আন্তর্জাতিক বাজারে প্রাকৃতিক হীরার দাম কমে প্রায় ১৪ বছরের সর্বনিম্নে। প্রধান বাজারগুলোয় মূল্যবান ধাতুটির চাহিদা কমছে উল্লেখযোগ্য হারে। এতে বাড়ছে মজুদ। ফলে পলিশিং কারখানাগুলো কম দামেই বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে এসব ধাতুটি বিক্রি করছে। খবর নিক্কেই এশিয়া।
প্রাকৃতিক হীরার বৈশ্বিক দামে এমন নিম্নমুখী প্রবণতার পেছনে প্রধান প্রভাবকের ভূমিকা পালন করেছে যুক্তরাষ্ট্র ও চীন। অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তায় বিশ্বের শীর্ষ এ দুই বাজারে দুর্বল হয়ে পড়েছে চাহিদা। বিপরীতে এসব দেশের গ্রাহকের কাছে বাড়ছে কৃত্রিম হীরার গ্রহণযোগ্যতা।
তথ্য বলছে, আন্তর্জাতিক বাজারে এফ কালার গ্রেড ও ভিএস-১ ক্ল্যারিটি গ্রেডের প্রতি ক্যারেট মসৃণ হীরার বাজারদর গত ডিসেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে ৯ হাজার ২০০ ডলারে নেমে যায়, যা ২০০৯ সালের পর সর্বনিম্ন এবং ২০২২ সালের আগস্টের রেকর্ড সর্বোচ্চের তুলনায় ২৪ শতাংশ কম।
অ্যাংলো-আমেরিকান মালিকানাধীন ডি বিয়ারসের মতো কোম্পানিগুলো পলিশ বা মসৃণ করার জন্য অমসৃণ হীরা ভারতসহ অন্যান্য দেশের কারখানাগুলোয় পাঠায়। এ প্রক্রিয়া শেষে ধাতুটি বাণিজ্যিক কোম্পানিগুলোর কাছে বিক্রি করা হয়।
গত বছরের জুলাইয়ে ডি বিয়ারস অমসৃণ হীরার দাম ৫-১৫ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়েছে। কারণ হিসেবে বাজার পর্যবেক্ষকরা জানান, যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বর্তমানে হীরাসহ বিলাসবহুল পণ্য আকর্ষণ হারাচ্ছে। উচ্চ সুদহার ও নিয়ন্ত্রণহীন মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষ ব্যয় সংকোচন করছে। অন্যদিকে চীনের রিয়েল এস্টেট ব্যবসায় মন্দা ভাবও চাহিদায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। গত বছরের অক্টোবরে ডি বিয়ারসের অমসৃণ হীরা বিক্রি প্রায় ৮০ শতাংশ কমে গিয়েছিল।
এদিকে ল্যাবে তৈরি হীরার ঊর্ধ্বমুখী চাহিদাও প্রাকৃতিক হীরার বাজারকে চাপের মুখে ফেলেছে। এসব কৃত্রিম হীরা স্বচ্ছতা ও গঠনের দিক থেকে প্রাকৃতিক হীরার মতোই। কিন্তু এগুলোর দাম তুলনামূলকভাবে কম।
টোকিওভিত্তিক জুয়েলারি পণ্যের বাজার পরামর্শক নবোয়ুকি হারাদা বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রে আপনি প্রাকৃতিক হীরার ১০ ভাগের এক ভাগ দামে কৃত্রিম হীরা কিনতে পারবেন। আগামীতে এ দাম আরো কমতে পারে।’ তরুণ আমেরিকান ও অন্যান্য মূল্যসচেতন ক্রেতা বর্তমানে কৃত্রিম হীরা কিনতেই বেশি আগ্রহী বলেও জানান তিনি।
ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২২ সালে যেসব মার্কিন নাগরিক মাঝখানে হীরাখচিত এনগেজমেন্ট রিং কিনেছেন, তাদের এক-তৃতীয়াংশই এসব রিং বা আংটিতে ল্যাবে তৈরি কৃত্রিম হীরা ব্যবহার করেছেন।
উৎপাদনের দিক থেকে খনি থেকে উত্তোলিত হীরার তুলনায় কৃত্রিম হীরা অনেক বেশি পরিবেশবান্ধব। ফলে নৈতিক দিক থেকেও গ্রাহকের কাছে এ হীরার চাহিদা বাড়ছে।
এদিকে চাহিদা কমে যাওয়ায় প্রাকৃতিক হীরার মজুদ কমাতে তোড়জোড় শুরু করেছেন সংশ্লিষ্টরা। হীরা পলিশিংয়ের ক্ষেত্রে ভারতকে বিশ্বের কেন্দ্র হিসেবে বিবেচনা করা হয়। দেশটি মজুদ কমাতে গত বছরের ডিসেম্বরের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত প্রায় দুই মাস অমসৃণ হীরা আমদানি বন্ধ রাখে।
জাপানের জুয়েলারি বিক্রয় প্রতিষ্ঠান টোকিও পার্লের এক পরিচালক বলেন, ‘ভারতের আমদানি বন্ধ করে দেয়ার পাশাপাশি বিভিন্ন উদ্যোগের কারণে সম্প্রতি বিশ্বজুড়ে হীরার মজুদ কমতে শুরু করেছে।’
চলতি মাস থেকে রুশ হীরা আমদানির ওপর নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করতে যাচ্ছে ইউরোপ ও জাপান। এর আগে যুক্তরাষ্ট্রও একই পদক্ষেপ নিয়েছিল। ইউক্রেনে হামলার প্রতিক্রিয়ায় দেয়া নিষেধাজ্ঞা প্যাকেজের অংশ হিসেবেই এ ঘোষণা এসেছে। রাশিয়ার রাজস্ব আয়ের বড় একটি উৎস হীরা। এ খাতে নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে দেশটির অর্থনীতি সংকুচিত করতে চায় পশ্চিমা দেশগুলো, যাতে দেশটি ইউক্রেন যুদ্ধের ব্যয় সামাল দিয়ে অর্থসংস্থান করতে না পারে।
বিশ্বে মোট উৎপাদিত অমসৃণ হীরার ৩০ শতাংশই আসে রাশিয়া থেকে। তবে দেশটির ওপর দেয়া নিষেধাজ্ঞা ধাতুটির সরবরাহ খাতে খুব বেশি নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে না বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। কারণ এরই মধ্যে অনেক লাক্সারি ব্র্যান্ড স্বেচ্ছায় রুশ হীরা ক্রয় বন্ধ করে দিয়েছে। বিকল্প উৎস থেকে সরবরাহ বাড়াচ্ছে এসব ব্র্যান্ড।










