স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণ-পরবর্তী সময়ের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় এখন থেকেই ধাপে ধাপে রফতানি পণ্যে নগদ প্রণোদনা কমানোর পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। এরই অংশ হিসেবে রফতানিমুখী ৪৩টি খাতে নগদ প্রণোদনা কমিয়ে একটি সার্কুলার জারি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর মধ্যে ২৬ বিলিয়ন ডলার মূল্যের পাঁচটি পোশাক পণ্যের নগদ প্রণোদনা পুরোপুরি উঠিয়ে নেয়া হয়েছে। এ পদক্ষেপ পোশাক শিল্পে অনাকাঙ্ক্ষিত ঝুঁকি ও বিপর্যয় ডেকে আনবে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে পোশাক পণ্য প্রস্তুত ও রফতানিকারকদের সংগঠন বিজিএমইএ। 

গতকাল এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে সংগঠনটি জানায়, নগদ সহায়তার নতুন হার ও কাঠামো শিল্পের জন্য মোটেও সহায়ক ও সময়োপযোগী নয়। এ পরিবর্তন অনাকাঙ্ক্ষিত। শিল্প ও দেশের স্বার্থে সরকারের প্রতি এ পদক্ষেপটি পুনর্বিবেচনার দাবি জানায় বিজিএমইএ।

বিজিএমইএর ভারপ্রাপ্ত সভাপতি এসএম মান্নান (কচি) স্বাক্ষরিত ওই সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, সার্কুলারে পাঁচটি প্রধান রফতানি পণ্যের ওপর নগদ সহায়তা সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করা হয়েছে। পণ্যগুলো হলো টি-শার্ট, সুয়েটার, নিটেড শার্ট, পুরুষদের আন্ডার গার্মেন্ট এবং ওভেন ট্রাউজার ও জ্যাকেট। ২০২২-২৩ অর্থবছরে এ পাঁচ পণ্যের রফতানি মূল্য ছিল ২৫ দশমিক ৯৫ বিলিয়ন ডলার, যা আমাদের মোট পোশাক রফতানির ৫৫ দশমিক ২২ শতাংশ।

শুধু ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের প্রণোদনা ছাড়া বাকি সব প্রণোদনার হার ২৫-৫০ শতাংশ কমানো হয়েছে জানিয়ে সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, যদিও ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের প্রণোদনার হার কমানো হয়নি। তবে অধিকাংশ ক্ষুদ্র ও মাঝারি কারখানার উৎপাদন ও রফতানি কিছু বেসিক পণ্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। বিশেষ করে টি-শার্ট, ট্রাউজার ও সোয়েটার। এ পণ্যগুলো সামগ্রিক প্রণোদনা ব্যবস্থা থেকে বাদ দেয়ায় মূলত এসব পণ্য রফতানিকারী ক্ষুদ্র ও মাঝারি কারখানাগুলো কোনো প্রণোদনাই পাবে না। আমাদের মোট পোশাক রফতানিকারক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৬০ শতাংশই ক্ষুদ্র ও মাঝারি শ্রেণীর।

বিজ্ঞপ্তিতে আরো বলা হয়, বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) এএসসিএম বিধান অনুযায়ী এ পাঁচটি পণ্যে নগদ সহায়তা বাদ দেয়া হয়েছে বলে সার্কুলারে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন-পরবর্তী সময়ে ডব্লিউটিও কমপ্লায়েন্ট পদ্ধতিতে বিকল্প প্রণোদনা প্রবর্তনের বিষয়ে সার্কুলারটিতে কোনো উল্লেখ নেই। যদিও অনেক মধ্যম আয়ের দেশ তাদের শিল্পের জন্য সরাসরি প্রণোদনা না দিয়ে বিকল্প প্রণোদনা দিয়ে আসছে। বিকল্প প্রণোদনা প্রদানের বিষয়টি আমাদের দেশেও সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে। বিকল্প ব্যবস্থা না করে হঠাৎ প্রচলিত ব্যবস্থা কর্তন শিল্প ও অর্থনীতির জন্য সহায়ক পদক্ষেপ বলে আমরা মনে করি না।

বিজিএমইএ বলছে, প্রধান যে তিনটি অপ্রচলিত বাজারে রফতানিকারকরা ভালো করছে, অর্থাৎ জাপান, ভারত ও অস্ট্রেলিয়ায় রফতানি ক্ষেত্রে নতুন বাজারের রফতানি প্রণোদনাটি বাদ দেয়া হয়েছে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে এ তিনটি বাজারে আমাদের পোশাক রফতানি ছিল ৩ দশমিক ৭৭ বিলিয়ন ডলার, যা মোট পোশাক রফতানির প্রায় ৮ শতাংশ। বিগত প্রায় ১৪ বছরের অক্লান্ত পরিশ্রম, বিনিয়োগ ও সরকারের সহায়তার মাধ্যমে আমরা এ বাজারগুলো তৈরি করতে পেরেছি। চলতি অর্থবছরের জুলাই-ডিসেম্বর পর্যন্ত যখন আমাদের প্রধান দুটি বাজার যুক্তরাষ্ট্র ও জার্মানিতে রফতানি কমেছে যথাক্রমে ৫ দশমিক ৬৯ শতাংশ ও ১৭ দশমিক ৫ শতাংশ, তখন প্রণোদনা থেকে বাদ পড়া তিনটি নতুন বাজারে আমাদের প্রবৃদ্ধি ছিল ৪৩ দশমিক ৫৬ শতাংশ। এ বাজারগুলো বাদ দেয়ার ফলে সেখানে আমাদের রফতানি বিপর্যস্ত হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের এ সার্কুলারের মাধ্যমে পোশাক খাতে প্রচলিত প্রণোদনার প্রায় ৭০ শতাংশ কর্তন করা হয়েছে উল্লেখ করে বিজিএমইএ বলছে, চলতি অর্থবছরের শুরুর দিকে বাংলাদেশ ব্যাংক এক সার্কুলারের মাধ্যমে সব প্রণোদনার হার ও কাঠামো ঘোষণা করে। এ বছরের ৩০ জুন পর্যন্ত জাহাজীকৃত পণ্যের ওপর তা কার্যকর থাকবে বলে ঘোষণা করা হয়। সে অনুযায়ী কারখানাগুলো অর্ডার কনফার্ম করেছে এবং বিনিয়োগ করে ফেলেছে। সেখানে স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে কোনো ধরনের পূর্ব আলোচনা ছাড়া হঠাৎ এ রকম একটি গুরুতর সিদ্ধান্ত শিল্পকে চরমভাবে বিপর্যস্ত করবে। বিশেষ করে যখন আমাদের প্রধান রফতানি বাজারগুলোর পোশাক আমদানি ও চাহিদা ভালো নয় এবং স্থানীয় পর্যায়ে আমরা উৎপাদন খরচ বৃদ্ধির চাপে আছি, তখন এ রকম একটি পদক্ষেপ শিল্প ও অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক ফল বয়ে আনবে না। বর্তমানে বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভের যে নিম্নমুখী প্রবণতা ও ব্যালান্স অব পেমেন্টে যে চাপ রয়েছে, সেই বাস্তবতায় এ রকম একটি পদক্ষেপ আমাদের অর্থনীতির জন্য মোটেই সহায়ক নয়। সরকারের এমন সিদ্ধান্ত এ সংকটকে আরো ঘনীভূত করবে বলে মনে করছে সংগঠনটি।