‘বিশ্বের উন্নত দেশ প্রতি পাঁচ-ছয় বছর পর বিল্ডিং কোড নীতিমালা আপডেট করে। অথচআমাদের এখানে যে বিল্ডিং কোডটি করা হয়েছে, সেটি ২০১১ সালের তথ্যের ভিত্তিতে করা। এটি নীতিমালা আকারে আসে ২০২০ সালে। এতে প্রতি বছর অগ্নিকাণ্ডের জন্য প্রাণহানির পাশাপাশি রাষ্ট্রের অনেক সম্পদ নষ্ট হয়ে যায়। এ সংকট সমাধান ও অগ্নিঝুঁকি কমাতে শিল্প এলাকাগুলোয় সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে স্যাটেলাইট ফায়ার স্টেশন প্রয়োজন।’
গতকাল রাজধানীর মতিঝিলে আয়োজিত ‘ফায়ার সেফটি চ্যালেঞ্জেস অ্যান্ড মিটিগেশন স্ট্র্যাটেজিস ফর বাংলাদেশ’ শীর্ষক সেমিনারে এমন বক্তব্য উঠে আসে। সেমিনারে প্রধান অতিথি ছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল। সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিজাস্টার সায়েন্স অ্যান্ড ক্লাইমেট রেজিলিয়েন্স বিভাগের চেয়ারম্যান ড. মো. জিল্লুর রহমান।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘রাজধানীতে পানি ছিটানোর জন্য পানি পাওয়া যায় না। ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবহার করলে ঢাকা শহর ডেবে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। ফলে পদ্মা ও শীতলক্ষ্যা নদী থেকে পানি আনতে হয়। কোথাও আগুন লাগলেও পানি পাওয়া যায় না। ফায়ার হাইড্রেন্ট না থাকায় আগুন নেভাতে গিয়ে জটিলতা দেখা দেয়।
তিনি বলেন, ‘সারা দেশে খাল, বিল, নদী, পুকুর দখলমুক্ত করার উদ্যোগ চলমান রয়েছে। প্রকৃতি ও পরিবেশ সংরক্ষণে সরকারকে প্রয়োজনে আরো কঠোর হতে হবে। অগ্নিকাণ্ডসহ যেকোনো দুর্যোগের ঝুঁকি হ্রাসে শহরের পাশাপাশি মফস্বলেও ভবন নির্মাণ নীতিমালা কঠোরভাবে অনুসরণের কোনো বিকল্প নেই।’
ড. মো. জিল্লুর রহমান বলেন, ‘আমাদের এখানে যে বিল্ডিং কোডটি করা হয়েছে, সেটি ২০১১ সালের তথ্যের ভিত্তিতে করা। এটি নীতিমালা আকারে আসে ২০২০ সালে। অথচ প্রতি পাঁচ-ছয় বছর পর পরই উন্নত দেশগুলো বিল্ডিং কোড নীতিমালা আপডেট করে। একে তো পুরনো ডাটা, অন্যদিকে এগুলো বাস্তবতার সঙ্গে খুব একটা মিল নেই। এর মধ্যেও যা হয়েছে তা মানছে না কেউ। তাই এখানে বড় দুর্ঘটনার ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। ফলে সবাইকে বিল্ডিং কোড মানতে বাধ্য করতে হবে। এছাড়া কোনো পথ নেই।’
এফবিসিসিআই সভাপতি মাহবুবুল আলম বলেন, ‘প্রতি বছর অগ্নিকাণ্ডের জন্য প্রাণহানির পাশাপাশি রাষ্ট্রের অনেক সম্পদ নষ্ট হয়ে যায়। সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে এ ক্ষতি কমিয়ে আনা সম্ভব। তৈরি পোশাকসহ রফতানিমুখী শিল্পের বাইরে অন্যান্য শিল্পে কমপ্লায়েন্স বাস্তবায়নে ২০২১ সালের সেপ্টেম্বর থেকে কার্যক্রম শুরু করেছে এফবিসিসিআই সেফটি কাউন্সিল। এর আওতায় গার্মেন্টস ব্যতীত প্রায় ১ হাজার ২০০ শিল্প-কারখানা ও ১৭২টি মার্কেট পরিদর্শন এবং কর্মীদের প্রশিক্ষণ প্রদান; ৪ হাজার ৬০০ জন শ্রমিককে অগ্নিকাণ্ডজনিত ঘটনায় প্রাথমিক চিকিৎসা বিষয়ে প্রশিক্ষণ; ১৪০ জন মাস্টার ট্রেইনার তৈরি এবং চারটি বিভাগীয় চেম্বার ও ১২টি অ্যাসোসিয়েশন সেফটি সেল স্থাপন করা হয়েছে। এখন দুর্ঘটনা ঘটলে ভবন মালিক বা ভবন যারা তৈরি করছে তাদেরই দায়ী করা হয়। যারা রেগুলেটরির দায়িত্বে আছে তাদের কোনো দায় নেই?’
এফবিসিসিআইয়ের প্যানেল উপদেষ্টা স্থপতি ইকবাল হাবীব বলেন, ‘বাংলাদেশে ফায়ার সার্ভির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে। কিন্তু নীতিমালা হচ্ছে, কোনো বিপর্যয় হলে তারা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে কাজ করবে। এখন বিশ্বের অনেক দেশেই ফায়ার সার্ভিস দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে রয়েছে। আমাদেরও সেভাবে ভাবতে হবে। তাহলে কাজ সমন্বয় তৈরি হবে। এছাড়া অগ্নিঝুঁকি কমাতে শিল্প এলাকাগুলোয় সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে স্যাটেলাইট ফায়ার স্টেশন স্থাপন করতে হবে।’
উন্মুক্ত আলোচনায় অংশীজনরা বলেন, ‘ভবন নির্মাণে ভুল করলে ইঞ্জিনিয়ারদের আট বছরের জেল হওয়ার কথা। কিন্তু অসংখ্য নকশাবহির্ভূত ভবন পাওয়া গেলেও কোনো ইঞ্জিনিয়ারের শাস্তি হয়নি। দেশে কোনো সিভিল ডিফেন্স নেই। একটি দুর্ঘটনা ঘটলে ফায়ার সার্ভিস যাওয়ার আগে স্থানীয় লোকজন সেখানে সহায়তা করেন। কিন্তু সিভিল ডিফেন্স না থাকায় সেটিও সঠিকভাবে হয় না। অন্যদিকে ভবন নির্মাণের সময় ফায়ার সার্ভিস সনদ দিয়েই দায়িত্ব শেষ।’










