বৈশ্বিক অর্থনীতিতে উদীয়মান পরাশক্তি হয়ে ওঠার পথে রয়েছে ভারত। দেশটির জিডিপি বৃদ্ধির হার, উৎপাদন কার্যক্রম বৃদ্ধি ও দেশের অভ্যন্তরীণ বিশাল বাজার এক্ষেত্রে ভূমিকা রাখছে। পশ্চিমা কোম্পানিগুলো চীনের বিপরীতে ভারতকে বেছে নিচ্ছে কারখানা স্থাপনের কেন্দ্র হিসেবে। আগ্রহী হয়ে উঠছেন পশ্চিমা নেতারাও। আর সবকিছু ঠিক থাকলে ২০৫০ সালের মধ্যে দেশটির অর্থনীতি যুক্তরাষ্ট্রের সমান হয়ে উঠবে। সম্প্রতি ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসে প্রকাশিত প্রতিবেদনে এমনটাই দাবি করেছেন অর্থনৈতিক বিশ্লেষক মার্টিন উলফ। খবর দ্য হিন্দু

মার্টিন উলফ মনে করেন, ভারত প্রতি বছর ৫ শতাংশ জিডিপি বৃদ্ধির হার ধরে রাখবে। নীতিমালা ও পদক্ষেপ এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। বৈশ্বিক কোম্পানিগুলো চীনের পর ভারতকে প্রাধান্য দিচ্ছে। ভারতের অভ্যন্তরীণ বাজারকে উপেক্ষা করতে পারছে না। এ মুহূর্তে ভারত বিশ্বের পঞ্চম বৃহৎ অর্থনীতির দেশ। ক্রয়ক্ষমতা বিবেচনায় এটি তৃতীয় বৃহৎ দেশ। জাতিসংঘের দেয়া পূর্বাভাস অনুসারে, দেশটির জনসংখ্যা ১৬৭ কোটিতে পৌঁছাবে ২০৫০ সাল নাগাদ, বর্তমানে যা ১৪৩ কোটিতে দাঁড়িয়ে আছে। 

দেশের ব্যাংকগুলোতে ব্যালান্স শিট যথেষ্ট ইতিবাচক। আগামী দশকগুলোতে দেশের অর্থনীতি ও জনসংখ্যা—দুইই দ্রুতগতিতে বাড়বে, যা চীনের প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড়াচ্ছে। একসময়ে নিষিদ্ধ থাকা নরেন্দ্র মোদিকে ওয়াশিংটনে জো বাইডেন সাদর সম্ভাষণ জানিয়েছেন সম্প্রতি। প্যারিসে একই প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন ইমানুয়েল মাখোঁ। চীনের বিকল্প হিসেবে ভারত প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠছে তাদের চোখে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) পূর্বাভাস দিয়েছে, বার্ষিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৬ শতাংশের বেশি থাকবে ২০২৩ থেকে ২০২৮ সাল পর্যন্ত। একই সময়ে বাড়ছে জিডিপি। 

ভারত বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অচলাবস্থার মধ্যেও অতটা নাকাল হয়নি। অভ্যন্তরীণ চাহিদা ছিল সন্তোষজনক। এখন পর্যন্ত দেশের অর্থনীতি নিয়ে কাজ করতে বিপুল সুযোগ রয়েছে। দেশে শ্রম মজুরি তুলনামূলকভাবে কম। যেকোনো কোম্পানি চাইলে সে স্বল্প মজুরির সুযোগ কাজে লাগানোর জন্য ভারতকে উৎপাদন কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চায়। 

২০৫০ সালের মধ্যে ভারতের মাথাপিছু জিডিপি যুক্তরাষ্ট্রের ৩০ শতাংশে পৌঁছাবে, বর্তমানে চীন যে অবস্থানে রয়েছে। সে হিসেবে জিডিপি প্রতি বছর ৫ শতাংশ বাড়বে। যুক্তরাষ্ট্রের জিডিপি বৃদ্ধির হার ১ দশমিক ৪ শতাংশ। একই সময়ে ভারতের জনসংখ্যাও হবে যুক্তরাষ্ট্রের জনসংখ্যার সাড়ে চার গুণ। ফলে ভারতের অর্থনীতি যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির তুলনায় ৩০ শতাংশ বাড়বে। অর্থাৎ এ কথা দাবি করা অমূলক নয় যে ভারত অর্থনৈতিক পরাশক্তি হয়ে ওঠার পথে রয়েছে। 

অর্থনৈতিক পরিকল্পনায় কৌশলগত অগ্রগতির আধুনিক উদাহরণ চীন। উচ্চ বিনিয়োগ, দ্রুত নগরায়ণ ও রফতানি পণ্যের উৎপাদন বৃদ্ধি সেখানে ভূমিকা রেখেছে। ঠিক এ পথটি অনুসরণ করেছিল জাপানও। তবে ভারতের অনুসরণ করা পথ কিছুটা ভিন্ন। ২০১৪ থেকে ২০১৩ সালের মধ্যে বিনিয়োগ ছিল গড়ে জিডিপির ৩১ শতাংশ, যেখানে চীনের ক্ষেত্রে পরিমাণটি ৪৪ শতাংশ। এখন পর্যন্ত চীনই বিশ্ববাজারে বড় রফতানিকারক দেশ। তবে ভারতে বিপুল পরিমাণ উদ্যোক্তা আছে। আছে চাকরি তৈরির সুযোগ ও শ্রম মজুরির স্বল্পতা, যা বড় বিনিয়োগ আকর্ষণের সুযোগ তৈরি করেছে। ভারতের জাতীয় সঞ্চয় হারের সূচক ঊর্ধ্বমুখী। 

নীতিগত কিছু বিষয়ে সতর্কতা জরুরি। বিশেষ করে কার্বন নিঃসরণ কমিয়ে আনার ব্যাপারে। বিদ্যুৎ খাতে ভারতের অগ্রগতি উল্লেখযোগ্য। দেশটি কয়েক বছরের মধ্যে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় বিদ্যুৎ রফতানি করবে। দেশের অভ্যন্তরেও সুযোগ তৈরি করবে নতুন প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠার জন্য। ভারত যদি চারপাশে থাকা সুযোগগুলো কাজে লাগাতে পারে, তাহলে ২০৫০ সালের মধ্যে পরাশক্তি হিসেবে পোক্ত করতে পারবে আসন।