ভারতের বায়ুবিদ্যুৎ উৎপাদন খাতে নতুন রেকর্ড হয়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের মার্চে দেশটির বায়ুবিদ্যুৎ উৎপাদনক্ষমতা ৫০ গিগাওয়াটের মাইলফলক অতিক্রম করেছে। এ সময় নতুনভাবে ৪ হাজার ১৫১ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সংযোজন হয়েছে, যা ২০১৬-১৭ সালের ৫ হাজার ৪০০ মেগাওয়াটের পর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বার্ষিক সংযোজন। খবর দ্য হিন্দু।

গুজরাট ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৯৫৪ দশমিক ৭৬ মেগাওয়াট নতুন উৎপাদনক্ষমতা যোগ করে ভারতের সর্বোচ্চ বায়ুবিদ্যুৎসম্পন্ন রাজ্যের স্থান করে নিয়েছে। রাজ্যটির মোট উৎপাদন সক্ষমতা এখন ১২ হাজার ৬৭৭ মেগাওয়াট। দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে তামিলনাডু, যাদের মোট উৎপাদনক্ষমতা ১১ হাজার ৭৩৯ মেগাওয়াট। সবচেয়ে বায়ুপ্রবাহপূর্ণ এ রাজ্যকেই ভারতীয় বায়ুশক্তি শিল্পের সূতিকাগার বলা হয়।

চলতি অর্থবছরে ভারতের বায়ুবিদ্যুৎ খাতে সর্বোচ্চ সংযোজন হয়েছে কর্ণাটকে ১ হাজার ৩৩১ দশমিক ৪৯ মেগাওয়াট। বর্তমানে রাজ্যটির মোট উৎপাদনক্ষমতা ৭ হাজার ৩৫১ মেগাওয়াট।

আশির দশকে গুজরাটের ভেরাভলে পরীক্ষামূলকভাবে ৪০ কিলোওয়াটের একটি ইউনিট স্থাপনের মাধ্যমে ভারতে বায়ুবিদ্যুৎ প্রযুক্তির সূচনা ঘটে। তবে ১৯৮৬ সালে চেন্নাইয়ের খেমকা পরিবারের প্রতিষ্ঠিত এনইপিসি মাইকনের মাধ্যমে শিল্প হিসেবে এর আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়। পরবর্তী দশকে গুজরাটের টেক্সটাইল ব্যবসায়ী তুলসী তান্তি ‘সুজলন’ প্রতিষ্ঠা করলে খাতটি নতুন গতি পায়।

দুই দশক ধরে বড় জলবিদ্যুৎ প্রকল্প বাদ দিলে বায়ুবিদ্যুৎই ছিল ভারতের প্রধান নবায়নযোগ্য শক্তির উৎস। তবে ২০১০-১১ সালে সৌরশক্তির উত্থানের ফলে এ চিত্র পাল্টে যায়। বর্তমানে ভারতে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন ১০০ গিগাওয়াট ছাড়িয়ে গেছে। সম্প্রতি বায়ুশক্তি খাতে নতুন করে গতি ফিরছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের ৪ হাজার ১৫১ মেগাওয়াট বিদ্যুতের সংযোজন তারই প্রমাণ।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারতে ১২০ মিটার উচ্চতায় টারবাইন স্থাপন করলে সম্ভাব্য উৎপাদন হতে পারে ৬৯৫ গিগাওয়াট, আর মাত্র ৩০ মিটার বাড়িয়ে ১৫০ মিটার উচ্চতায় সেটি স্থাপন করলে উৎপাদন দাঁড়াবে ১ হাজার ১৬৪ গিগাওয়াট, যেখানে এখন মাত্র ৫০ গিগাওয়াটে পৌঁছানো গেছে।

বায়ুশক্তি খাতের অন্যতম পথিকৃৎ মধুসূদন খেমকা বলেছেন, ‘ভারতের বায়ুবিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রতি বছর অনায়াসে ছয় গিগাওয়াট সংযোজন সম্ভব।’ দেশটির ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব উইন্ড এনার্জির সাবেক প্রধান এম পি রমেশ বলেন, ‘৫০ গিগাওয়াট নিঃসন্দেহে একটি মাইলফলক, তবে পরবর্তী ১০০ গিগাওয়াট আরো দ্রুত সময়ে অর্জন সম্ভব।’

ইন্ডিয়ান উইন্ড পাওয়ার অ্যাসোসিয়েশনের ভাইস চেয়ারম্যান ইউবি রেড্ডি বায়ুবিদ্যুৎ উৎপাদনে ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব উইন্ড এনার্জির অবদানের প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, ‘এক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানটির অবদান গুরুত্বপূর্ণ।’ আরেক অভিজ্ঞ শিল্পপতি রমেশ কিমাল বলেন, ‘যখন সৌরবিদ্যুৎ বারবার খবরের শিরোনাম হচ্ছিল, তখন নীরবে টারবাইন ঘুরিয়েছে বাতাস। প্রতিকূল পরিবেশেও এক নিঃশব্দ প্রতিরোধ ও বিপ্লব।’

২০১৭ সালে ভারতের কেন্দ্র সরকার ‘ট্যারিফভিত্তিক প্রতিযোগিতামূলক নিলাম’ চালু করলে রাজ্যভিত্তিক প্রকল্পের পরিবর্তে কেন্দ্রীয় উদ্যোগে গতি আসে। এতে বিদ্যুতের বিক্রিমূল্য ৪ দশমিক ১৬ রুপি থেকে নেমে আসে ২ দশমিক ৫০ রুপির নিচে। তবে টেকসই মডেল না থাকায় অনেক ডেভেলপার প্রকল্প বাতিল করে দেন, ফলে তখন বার্ষিক সংযোজন কমে পায়। ওই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে সরকার ইন্টারস্টেট ট্রান্সমিশন সিস্টেম চার্জ মওকুফ করে দেয়। এতে ডেভেলপারদের যেকোনো স্থানে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে বিক্রির সুযোগ দেয়া হয়। তবে এখনো অধিকাংশ প্রকল্পই গুজরাটে কেন্দ্রীভূত হয়। কারণ সেখানে বাতাসের প্রবাহ ভালো এবং সহজে টারবাইন স্থাপনের জমি পাওয়া যায়। তবে সম্প্রতি ধাপে ধাপে এ মওকুফ প্রত্যাহার শুরু হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, এতে আবার রাজ্যভিত্তিক প্রকল্পের গুরুত্ব বাড়বে।