ই-কমার্স খাতে আগামী দিনগুলোয় গুরুত্বপূর্ণ অনুঘটক হয়ে উঠছে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া। অঞ্চলটিতে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার, তরুণ প্রজন্মের প্রাচুর্য ও তাদের মধ্যে অনলাইনে কেনাকাটা জনপ্রিয় হয়ে ওঠায় তৈরি হয়েছে নতুন সম্ভাবনা। অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা অঞ্চলটিকে পরবর্তী চীন হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। কোম্পানিগুলো বাড়িয়ে চলছে বিনিয়োগ। খবর জিং ডেইলি।

পাঁচ বছরের মধ্যে লাখো কোটি ডলার বিনিয়োগের পরিকল্পনা নিয়েছে টিকটক। বিশেষ করে ই-কমার্স ব্যবসাকে চার গুণ বাড়িয়ে বার্ষিক ২ হাজার কোটি ডলার বিক্রির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার তরুণ প্রজন্মের কাছে অ্যাপটি বিপুল জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। ওই অঞ্চলের মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেকের বয়সই ত্রিশের নিচে। তাছাড়া দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া থেকেই অ্যাপটিতে মাসিক ভিজিটর ৩২ কোটি ৫০ লাখ। বৈশ্বিক কোম্পানিগুলো ওই অঞ্চলের দিকে মনোযোগ দিচ্ছে। 

যুক্তরাষ্ট্রে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার খুবই কম। চীনের ক্ষেত্রে সূচক নিম্নমুখী। কিন্তু দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ক্ষেত্রে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার দ্রুত অগ্রমুখী। মেটার ২০২২ সালে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুসারে, অঞ্চলটিতে বসবাস করা কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা ২০৩০ সাল নাগাদ ২ কোটি ৩০ লাখ বাড়বে। গৃহস্থালি আয়ও একই সময়ে বাড়বে বলে পূর্বাভাস দেয়া হয়েছে। আর কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা ও গৃহস্থালি আয় বাড়ার অর্থ ব্যয় বাড়বে। ২০৩০ সালের মধ্যে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় নতুন ১৪ কোটি ভোক্তা যুক্ত হবে, যা বৈশ্বিক মোট ভোক্তা সংখ্যার ১৬ শতাংশ। তাদের অনেকেই তখন অনলাইনে কেনাকাটা করবে।

২০২৭ সালের মধ্যে ডিজিটাল ভোক্তা বেড়ে দাঁড়াবে ৪০ কোটি ২০ লাখে, যা ২০২২ সালের মধ্যে ছিল ৩৭ কোটি। সবচেয়ে বেশি ভোক্তা বৃদ্ধি দেখা যাবে ইন্দোনেশিয়ায়। তার পেছনে থাকবে ফিলিপাইন, ভিয়েতনাম ও থাইল্যান্ড। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দ্রুত ই-কমার্স পরিষেবার অগ্রগতিকে অনেকটাই চীনের সঙ্গে তুলনা করা যায়। সেখানে সার্বিকভাবে বিক্রি বেড়েছে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বাজার নিয়ে কাজ করা ডব্লিউপিআইসির সহপ্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা জ্যাকব কুক বলেছেন, ‘ই-কমার্সের সম্প্রসারণের হারকে বিবেচনায় নিলে ‌দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া দ্রুত সময়ের মধ্যেই পরবর্তী চীনে পরিণত হচ্ছে।’

যদিও দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাজার বৈশিষ্ট্যগত ও ভাষাগত পার্থক্য রয়েছে। কিন্তু লাজাদা ও শপির মতো প্রতিষ্ঠানগুলো সেখানে ভালো অবস্থান তৈরি করে ফেলেছে। অঞ্চলের ১৬ হাজারের মতো ব্যক্তির ওপর জরিপ পরিচালনা করেছে গবেষণা প্রতিষ্ঠান ব্যাইন। সেখানে দেখা গেছে, ডিজিটাল দুনিয়ার ৬০ শতাংশ ক্রেতাই কেনার বিষয়ে আগে থেকে সিদ্ধান্ত নেন না। অর্থাৎ তারা আবিষ্কার করে আগ্রহোদ্দীপক পণ্য, যা পরবর্তী সময়ে কিনে ফেলে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ই-কমার্স পরিষেবা সম্প্রসারণের প্রধান অনুঘটক। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত বিজ্ঞাপন, ইনফ্লুয়েন্সারদের পোস্ট কিংবা কোনো প্রতিবেদন ভোক্তাদের মধ্যে পণ্যের চাহিদা তৈরি করে। মূল্যের ওপর ভিত্তি করেই তারা প্লাটফর্ম বাছাই করে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার গ্রাহকরা মূল্যের ব্যাপারে সচেতন। মূল্য বাঁচাতে তারা ব্র্যান্ড পরিবর্তন করে ফেলতে পারে। মধ্যম আয়ের মানুষের এ প্রবণতা ই-কমার্স প্লাটফর্মগুলোর জন্য বাড়তি সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে। সেটা মাথায় রেখেই বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের পরিকল্পনা গোছাচ্ছে।

২০২২ সালে টিকটক থেকেই দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় লেনদেন হয়েছে ৪৪০ কোটি ডলার, ২০২১ সালে হওয়া লেনদেনের চেয়ে যা চার গুণ বেশি। টিকটকে চলা আন্তর্জাতিক ব্যবসা বেড়েছে ১৩৬ শতাংশ। ৩০ হাজারের বেশি ইনফ্লুয়েন্সার ও ৬০ হাজারের বেশি স্টোর মিলিয়ে ২৭ লাখ ঘণ্টা কনটেন্ট প্রকাশ করেছে। তাদের মধ্য দিয়ে ১৩ লাখ গ্রাহক যুক্ত হয়েছে প্রক্রিয়ার মধ্যে। কেবল পণ্য বিক্রি না, আলোচনাকে জীবিত রাখার জন্যও গ্রাহক গুরুত্বপূর্ণ। 

এখনো অফলাইন শপগুলো ভালো করছে। প্রচলিত ধারার ই-কমার্স ওয়েবসাইটও ব্যবসা একেবারে খারাপ করছে না। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিয়ে এসেছে নতুন মাত্রা। প্রতিযোগিতামূলক বাজারে চিত্র বদলে দিয়েছে। সম্ভাব্য ক্রেতাদের হাত করতে প্রতিষ্ঠানগুলো নানা কৌশল ছড়িয়ে যাচ্ছে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোয়। গ্রহণ করছে অনুকূল নীতি, যা ওই অঞ্চলে ই-কমার্স খাতের জন্য আশীর্বাদ হয়ে উঠেছে।