বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে বাণিজ্য এবং বিনিয়োগ বাড়াতে প্রাথমিকভাবে দুই দেশের মধ্যে ইকোনমিক পার্টনারশিপ এগ্রিমেন্ট (ইপিএ) স্বাক্ষর হবে। এজন্য দুই পক্ষের মধ্যে আলোচনা শুরু হয়েছে বলে জানিয়েছেন বাণিজ্য প্রতিমন্ত্রী আহসানুল ইসলাম টিটু। গতকাল সচিবালয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে জাপানের রাষ্ট্রদূত ইওয়ামা কিমিনোরির সঙ্গে এক যৌথ সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ কথা জানান। 

প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘বাংলাদেশের স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণ বর্তমান সরকারের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রার একটি উল্লেখযোগ্য অর্জন। এ অর্জন বিশ্বে বাংলাদেশের ইতিবাচক ভাবমূর্তি তৈরি এবং বিনিয়োগ ও বাণিজ্যে নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টির পাশাপাশি বেশকিছু চ্যালেঞ্জও তৈরি করবে। এর মধ্যে স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশে পণ্য রফতানিকালে শুল্ক ও কোটামুক্ত প্রবেশাধিকার সুবিধা ২০২৬ সালের পর হারানো অন্যতম। এর ফলে বাংলাদেশের রফতানি পণ্যকে ওইসব দেশের বাজারে প্রবেশের সময় সাধারণভাবে আরোপিত শুল্কের সম্মুখীন হতে হবে।’

বাণিজ্য প্রতিমন্ত্রী আরো বলেন, ‘শুল্ক ও কোটামুক্ত সুবিধা না থাকলে উন্নত দেশগুলোয় বাংলাদেশের রফতানি বাজার সংকোচনের আশঙ্কা রয়েছে। বাংলাদেশের এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন-পরবর্তী সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সরকারের অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা অনুসারে বাংলাদেশের রফতানি বাজার সংরক্ষণ ও সম্প্রসারণে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এরই মধ্যে বাণিজ্যিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন দেশ ও ট্রেড ব্লকের সঙ্গে আঞ্চলিক বাণিজ্য চুক্তি সম্পাদনের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।’

তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে ইপিএ স্বাক্ষরের পরবর্তী পদক্ষেপ হিসেবে নেগোসিয়েশন প্রক্রিয়া শুরু করার সিদ্ধান্ত প্রধানমন্ত্রী অনুমোদন করেছেন। এরই পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ ও জাপানের পক্ষ থেকে যৌথভাবে নেগোসিয়েশন শুরুর আনুষ্ঠানিক ঘোষণা করা হয়েছে। আশা করা যায় দ্রুতই ট্রেড নেগোসিয়েশন কমিটি নেগোসিয়েশন সভায় মিলিত হবে।’ 

প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘জাপান বিশ্বের তৃতীয় বৃহৎ অর্থনীতির দেশ এবং বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য অংশীদার। ২০২২-২৩ অর্থবছরে বাংলাদেশ জাপান থেকে ২ হাজার ২৯ দশমিক ৯০ মিলিয়ন ডলার মূল্যের পণ্য আমদানি করে। অন্যদিকে বাংলাদেশ ১ হাজার ৯০১ দশমিক ৬০ মিলিয়ন ডলার মূল্যের পণ্য জাপানে রফতানি করে। জাপান বাংলাদেশের বাণিজ্য সম্প্রসারণের জন্য একটি বাণিজ্য সম্ভাবনাময় এলাকা। পণ্য ছাড়াও সেবা ও বিনিয়োগ খাতেও জাপানের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক আরো উন্নয়নের সম্ভাবনা রয়েছে।’ 

তিনি বলেন, ‘এজন্য বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বৃদ্ধির লক্ষ্যে প্রাথমিকভাবে দুই দেশের মধ্যে ইকোনমিক পার্টনারশিপ এগ্রিমেন্ট (ইপিএ) স্বাক্ষরের উদ্যোগ গ্রহণ ও যৌথ সমীক্ষা পরিচালনা করা হয়েছে। প্রস্তাবিত বাংলাদেশ-জাপান ইকোনমিক পার্টনারশিপ এগ্রিমেন্ট সম্পাদনের লক্ষ্যে গঠিত যৌথ সমীক্ষা গ্রুপ গত বছরের এপ্রিল, জুলাই ও সেপ্টেম্বরে তিন রাউন্ডের সভায় মিলিত হয়। সভাগুলোয় উভয় দেশ প্রস্তাবিত ইপিএ সম্পাদনের লক্ষ্যে স্কোপ ও কভারেজ হিসেবে ১৭টি সেক্টর চিহ্নিত করে। সরকারি, বেসরকারি, একাডেমিয়া ও ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণ ও সম্পৃক্ততার মাধ্যমে যৌথ সমীক্ষা গ্রুপ তাদের প্রতিবেদন চূড়ান্ত করে। এরই ধারাবাহিকতায় গত ২৭ ডিসেম্বর উভয় দেশ যৌথ সম্ভাব্যতা সমীক্ষার প্রতিবেদন প্রকাশ করে।’

অনুষ্ঠানে জাপানের রাষ্ট্রদূত আইওয়ামা কিমিনোরি বলেন, ‘ইপিএ চুক্তি কেবল শুল্ক কমানোর মাধ্যমে উভয় দেশের মধ্যে বাণিজ্য বৃদ্ধি করবে না, পাশাপাশি কাস্টমস ক্লিয়ারেন্স পদ্ধতি ও বিনিয়োগ পরিবেশের উন্নতি ঘটাবে। ইপিএ নেগোসিয়েশনে পণ্য ও সেবার দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য, বিনিয়োগ, কাস্টমস প্রক্রিয়া, পণ্যের মেধাস্বত্ব, ট্রেড ফ্যাসিলিটেশনসহ বিভিন্ন বিষয় স্থান পাবে।’ জাপান ও বাংলাদেশের মধ্যকার ইপিএ চুক্তি এশীয় প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির বিকাশে ভূমিকা রাখবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি। 

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব তপন কান্তি ঘোষ বলেন, ‘২০২৬ সালের আগে জাপানের সঙ্গে ইপিএ স্বাক্ষর না হলে সেদেশে পণ্য রফতানির ক্ষেত্রে ১৮ শতাংশ হারে শুল্ক গুনতে হবে। সেজন্য বাংলাদেশ ইপিএ স্বাক্ষরের লক্ষ্যে প্রস্তুতি গ্রহণ করছে। এবারের বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার মন্ত্রী পর্যায়ের সম্মেলনে এলডিসি থেকে উত্তরণের পরও যেন শুল্কমুক্ত সুবিধা অব্যাহত রাখা হয়, বাংলাদেশ সব দেশকে সেই অনুরোধ করেছে। জাপানের সঙ্গে ইপিএ করার পর সেদেশের সরকার বিবেচনা করবে, বাংলাদেশকে শুল্কমুক্ত সুবিধা দেবে কিনা। তবে বন্ধুপ্রতিম জাপান সরকার এ বিষয়ে ইতিবাচক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে বলে প্রত্যাশা রয়েছে।’

প্রসঙ্গত, গত বছরের ডিসেম্বরের শেষ দিকে জাপানের সঙ্গে ইপিএ চুক্তি সম্পাদনের লক্ষ্যে গঠিত জয়েন্ট স্টাডি গ্রুপ একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। ওই সময় তপন কান্তি ঘোষ বলেন, ‘২০২৫ সালের ডিসেম্বর অথবা ২০২৬ সালের জানুয়ারির মধ্যে উভয় দেশের মধ্যকার অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি স্বাক্ষরিত হবে।’

ওই সময় জাপানের রাষ্ট্রদূত ইওয়ামা কিমিনোরি বলেন, ‘এ চুক্তি থেকে দুই পক্ষ কী পরিমাণ লাভবান হবে, সেটা আগে বলা কঠিন। তবে এটি কেবল শুল্কের সঙ্গেই সম্পর্কিত না, সেবা খাত, বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নতকরণসহ বিভিন্ন বিষয় রয়েছে। এ চুক্তি থেকে জাপান-বাংলাদেশ দুদেশই লাভবান হবে। ২০২৬ সালের মধ্যেই চুক্তিটি করতে হবে। যে কারণে বর্তমান পরিস্থিতি একটু ভিন্ন।’