একসময় বিশ্ববাজারে চাল রফতানিতে সবচেয়ে বড় হিস্যা ছিল থাইল্যান্ডের। কিন্তু ২০১১ সালের পর প্রতিযোগিতার বাজারে পিছিয়ে পড়ে দেশটি। রফতানিকারক দেশগুলোর তালিকায় শীর্ষে উঠে আসে ভারত ও ভিয়েতনাম। দীর্ঘ ১০ বছর ধরে নানা উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে থাইল্যান্ড। তবে দেশটি আবারো নিজেদের হারানো গৌরব ফিরে পেতে উদ্যোগী হয়ে উঠেছে।
চাল রফতানি খাত শক্তিশালী করে তুলতে থাইল্যান্ড সরকার বেশকিছু পদক্ষেপ হাতে নিয়েছে। থাই রাইস এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের ‘থিংক রাইস, থিংক থাইল্যান্ড’
প্রচারণা কার্যক্রমে খুব কাছ থেকে কাজ করছে সরকার। এ প্রচারণার মূল উদ্দেশ্য অনলাইনের মাধ্যমে দেশটির চাল রফতানি অগ্রসর করা। কানাডায় এ প্রচারণা এরই মধ্যে সাফল্য পেয়েছে। আরেকটি সফল উদ্যোগ হলো ইন্দোনেশিয়া সরকারের সঙ্গে থাইল্যান্ড সরকারের চুক্তি। এ চুক্তির অধীনে থাইল্যান্ড প্রতি বছর ইন্দোনেশিয়ার কাছে ১০ লাখ টন করে ১৫-২৫ শতাংশ সাদা চাল বিক্রি করবে। আগামী চার বছর পর্যন্ত এ চুক্তি বহাল থাকবে। থাইল্যান্ড সরকার বাংলাদেশ, চীন ও ইরাকসহ আরো বেশ কয়েকটি দেশের সঙ্গে এ ধরনের চুক্তির ব্যাপারে আলাপ-আলোচনা করছে।
তবে চাল রফতানি খাতে এসব পদক্ষেপ আশার আলো দেখালেও সংকট এখনো থাইল্যান্ডের পিছু ছাড়েনি। মুদ্রার উচ্চ বিনিময় মূল্য ও জাহাজীকরণ ব্যয়ের আধিক্যের কারণে চাল রফতানি ২৩ বছরের সর্বনিম্নে নেমেছে। এছাড়া ২০১৯ ও ২০২০ সালে বড় ধরনের দুটি খরা চাল উৎপাদন ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। চলতি বছরও কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাবে রফতানি খাত। এমনটাই ইঙ্গিত দিয়েছে দেশটির রাইস এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন। সংস্থাটির পূর্বাভাস অনুযায়ী, এ বছর দেশটির চাল রফতানি কমে ৫০ লাখ টনে নেমে আসবে। কিন্তু ঘুরে দাঁড়ানোর প্রচেষ্টায় কমতি নেই দেশটির। চলতি বছরের এপ্রিলে থাইল্যান্ড সরকার মন্ত্রিসভার বৈঠকে চাল রফতানিতে আরোপিত সব ধরনের অতিরিক্ত শুল্ক কমিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নেয়। থাইল্যান্ড ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ব্রিটেনে চাল রফতানির ক্ষেত্রে রফতানিকারকদের থেকে টনপ্রতি আড়াই হাজার বাথ গ্রহণ করে থাকে। নতুন পরিকল্পনায় এ শুল্ক কমিয়ে টনপ্রতি ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ বাথে নামিয়ে আনা হয়। এছাড়া চালের উন্নত জাত উদ্ভাবন ও আবাদের বিষয়েও আলোচনা হয় ওই বৈঠকে। উচ্চমানের জাত উদ্ভাবনে পরিকল্পনা রয়েছে কৃষি বিভাগেরও।
মার্কিন কৃষি বিভাগ জানায়, গত বছর থাইল্যান্ডের চাল রফতানি এর আগের বছরের তুলনায় ২৫ শতাংশ কমে গিয়েছিল। এ সময় দেশটি ৫৭ লাখ টন চাল রফতানি করে, যা গত ২৩ বছরের সর্বনিম্ন। এদিকে রফতানিতে এমন পতনের মুখে পড়ায় থাইল্যান্ডকে পেছনে ফেলে বিশ্বের শীর্ষ চাল রফতানিকারক দেশগুলোর তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে উঠে আসে ভিয়েতনাম। অন্যদিকে ঊর্ধ্বমুখী দামের কারণেও রফতানি বাজারে পিছিয়ে পড়ছে থাইল্যান্ডের চাল। যেখানে ভারতীয় ও ভিয়েনামিজ চালের রফতানি মূল্য যথাক্রমে টনপ্রতি ৩৯৩ ও ৫২০ ডলার, সেখানে থাইল্যান্ডের প্রতি টন চালের দাম ৫৪২ ডলার।
আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গণ্যমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, ২০১১ সালের তত্কালীন প্রধানমন্ত্রী ইংলাক সিনাওয়াত্রা কর্তৃক গৃহীত একটি নীতি দেশটির চাল রফতানি খাতকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যায়। এ নীতির আলোকে কৃষকদের ঋণ দেয়ার ক্ষেত্রে উৎপাদিত চাল বন্ধক রাখার সুবিধা চালু করা হয়। এক্ষেত্রে স্থানীয় বাজারের চেয়ে বেশি দামে চাল কিনে নেয় সরকার। ফলে কৃষকরা রফতানিকারকদের পরিবর্তে সরকারের কাছে চাল সরবরাহে আগ্রহী হয়ে ওঠে। এতে চাল রফতানিতে ধস নামে। এরপর ২০১৪ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত ভয়াবহ খরা পরিস্থিতি দেশটির চাল উৎপাদন খাতকে আরো বিপর্যস্ত করে তোলে। কৃষকদের ভূমি মালিকানা সংকটও এ খাতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
তবে মার্কিন কৃষি বিভাগের পূর্বাভাস বলছে, আগামী বছর দেশটির চাল রফতানি চলতি বছরের তুলনায় ২৯ শতাংশ বেড়ে ৯০ লাখ টনে উন্নীত হবে।
সূত্র
: নিক্কেই এশিয়া, ব্যাংকক পোস্ট ও ওয়াল্ডগ্রেইনডটকম










