছে। ফলে দুই দেশের খাদ্যশস্য বাণিজ্য বর্তমানে খাদের কিনারে।

এগ্রিব্রিফিংয়ের বাজার বিশ্লেষক হ্যামিলিন মার্চেট বলেন, এখন থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে ইউক্রেন ১ কোটি ২০ লাখ টন পণ্যের রফতানি হারানোর আশঙ্কা করছে। এর মধ্যে ৫০ লাখ টনই গম।

মার্চেট বলছেন, মিসরসহ যেসব দেশ রাশিয়া থেকেই বেশির ভাগ গম আমদানি করে, বর্তমানে তারা বিশ্ববাজার থেকে শস্যটি কেনা থেকে সম্পূর্ণভাবে বিরত। বিষয়টি পণ্যটির দাম ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যাওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে। এর বাইরে অন্যান্য দেশ খাদ্যশস্য সরবরাহ কমিয়ে আনছে। এতে খাদ্যপণ্য উৎপাদন হ্রাসের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এছাড়া কোনো কোনো দেশ খাদ্যপণ্য তৈরিতে গমের বিকল্প খোঁজারও চেষ্টা চালাচ্ছে।

রাশিয়া কিংবা ইউক্রেন—কোনো দেশই সয়াবিন রফতানিতে শীর্ষস্থানীয় নয়। কিন্তু কৃষ্ণ সাগর দিয়ে দেশ দুটির খাদ্যশস্য রফতানি কমায় অতিরিক্ত চাপের মুখে সয়াবিন তেলের আন্তর্জাতিক বাজার। তেলবীজটির বাজার এমনিতেই সংকটের মধ্যে। কারণ ভয়াবহ খরার কারণে লাতিন আমেরিকার দেশগুলোয় এটির আবাদ ও উৎপাদন তলানিতে। অঞ্চলটি বিশ্বের শীর্ষ সয়াবিন উৎপাদক ও রফতানিকারক হওয়ায় নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে পুরো বিশ্ববাজারে।

শুধু সয়াবিনই নয়, একই পরিস্থিতির মধ্যে সূর্যমুখী তেলের বাজারও। মার্চেট জানান, যেসব দেশ ইউক্রেন থেকে সর্বাধিক সূর্যমুখী তেল আমদানি করে, তারা বিকল্প হিসেবে ক্যানোলা থেকে উৎপাদিত তেলকে বেছে নিয়েছে। অথচ বাজারে এ পণ্যের সরবরাহ সংকট তীব্র।

যুদ্ধের কারণে চাপের মুখে অন্যান্য খাদ্যশস্য রফতানিকারক দেশও। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য অস্ট্রেলিয়া, ভারত, উত্তর আমেরিকা ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন। মার্চেট বলেন, যুদ্ধ যদি আজকেই শেষ হয়ে যায়, তার পরও ইউক্রেন থেকে খাদ্যশস্যের সরবরাহ থাকবে সীমিত। অন্যদিকে নিষেধাজ্ঞা থাকায় বিশ্বের বেশির ভাগ দেশই রাশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্যিক লেনদেনে যাওয়ার ব্যাপারে দ্বিধার মধ্যে থাকতে পারে। ফলে চলমান সংকট থেকে মুক্তি পেতে বিশ্বের অনেক দিন সময় লাগবে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, ইউক্রেনের খামারগুলোয় উৎপাদন ও কারখানার কার্যক্রম প্রতিকূলতার মধ্যেও চলমান। তবে দেশটির পরিস্থিতি প্রতিদিনই পরিবর্তন হচ্ছে। এ কারণে খাদ্যশস্য উৎপাদন নিয়ে পূর্বাভাস দেয়া পুরোপুরিভাবেই অসম্ভব।

মার্চেট বলেন, রাশিয়া ও ইউক্রেনে উৎপাদন যদি স্বাভাবিক হয়, তার পরও অন্যান্য রফতানিকারক দেশকে কৃষ্ণ সাগরীয় নির্ভরতা কমাতে ব্যাপক পরিমাণ খাদ্যশস্য রফতানি করতে হবে। কারণ কৃষ্ণ সাগরীয় অঞ্চলে যুদ্ধের পর থেকেই খাদ্যশস্যের মজুদ তলানিতে। আগামী বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মজুদ ঘুরে দাঁড়ানোর সম্ভাবনা নেই। ফলে দামও দীর্ঘদিন ধরে ঊর্ধ্বমুখী থাকবে।