চলতি সপ্তাহে ভারতীয় চালের রফতানি মূল্য বেড়ে রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে। এর প্রধান কারণ সীমিত সরবরাহ এবং এশিয়া ও আফ্রিকার দেশগুলোয় স্থিতিশীল চাহিদা। অন্যদিকে ভিয়েতনাম ও থাইল্যান্ডের চালের রফতানি মূল্য কিছুটা কমেছে। খবর রয়টার্স। 

ভারত চলতি সপ্তাহে প্রতি টন ৫ শতাংশ ভাঙা সেদ্ধ চাল ৫৩৩-৫৪২ ডলারে রফতানি করছে। আগের সপ্তাহে রফতানি মূল্য ছিল ৫২৫-৫৩৫ ডলার। 

ওলাম এগ্রি ইন্ডিয়ার সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট নিতিন গুপ্ত বলেন, ‘‌‌ভারত সরকার দেশটির কৃষকদের থেকে চাল ক্রয়ের পরিমাণ বাড়িয়েছে। ফলে বেসরকারি খাতের ব্যবসায়ীরা রফতানির জন্য চালের পর্যাপ্ত সরবরাহ পাচ্ছেন না। এছাড়া নতুন মৌসুমের চাল ভাঙানোর কাজ এখনো চলছে। এ কারণে সরবরাহ আরো সীমিত হয়ে পড়েছে।’ 

চলতি অর্থবছর দেশটিতে চাল উৎপাদন কমে যেতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন খাতসংশ্লিষ্টরা। গত আট বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো এমন পরিস্থিতির মধ্যে পড়তে যাচ্ছে ভারত। 

আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দেশটির সরকার খাদ্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে আনার জোর চেষ্টা চালাচ্ছে। উৎপাদন কমার আশঙ্কায় যাতে ফের চালের দাম না বাড়ে, সেজন্য রফতানি নিষেধাজ্ঞা আরো সম্প্রসারণ করা হতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

এদিকে চলতি সপ্তাহে ভিয়েতনাম প্রতি টন ৫ শতাংশ ভাঙা চাল ৬৩০ ডলারে রফতানি করছে। আগের সপ্তাহে রফতানি মূল্য ছিল ৬৫৩ ডলার। অর্থাৎ প্রতি টনে দাম কমেছে ৩ ডলার করে। 

ব্যবসায়ীরা বলছেন, স্থানীয় বাজারে চালের নতুন সরবরাহ আসতে শুরু করেছে। মেকং ডেল্টায় চাল সংগ্রহ শুরু হয়েছে আংশিকভাবে। মার্চে সরবরাহের পরিমাণ সর্বোচ্চে পৌঁছবে। 

হো চি মিন সিটিভিত্তিক এক ব্যবসায়ী বলেন, ‘‌এখন বাণিজ্যিক কার্যক্রম কিছুটা ধীর। ব্যবসায়ীরা শীত-বসন্তকালীন চাল সংগ্রহ শেষ হওয়ায় অপেক্ষায় আছেন। এরপর দাম আরো কমে এলে বেচাকেনার পরিমাণ বাড়বে।’ 

থাইল্যান্ড চলতি সপ্তাহে প্রতি টন ভাঙা চাল ৬৬৩-৬৬৫ ডলারে রফতানি করছে। গত সপ্তাহে রফতানি করা হয়েছিল ৬৬৫ ডলারে। অর্থাৎ এক সপ্তাহের ব্যবধানে দাম সামান্য কিছু কমেছে। 

ব্যবসায়ীদের দেয়া তথ্যমতে, দেশটির মুদ্রা বাথের বিনিময় হার কমে যাওয়ার কারণে রফতানি মূল্য কমেছে। তবে দেশটির চাল বাণিজ্যে চাঙ্গা ভাব বজায় আছে। সম্প্রতি ইন্দোনেশিয়া পাঁচ লাখ টনের ক্রয়াদেশ দিয়েছে। 

বাংলাদেশে চালের দামে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা বজায় আছে। ভালো ফলন ও রেকর্ড মজুদ সত্ত্বেও গত সপ্তাহে দাম উল্লেখযোগ্য হারে বেড়ে যায়। দাম নিয়ন্ত্রণে আনতে অসাধু ব্যবসায়ী ও মজুদদারদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। 

সমাপ্ত ২০২৩ সালে আন্তর্জাতিক বাজারে চালের তীব্র সরবরাহ সংকট ছিল। নতুন বছরের প্রথম দিকেও এ সংকট অব্যাহত থাকবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। ফলে এশিয়াসহ বিশ্বজুড়ে খাদ্যশস্যটির দাম নতুন উচ্চতায় পৌঁছতে পারে।

তথ্য বলছে, গত বছরের শেষ দিকে আন্তর্জাতিক বাজারে চালের দাম বেড়ে ১৫ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছে। শস্যটির দামে এমন উল্লম্ফনের কারণে আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে খাদ্য মূল্যস্ফীতি। এশিয়া ও আফ্রিকায় অনেক নিম্ন ও মধ্য আয়ের দেশের অর্থনীতিতে বাড়ছে ঝুঁকি। 

বিশ্ববাজারে চালের সরবরাহ সংকটের পেছনে অনেকগুলো বিষয়কে দায়ী করছেন বিশ্লেষকরা। এল নিনোর কারণে আবহাওয়ার অপ্রত্যাশিত আচরণ খাতসংশ্লিষ্টদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। কোথাও অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত, আবার কোথাও খরা ব্যাহত করছে শস্যটির আবাদ ও উৎপাদন প্রক্রিয়া। 

অন্যান্য খাদ্যশস্যের উৎপাদন বাড়লেও বিশ্বব্যাপী ২০২৩-২৪ বিপণন মৌসুমে চালের উৎপাদন ১ শতাংশ কমে দাঁড়াতে পারে ৫১ কোটি ১০ লাখ টনে। অন্যান্য মহাদেশে বাড়লেও কৃষিপণ্যটির প্রধান উৎপাদনকারী মহাদেশ এশিয়ায় এবার তা ব্যাপক মাত্রায় কমবে বলে আশঙ্কা ইন্টারন্যাশনাল গ্রেইন কাউন্সিল বা আইজিসির। 

এশিয়ায় ২০২৪ সালে চালের উৎপাদন কমার আশঙ্কা করা হচ্ছে। এল নিনোর প্রভাবে আবহাওয়ায় শুষ্ক অবস্থা বিরাজ করবে, যা মাটির আর্দ্রতা কমিয়ে দেবে। ফলে এশিয়ার শীর্ষ চাল উৎপাদনকারী দেশগুলোয় ফলন ব্যাহত হবে। এতে খাদ্যপণ্যটির মজুদও কমে আসবে। সব মিলিয়ে বাজারে সরবরাহ স্বল্পতার ফলে খাদ্য মূল্যস্ফীতি দেখা দিতে পারে।

বৈশ্বিক চাল বাণিজ্যের সিংহভাগই আসে এশিয়া থেকে। অঞ্চলটির প্রধান রফতানি কেন্দ্রগুলোয় গত বছর চালের দাম ৩০-৪০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। ফিচ সলিউশনের শাখা বিএমআই বলেছে, ‘ভারতীয় চাল রফতানির অনুপস্থিতিতে বড় রফতানিকারকের স্থান নেবে থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনাম। তবে সরবরাহ স্বল্পতার কারণে উভয় দেশের বাজারে দাম থাকবে চড়া।’