দিনাজপুর জেলায় চালকল ব্যবসার ঐতিহ্য শত বছরের। কিন্তু সেই চালকল শিল্প বর্তমানে চরম দুর্দিন পার করছে। খেলাপি ঋণের তালিকায় জেলার অধিকাংশ মালিকের নাম। বর্তমানে জেলার প্রায় ৯০ ভাগ মিল মালিক দেউলিয়া হয়ে গেছেন। মিল চালানোর মতো আর্থিক সক্ষমতা না থাকায় চালকল শিল্পটি মুখ থুবড়ে পড়েছে। 

সংশ্লিষ্ট রাইস মিল মালিকরা বলছেন, ৩০ বছর আগে সরকারের সিদ্ধান্তের কারণে রাইস মিল মালিকরা যে বিপর্যয়ের শিকার হয়েছে সেই সংকট কাটিয়ে উঠতে না পারার কারণেই দিনাজপুরের রাইস মিলগুলো রুগ্‌ণ শিল্পে পরিণত হয়েছে। একই সঙ্গে ব্যাংকের সুদের হার বৃদ্ধি, সরকারের খাদ্যশস্য উৎপাদন ও বিপণন নীতিমালার অদূরদর্শিতা, রাইস মিল মালিকদের প্রতি সরকারের বিমাতাসুলভ মনোভাব, অস্থিতিশীল বাজার ইত্যাদি নানা কারণ দিনাজপুরের চালকল শিল্পের বর্তমান বিপর্যয়ের জন্য দায়ী। একসময় যে ব্যবসায়ীরা মিলে ধান সরবরাহ করতেন, তারাই এখন বাজার থেকে ধান কিনে মিলগুলো চালান। মিল মালিকরা কেবল ক্রাশিং বিল পান। 

জানা গেছে, গত শতকের আশির দশকের শুরু থেকে এ অঞ্চলে বিদ্যুচ্চালিত হাসকিং মিল এবং এরপর পাশাপাশি ভারত ও চায়না থেকে একের পর এক অটো রাইস মিল প্লান্ট বসতে শুরু হয়। বর্তমানে জেলায় হাসকিং মিলের পাশাপাশি শত শত স্বয়ংক্রিয় অটো রাইস মিল বা চালকল গড়ে উঠেছে।

বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, শহরের পূর্ব প্রান্তে দিনাজপুর বাইপাস রাস্তাসংলগ্ন খান অটো রাইস মিল এবং দিনাজপুর সদর উপজেলার আস্করপুর ইউনিয়নের জামালপুর গ্রামে এহিয়া অটো রাইস মিল। উত্তরা ব্যাংক লিমিটেড মালদহপট্টি শাখায় ঋণখেলাপির দায়ে রাইস মিল দুটি দিনাজপুর অর্থঋণ আদালত নিলাম জারি করেছে। বেশ কিছুদিন ধরে ব্যাংক থেকে মাইকিং করা হচ্ছে। উত্তরা ব্যাংকের এক কর্মকর্তা জানান, গৃহীত ঋণের টাকা আদায়ে মামলা করে মাইকিং করেও রাইস মিল কেনার কোনো গ্রাহক পাওয়া যায়নি।

ব্যাংক কর্মকর্তারা বলেন, অনেক রাইস মিল মালিক ব্যবসার একটা বড় পুঁজি রাইস মিল নির্মাণে ব্যয় করেছেন। পরবর্তী সময়ে চলতি মূলধন হিসেবে ব্যাংকের কাছে ঋণ সীমা বাড়িয়ে নিলেও সেই বিপুল অর্থের সুদ পরিশোধ করা আর সম্ভব হয়নি। এভাবে ঋণ সীমাটি ক্রমান্বয়ে খেলাপিতে পরিণত হয়েছে।

দিনাজপুর শিল্প ও বণিক সমিতির সাবেক সভাপতি অটো রাইস মিল মালিক রেজা হুমায়ুন ফারুক চৌধুরী শামীম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘‌দিনাজপুরে হাসকিং ও অটোসহ মোট রাইস মিলের সংখ্যা প্রায় ১ হাজার ৬০০। এর মধ্যে অটো রাইস মিল ২৫০টি। সেমি অটো রাইস মিল আছে পাঁচ শতাধিক। অবশিষ্ট এক হাজারের বেশি রয়েছে হাসকিং মিল ও চাতাল।’

তিনি জানান, দিনাজপুরে আমন, বোরো ও আউশ মৌসুমে যে পরিমাণ ধান উৎপাদন হয়, সেই তুলনায় রাইস মিলের সংখ্যা অনেক বেশি। এছাড়া দেশের প্রতিটি জেলার ধান দিয়ে সেই জেলার চালকলগুলো চলে। ফলে বর্তমানে দিনাজপুরের বেশির ভাগ চালকল বছরের বেশির ভাগ সময় বন্ধ থাকে। এতে মালিকরা সময়মতো ব্যাংকের ঋণ পরিশোধ করতে পারছেন না। 

হরের পুলহাটের চালকল মালিক ও চালের আড়তদার আলী বলেন, ‘‌দীর্ঘদিন ধরে দেশে ধান ও চালের বাজার ভীষণ অস্থিতিশীল। জেলায় ৯০ ভাগ মিল মালিক দেউলিয়া। মিল চালানোর ক্ষমতা নেই।’ অটো রাইস মিল মালিক আমিরুজ্জামান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘‌ধানের অভাবে মিলগুলো যেখানে বছরে ছয় মাসের বেশি চলে না। তার ওপর বড় বড় কোম্পানি বর্তমানে পুরো বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে। আর চালের বাজারের অস্থিতিশীলতার জন্য যত দোষ চাপানো হচ্ছে রাইস মিল মালিকদের ওপর।’ একই মত দিনাজপুরে পুলহাট বিসিক এলাকার অটো রাইস মিল খোদা হাফেজ ইন্ডাস্ট্রিজের মালিক মো. জাহিদ মিঞার। তিনি বণিক বার্তাকে জানান, জেলায় প্রয়োজনের অধিকসংখ্যক রাইস মিল হওয়ার কারণে দিনাজপুর শাখায় তার ঋণ সুদে আসলে ৫ কোটি টাকা হয়ে যায়। পরিশোধ করতে না পারায় ব্যাংক রাইস মিলসহ সম্পত্তি নিলামে তোলে। ব্যাংকের সঙ্গে সমঝোতা করে চিটাগাংয়ের এক পার্টির কাছে ৫ কোটি টাকায় মিল বিক্রি করে পুরো টাকাই ব্যাংকে পরিশোধ করেছেন। কোনো টাকা বাড়িতে আনতে পারেননি। ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে মিল পরিচালনা এবং ব্যবসা করতে গিয়ে বর্তমানে চার ভাই নিঃস্ব হয়ে গেছেন।

দিনাজপুর জেলা চালকল মালিক সমিতির প্রতিষ্ঠাকালীন সভাপতি আব্দুল কাদের সরকার বণিক বার্তাকে বলেন, ‘‌১৯৮৯-৯০ থেকে ২০০১ সালের মধ্যে জেলার চালকলগুলো দেউলিয়া হয়েছে। ১৯৯১ সালে বোরো মৌসুমে গুদামে চাল সরবরাহ করতে জেলার রাইস মিলগুলো সরকারের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়। কিন্তু জুনের শুরুতেই নতুন সরকার ক্ষমতায় এসে একতরফাভাবে সেই চুক্তি ভঙ্গ করে ধান-চাল কেনা বন্ধ ঘোষণা করে। চুক্তিবদ্ধ মিল মালিকদের ঘরে তখন হাজার টন চাল মজুদ। বাজারে মারাত্মক ধস নামে। ২০০ টাকা মণ দরে চাল আর ১০০ টাকা মণ দরে ধানের মূল্য নেমে আসে। দেশের কৃষকরা ফতুর হয়ে যান। মিল মালিকরা দেউলিয়া হয়ে যান। সরকার মিল মালিকদের দেউলিয়াত্বের হাত থেকে রক্ষা করতে নানা প্রতিশ্রুতি দিলেও পরবর্তী সময়ে নিশ্চুপ হয়ে যায়। একসময় ব্যাংক ঋণের সুদের হার ছিল ১৮ শতাংশ। বর্তমানে ৯ শতাংশ হলেও দিনাজপুরের রাইস মিল মালিকরা কোমর সোজা করে দাঁড়াতে পারছেন না।’ 

দিনাজপুর শহরের ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকের ব্যবস্থাপক মামুনুর রশিদ জানান, প্রায় প্রতিটি ব্যাংকের শাখায় পাঁচ-সাতটি রাইস মিল ‘ঋণখেলাপি’র তালিকায় আছে। বহুসংখ্যক রাইস মিল নিলামে বিক্রি হয়ে গেছে। অনেকের বিরুদ্ধে অর্থঋণ আদালতে মামলা চলছে। খেলাপি ঋণের দায়ে শহরের রাজবাড়ী এলাকার ডি ডি অটো রাইস মিল নিলামে ওঠে। ক্রেতা না পেয়ে আদালত থেকে ইউসিবি ব্যাংক নিজেদের নামে রেজিস্ট্রি করে নিয়েছে।

পুলহাট শিল্প এলাকার অগ্রণী ব্যাংক লিমিটেডের ব্যবস্থাপক মো. মকসেদ আলী ও এক্সিম ব্যাংকের ব্যবস্থাপক আহসান হাবীব বণিক বার্তাকে বলেন, ‘‌রাইস মিল ব্যবসাটি হলো অত্যন্ত নিবিড় পর্যবেক্ষণমূলক। যেসব মিল মালিক ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে নিজে বাজার থেকে ধান কিনে মিলে চাল তৈরি করে পণ্য মান এবং বাজারের গতিপ্রকৃতি পর্যবেক্ষণ করে ব্যবসা করছেন তারা খেলাপি হননি। কিন্তু যে মালিকরা কর্মচারীদের ওপর নির্ভর করে ব্যবসা করছেন তারাই আর্থিকভাবে ক্ষতির মুখে পড়েছেন।’