দেশের পোশাক শ্রমিকদের নিম্নতম মজুরি কাঠামো পর্যালোচনা ও পুনর্নির্ধারণের সময়সীমা নিয়ে আইনগত ব্যাখ্যায় ভিন্নতা দেখা দিয়েছে। সংশোধিত শ্রম আইনে পাঁচ বছরের পরিবর্তে তিন বছর অন্তর মজুরি পর্যালোচনার বিধান নিয়ে মালিক ও শ্রমিক পক্ষের অবস্থানও ভিন্ন। এ অবস্থায় ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে মজুরি বোর্ড পুনর্গঠন, ৩০ নভেম্বরের মধ্যে নতুন নিম্নতম মজুরি নির্ধারণ ও ডিসেম্বর থেকে তা কার্যকর করার দাবি জানিয়েছে ইন্ডাস্ট্রিঅল বাংলাদেশ কাউন্সিল (আইবিসি)। একই সঙ্গে সংশোধিত আইনের ভিত্তিতে দ্রুত মজুরি বোর্ড গঠনের প্রয়োজনীয়তার কথা বলছেন শ্রম অধিকারসংশ্লিষ্টরা। ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে (ডিআরইউ) গতকাল এক সংবাদ সম্মেলনে এসব বিষয় তুলে ধরা হয়।

লিখিত বক্তব্যে আইবিসির সাধারণ সম্পাদক সালাউদ্দিন স্বপন বলেন, ‘পোশাক শিল্পের শ্রমিকদের সর্বশেষ নিম্নতম মজুরি ২০২৩ সালের নভেম্বরে নির্ধারণ করা হয়। সংশোধিত শ্রম আইন অনুযায়ী তিন বছর পর পুনর্নির্ধারণের বিধান থাকলেও নতুন মজুরি নির্ধারণে এখনো মজুরি বোর্ড পুনর্গঠনের দৃশ্যমান উদ্যোগ নেয়া হয়নি।’

আইবিসি জানায়, ২০০৬ সালে পোশাক শ্রমিকদের নিম্নতম মজুরি ছিল ১ হাজার ৬৬২ টাকা ৫০ পয়সা। ২০১০ সালে তা ৩ হাজার, ২০১৩ সালে ৫ হাজার ৩০০, ২০১৮ সালে ৮ হাজার এবং ২০২৩ সালে সাড়ে ১২ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য, বাড়ি ভাড়া ও চিকিৎসা ব্যয় বৃদ্ধির কারণে বর্তমান মজুরিতে শ্রমিকদের জীবনযাপন কঠিন হয়ে পড়েছে বলেও দাবি করে সংগঠনটি। সরকারি কর্মচারীদের নতুন বেতন স্কেলের পর শ্রমিকদের সঙ্গে মজুরি বৈষম্য আরো বেড়েছে বলেও সংবাদ সম্মেলনে উল্লেখ করা হয়। আইবিসি আরো জানায়, ৪ আগস্ট শ্রমমন্ত্রীর কাছে মজুরি বোর্ড পুনর্গঠনের দাবি জানিয়ে চিঠি দেয়া হলেও এখনো কার্যকর উদ্যোগ নেয়া হয়নি।

মজুরি পুনর্নির্ধারণের সময়সীমা নিয়ে ভিন্ন অবস্থান রয়েছে পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রফতানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ)। ১৭ সেপ্টেম্বর এক সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে শ্রম আইন সংশোধন করা হয়েছে। ১২৭টি পয়েন্ট নিয়ে ত্রিপক্ষীয় আলোচনা হয়েছে, যেখানে শ্রমিক ফেডারেশন, সরকার ও উদ্যোক্তারা ছিলেন। ১২৭টি পয়েন্টের মধ্যে ১২৪টিতে আমরা একমত হয়েছিলাম। তিনটি পয়েন্ট নিয়ে আমাদের দ্বিমত ছিল। পরবর্তীকালে তৎকালীন সরকার এটার একটা মাঝামাঝি অবস্থানে এসে সেটা সংশোধন করে দিয়েছে।’

তিনি আরো বলেন, ‘এ সংশোধনীগুলোর মধ্যে অন্যতম একটা বিষয় ছিল, প্রতি পাঁচ বছর পরপর যে নিম্নতম মজুরি পরিবর্তন হয়, সেটা এখন তিন বছর পর হবে। এ জায়গাটা নিয়ে একটা আইনগত ব্যাখ্যার দ্বিমত আছে। আমরা মনে করি, বিগত যে আইন ছিল, পাঁচ বছর শেষ হওয়ার পর তিন বছরে হিসাব শুরু হবে অর্থাৎ ২০২৮ সালে হবে। কেউ কেউ মনে করেন, যেহেতু ২০২৬ সালে আইন সংশোধন হয়েছে, তাহলে সেখান থেকে তিন বছর পর, অর্থাৎ ২০২৯ সালে এটার রিভিশন হবে। আবার কেউ কেউ মনে করেন— না, এটার রেট্রোস্পেক্টিভ ইফেক্ট হতে হবে অর্থাৎ ২০২৩ সাল থেকেই তিন বছরের জন্য গুনতে হবে।’

বিজিএমইএ সভাপতি বলেন, ‘এটা নিয়ে শ্রম মন্ত্রণালয় কাজ করছে, আমরা ইনফরমাল মিটিং করছি। আমাদের লক্ষ্য, আলোচনার ভিত্তিতে সমস্যার সমাধান। শিল্পের সক্ষমতা, শ্রমিকের জীবনমান ও এটা নিয়ে যে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা, আমাদের টিকে থাকা এবং আন্তর্জাতিক মূল্য, সবকিছু আলোচনায় আসবে।’

সংশোধিত আইনের ব্যাখ্যায় মালিক পক্ষের অবস্থানের সঙ্গে দ্বিমত প্রকাশ করেছেন সলিডারিটি সেন্টারের কান্ট্রি প্রোগ্রাম ডিরেক্টর অ্যাডভোকেট একেএম নাসিম। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘সংশোধিত আইনের প্রজ্ঞাপন জারির দিন থেকেই তা কার্যকর হয়েছে। তাই আইন সংশোধন মাঝপথে হওয়ায় আগের পাঁচ বছরের মেয়াদ শেষ না হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে, এ যুক্তির সুযোগ নেই।’

অ্যাডভোকেট নাসিম বলেন, ‘সংশোধিত আইনে তিন বছরের মধ্যে মজুরি কাঠামো পর্যালোচনার সুযোগ রাখা হয়েছে। এ পর্যালোচনার দাবি শ্রমিক বা মালিক পক্ষের পক্ষ থেকে আসতে পারে, আবার নাও আসতে পারে। তবে তিন বছর পূর্ণ হওয়ার পর মজুরি পর্যালোচনা করা হবে কিনা, সে বিষয়ে সরকারের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের বিষয়টি রয়েছে।’ তার ভাষ্য অনুযায়ী, পাঁচ বছর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে বলে মালিক পক্ষ যে ব্যাখ্যা দিচ্ছে, সেটি সংশোধিত আইনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

আইনের ব্যাখ্যা নিয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের (বিআইএলএস) নির্বাহী পরিচালক ও শ্রম সংস্কার কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহমেদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আইন সংশোধন হওয়ার পর এ নিয়ে দুই ধরনের আইনি ব্যাখ্যার সুযোগ নেই। সংশোধিত ধারায় পাঁচ বছরের বিধানের আর কোনো অস্তিত্ব নেই এবং সংসদ তা অনুমোদন করেছে।’

তিনি আরো বলেন, ‘নতুন শ্রম আইন অনুযায়ী মজুরি বোর্ড গঠন করা সরকারের আইনি বাধ্যবাধকতা। বোর্ড গঠন না করলে মালিক ও শ্রমিক পক্ষ উভয়েরই বোর্ড গঠনের দাবি জানানো উচিত। কারণ মজুরি নির্ধারণ শুধু শ্রমিকদের স্বার্থের বিষয় নয়, শিল্প ও মালিক পক্ষের জন্যও একটি নির্ধারিত মজুরি মানদণ্ড জরুরি।’