মহামারীর কঠোর বিধিনিষেধ থেকে বেরিয়ে এসেছে চীন। ফলে চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করে দেশটির অর্থনীতি। চলমান বৈশ্বিক সংকটে আশাবাদী করে তুলছিল বিশ্ব অর্থনীতিকে। তবে দ্বিতীয় প্রান্তিকের শুরুতেই সে গতি হারাতে শুরু করেছে। দেশটিতে বাণিজ্যিক উৎপাদন ও খুচরা বিক্রয়ের সূচক প্রত্যাশার চেয়েও নিচে অবস্থান করছে, যা নীতিনির্ধারকদের মধ্যে তৈরি করেছে বাড়তি চাপ। খবর রয়টার্স।

ন্যাশনাল ব্যুরো অব স্ট্যাটিস্টিকসের (এনবিএস) তথ্যানুযায়ী, এপ্রিলে বাণিজ্যিক উৎপাদন বছরওয়ারি ৫ দশমিক ৬ শতাংশ বেড়েছে। মার্চে উৎপাদন বেড়েছিল ৩ দশমিক ৯ শতাংশ। যদিও ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরের পর এটাই সবচেয়ে দ্রুত বৃদ্ধি, তার পরও বিশ্লেষকদের প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। এপ্রিলের প্রাক্কলন ছিল ১০ দশমিক ৯ শতাংশ। খুচরা বিক্রি বেড়েছে ১৮ দশমিক ৪ শতাংশ। যেখানে মার্চে এর হার ছিল ১০ দশমিক ৬ শতাংশ। ২০২১ সালের মার্চের পর এটাই সবচেয়ে দ্রুত বৃদ্ধি। যদিও বিশ্লেষকদের প্রাক্কলন ছিল ২১ শতাংশ। বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহৎ অর্থনীতির দেশে এমন পরিস্থিতি চাপ তৈরি করেছে অর্থনীতি বিশ্লেষকদের মধ্যে।

সাংহাইসহ চীনের প্রধান নগরীগুলো লকডাউনে থাকার কারণে গত বছরের এপ্রিলে অর্থনীতি ছিল স্থবির, যা এশীয় অর্থনীতির দেশটিকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। জোন্স ল্যাং ল্যাসেলের প্রধান অর্থনীতিবিদ ব্রুস প্যাংয়ের মতে, প্রাক্কলনের চেয়ে কম উৎপাদনের তথ্যগুলোই প্রমাণ করে, অর্থনীতি পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়া চালু রাখা বেশ কঠিন। একদিকে বাণিজ্যিক ঝুঁকি বাড়তে দেখা যাচ্ছে, অন্যদিকে মন্থর হয়ে পড়ছে কার্যক্রম। বাড়ছে বেকারত্ব ও কমে আসছে চাহিদা। মূল্যস্ফীতির মতো সমস্যা তো রয়েছেই। দ্বিতীয় প্রান্তিকে বছরওয়ারি অর্থনীতির সূচক উজ্জ্বল দেখালেও তা প্রত্যাশার রেখা পূর্ণ করতে পারেনি।

এপ্রিলে আমদানি সংকুচিত হওয়া ও ব্যাংকঋণের অবনতিতে নীতিনির্ধারকদের ওপর চাপ সৃষ্টি করেছে। চীনের কেন্দ্রীয় ব্যাংক যদিও সুদের হার অপরিবর্তিত রেখেছে, বাজার এখনো প্রত্যাশা অনুযায়ী স্থিতিশীলতা লাভ করেনি। দেশের গড় কয়লা, অ্যালুমিনিয়াম ও অপরিশোধিত ইস্পাত উৎপাদন এপ্রিলে কমেছে। এদিকে ডলারের বিপরীতে মান কমেছে ইউয়ানের। পশ্চিমা ব্যাংক খাতে বড় ধরনের পতন, ঋণ গ্রহণসংশ্লিষ্ট খরচ, উচ্চ অভ্যন্তরীণ দেনা ও ইউক্রেনে চলমান যুদ্ধ সেখানে বড় প্রভাবক হিসেবে কাজ করছে। 

চলতি বছরের প্রথম চার মাসে বছরওয়ারি স্থাবর সম্পত্তিতে বিনিয়োগ বেড়েছে ৪ দশমিক ৭ শতাংশ। যদিও জানুয়ারি-মার্চের বিনিয়োগ বৃদ্ধি ৫ দশমিক ১ শতাংশের তুলনায় কমেছে। বেসরকারি খাতে স্থাবর সম্পত্তিতে বিনিয়োগ বেড়েছে দশমিক ৪ শতাংশ। আবাসন খাতের বিনিয়োগই ছিল মূলত অর্থনীতি বৃদ্ধির প্রধান নিয়ামক। বছরওয়ারি ১৬ দশমিক ২ শতাংশ বেড়েছে বিনিয়োগ। মার্চে খাতটিতে ৭ দশমিক ২ শতাংশ পতন ঘটেছিল বিনিয়োগ। গৌতাই জুনান ইন্টারন্যাশনালের অর্থনীতিবিদ চৌ হাও বলেছেন, অর্থনীতির ওপর থেকে নিম্নমুখী প্রবণতা এত সহজে কমার সম্ভাবনা নেই। 

অন্যদিকে বিভিন্ন কোম্পানির মধ্যে নিয়োগের গতিও ছিল মন্থর। ফলে চাকরিহীন তরুণদের হার ২০ দশমিক ৪ শতাংশ দাঁড়িয়েছে। মার্চে বেকারত্বের হার ছিল ১৯ দশমিক ৬ শতাংশ। পিনপয়েন্ট অ্যাসেট ম্যানেজমেন্টের প্রধান অর্থনীতিবিদ চিওয়েই চাং জানিয়েছেন, অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের এমন পরিস্থিতিতে এসে কার্যকর সিদ্ধান্ত নিতে না পারলে থমকে যাবে অগ্রযাত্রা। আমরা মনে করি, নীতিনির্ধারকরা এক্ষেত্রে কেবল চুপ করে বসে না থেকে এগিয়ে যাবেন। ভূমিকা পালন করবেন অর্থনীতি স্থিতিশীল রাখার ব্যাপারে।