আন্তর্জাতিক বাজারে প্রায় ১৫ বছরের সর্বোচ্চে অবস্থান করছে চালের দাম। ভারত নন-বাসমতী সাদা চালের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয়ার পরই শস্যটির বাজারদরে উল্লম্ফন দেখা দেয়। এমন বাস্তবতায় এশিয়ার অনেক দেশই স্থানীয় সরবরাহ ও দাম স্বাভাবিক রাখতে রফতানিতে বিধিনিষেধ আরোপ করতে শুরু করেছে। ফলে অঞ্চলটিতে তীব্র খাদ্য সংকটের আশঙ্কা করছে যুক্তরাজ্যভিত্তিক ব্যাংক এইচএসবিসি।
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) তথ্যমতে, বিশ্বজুড়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি খাদ্যশস্য চাল। বিশ্বের অর্ধেক মানুষ যে পরিমাণ ক্যালরি গ্রহণ করে তার ২০ শতাংশই আসে এ শস্য থেকে। আর তথ্যটি এশিয়ার জন্য অনেক বেশি প্রাসঙ্গিক। কারণ বৈশ্বিক উৎপাদনের ৮৫ শতাংশ চালই ব্যবহার হয় এ অঞ্চলে। শস্যটির রেকর্ড মূল্যবৃদ্ধি পুরো বিশ্বের জন্যই হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর এক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে আছে এশিয়া।
এইচএসবিসির অর্থনীতিবিদরা এক প্রতিবেদনে জানান, বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ চাল রফতানিকারক দেশ থাইল্যান্ডে এক বছরের ব্যবধানে শস্যটির দাম প্রায় ৫০ শতাংশ বেড়েছে। দেশটি বর্তমানে প্রতি টন চাল ৬০০ ডলারের বেশি দামে রফতানি করছে। এটিকেই প্রতিবেদনে রেফারেন্স মূল্য হিসেবে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদনটিতে বলা হয়, গত ২৫ বছরে বিশ্বজুড়ে চালের ব্যবহার বেড়ে দ্বিগুণ হয়েছে। ফলে বর্তমান বাজার পরিস্থিতির কারণে এশিয়ার পাশাপাশি বিশ্বের অন্যান্য দেশেও বড় প্রভাব পড়বে।
এইচএসবিসি মনে করছে, চালের দাম বাড়ার পেছনে বড় কারণ অপর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত ও খরা, যা ফসল তোলা, সরবরাহ ও ব্যয়ের দিক থেকে উৎপাদনকে ব্যাহত করেছে। মার্কিন কৃষি বিভাগের দেয়া তথ্যমতে, পৃথিবীর প্রায় ৯০ শতাংশ চালই উৎপাদন হয় এশিয়ায়। বৈরী আবহাওয়ার কারণে এ অঞ্চলের দেশগুলো উৎপাদন নিয়ে চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে।
এল নিনো আবহাওয়া পরিস্থিতির কারণে ভারত ও পাকিস্তানে চাল উৎপাদন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। গত বছর বর্ষা মৌসুমে অপর্যাপ্ত বৃষ্টির কারণে ভারতে মোট উৎপাদন কমে যায়। অন্যদিকে ভয়াবহ বন্যার কারণে পাকিস্তানে উৎপাদন আগের বছরের তুলনায় ৩১ শতাংশ নিচে নেমে আসে।
এদিকে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধও চালের বাজারে অস্থিরতার পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে। এ সংঘাতের ফলে গত বছর সার, বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দাম রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছে বলে জানায় বিশ্বব্যাংক। তার ওপর সরবরাহ চেইনে সংকট তো রয়েছে। এসবের প্রভাবে শস্যটির উৎপাদন খরচ বেড়ে যায় এবং উৎপাদকদের মুনাফা মার্জিনে টান পড়ে।
বৈশ্বিক চাল রফতানিতে প্রথম ভারত। মোট রফতানির ৪০ শতাংশই আসে দেশটি থেকে। জুলাইয়ে ভারত নন-বাসমতী সাদা চাল রফতানির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। স্থানীয় বাজারে পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করার পাশাপাশি মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যেই এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। অন্যদিকে থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনাম স্থানীয় কৃষকদের আয় বাড়ানোর লক্ষ্যে চালের রফতানি মূল্য বাড়িয়ে দেয়।
পিলিপাইন বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ চাল আমদানিকারক। আবাদি জমির অভাব ও অপ্রতুল সরবরাহ চেইনের কারণে দেশটিকে অনেকাংশেই আমদানির ওপর নির্ভর করতে হয়। সম্প্রতি দেশটির সরকার চালের সর্বনিম্ন মূল্যসীমা বেঁধে দিয়েছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, চালের বর্তমান মূল্যবৃদ্ধি ২০০৮ সালের সংকটের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে। ওই বছরের জানুয়ারি থেকে মে মাসের মধ্যে এশিয়ার বাজারে শস্যটির দাম টনপ্রতি ৩০০ ডলার থেকে বেড়ে ১ হাজার ২০০ ডলারে উন্নীত হয়। সে হিসাবে দাম বাড়ে প্রায় ৩০০ শতাংশ। সরবরাহ সংকট প্রকট আকার ধারণ করায় মূল্য বাড়ার এ প্রবণতা অন্যান্য বাজারেও ছড়িয়ে পড়ে। ফলে বেড়ে যায় গমসহ অন্যান্য বিকল্প পণ্যের দামও। চলতি বছরও একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটতে যাচ্ছে বলে মনে করছে এইচএসবিসি ব্যাংক।










