স্থানীয় ভোক্তাদের চাহিদা কমে যাওয়াকে অনেক দিন ধরে চীনের অর্থনীতির জন্য অন্যতম সংকট হিসেবে দেখা হচ্ছে। সাম্প্রতিক তথ্য থেকে দেখা যাচ্ছে, গত মাসে চীনে শিল্পোৎপাদন বেড়েছে ৫ দশমিক ৩ শতাংশ। কিন্তু একই সময়ে খুচরা খাতে বিক্রি বেড়েছে ২ শতাংশ, যা প্রত্যাশার তুলনায় অনেক কম। সামগ্রিক এ চিত্র উঠে এসেছে চলতি বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকের (এপ্রিল-জুন) অর্থনৈতিক প্রতিবেদনে। এ সময় আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৪ দশমিক ৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে চীনে, যা পূর্বাভাসের চেয়ে কম। একই সঙ্গে এটি বার্ষিক প্রবৃদ্ধি লক্ষ্যমাত্রা ৫ শতাংশেরও নিচে। খবর এপি।
গতকাল চলতি পঞ্জিকাবর্ষের দ্বিতীয় প্রান্তিকের আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে চীনা কর্তৃপক্ষ। এর আগে অর্থনীতিবিদরা ৫ দশমিক ১ শতাংশ প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দিয়েছিলেন। এছাড়া জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকের ৫ দশমিক ৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধির চেয়েও উল্লেখযোগ্য মাত্রায় পিছিয়ে আছে এপ্রিল-জুন প্রান্তিক। তবে শিল্পোৎপাদন ও বিনিয়োগে উন্নতির লক্ষণ দেখা যাচ্ছে বলে জানানো হয়েছে প্রতিবেদনে।
কভিড-১৯ মহামারী চলাকালে চীনের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি তীব্রভাবে মন্থর হয়েছিল। এরপর কঠিন লড়াইয়ের মধ্য দিয়েই চলতি বছর কিছুটা গতি লাভ করে দেশটির অর্থনীতি।
সংস্থাটি এক বিবৃতিতে বলেছে, ২০২৪ সালের শুরু থেকেই বৈশ্বিক অর্থনীতির গতি ছিল দুর্বল, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ভূরাজনীতি ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে সংঘাতসহ বেশকিছু সমস্যা বারবার ঘটছে। অভ্যন্তরীণ চাহিদার অপর্যাপ্ততা, সংস্থাগুলোর ওপর চাপ এবং প্রধান কয়েকটি অর্থনৈতিক খাতে ঝুঁকি রয়েছে।
এদিকে অর্থনীতিবিদরা বলছেন, ভোক্তা চাহিদায় মন্দা ও সরকারি ব্যয় কমে যাওয়া বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশটির প্রবৃদ্ধিকে টেনে ধরেছে। এছাড়া ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্রসহ একাধিক অঞ্চলে শুল্ক বাধার মতো পদক্ষেপ সামনে চীনকে ভোগাতে পারে।
সাম্প্রতিক কিছু সূচকের তথ্য অনুযায়ী, চীনের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি স্থিতিশীল হয়েছে। তবে তুলনামূলক হিসাবে জুনে শেষ হওয়া প্রান্তিকে চীনের অর্থনীতি আগের প্রান্তিকের চেয়ে দশমিক ৭ শতাংশ সম্প্রসারণ হয়েছে।
চীনের হালনাগাদ প্রবৃদ্ধি তথ্য এমন একসময় প্রকাশ হলো, যখন অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারণের জন্য দেশটির ক্ষমতাসীন কমিউনিস্ট পার্টির নেতারা একত্র হয়েছেন। রুদ্ধদ্বার বৈঠকে গৃহীত নীতিগুলো শিগগিরই প্রকাশ্যে আসতে পারে।
সাধারণত কমিউনিস্ট পার্টির অধিবেশনে দীর্ঘমেয়াদি ইস্যুর ওপর মনোযোগ দেয়া হয়। আবাসন খাতে দীর্ঘস্থায়ী মন্দা ও অস্থিরতা কভিড-১৯ পরবর্তী সময়ে চীনের অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার অনেকটাই দমিয়ে রেখেছে। এ ইস্যুতে আর কোনো পদক্ষেপ নেয়া হবে কিনা এখন সেদিকে তাকিয়ে আছেন শীর্ষ ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীরা।
গত সপ্তাহে চীন সরকারের প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে জুনে দেশটির রফতানির পরিমাণ ছিল প্রত্যাশার চেয়েও বেশি, যা বাণিজ্য উদ্বৃত্তকে আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। এক বছরের আগের একই সময়ের তুলনায় রফতানি বেড়েছে ৮ দশমিক ৬ শতাংশ। তবে আমদানি কমেছে ২ দশমিক ৩ শতাংশ। বাণিজ্য উদ্বৃত্ত ৮ হাজার ২৬০ কোটি ডলার থেকে বেড়ে মে মাসে হয়েছে ৯ হাজার ৯০০ কোটি ডলার।
পরিসংখ্যান ব্যুরো জানিয়েছে, জুনে কারখানার উৎপাদন বেড়েছে ৫ দশমিক ৩ শতাংশ। এছাড়া আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় জানুয়ারি-মে পর্যন্ত খুচরা বিক্রেতাদের কাছ থেকে ৫ দশমিক ১ শতাংশ পণ্য বেশি কিনেছে মানুষ। মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সমন্বয় ছাড়াই দেখা যাবে ভোক্তাদের ব্যয় বেড়েছে ৫ দশমিক ৪ শতাংশ।
যেকোনো অর্থনীতিতে ভোক্তা চাহিদা বৃদ্ধিকে শক্তিশালী ও টেকসই প্রবৃদ্ধির মূল চাবিকাঠি হিসেবে দেখা হয়। তবে প্রবৃদ্ধিকে কঠিন করে তুলেছে মহামারী চলাকালীন এবং পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন কোম্পানি থেকে কর্মী ছাঁটাই। কারণ ছাঁটাই ও ছাঁটাইয়ের আশঙ্কা খরচ কমাতে প্রলুব্ধ করে।
চীনের অর্থনীতিকে এখনো আবাসন খাতের পতনের ধাক্কা সামলাতে হচ্ছে। হুয়াতাই সিকিউরিটিজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালের প্রথমার্ধে বাড়ি বিক্রি কমে যাওয়া এবং নতুন প্রকল্প শুরু করতে ডেভেলপারদের অনীহার কারণে গত বছরের একই সময়ের তুলনায় চীনের জমি বিক্রি ৩৫ শতাংশ কমেছে।
স্থানীয় সরকার সাধারণত শিক্ষা ও আবাসন খাতে খরচের জন্য জমির নিলাম থেকে প্রাপ্ত রাজস্বের ওপর নির্ভর করে। আয় কমে যাওয়ায় ভুগতে হচ্ছে তাদেরও। কেন্দ্রীয় সরকারের কাছ থেকে বাড়তি বাজেটের প্রয়োজন হওয়ায় ২০২৩ সালে স্থানীয় সরকারকে দেয়া অর্থের পরিমাণ ছাড়িয়ে গেছে ১০ ট্রিলিয়ন ইউয়ান, যা সাধারণ পাবলিক বাজেটের ৩৬ দশমিক ১ শতাংশ।
মিনশেং সিকিউরিটিজের এক প্রতিবেদন গুয়াংডং, নিংজিয়া ও তিয়ানজিনের মতো প্রদেশে ভূমি রাজস্বের উল্লেখযোগ্য হ্রাস তুলে ধরেছে। বলা হয়েছে, গুয়াংডংয়ের রাজস্ব বছরে ৩৪ হাজার ১৫০ কোটি ইউয়ান থেকে ৫ হাজার ৩৭০ কোটি ইউয়ানে নেমে এসেছে। জিয়াংসু, ঝেজিয়াং ও শানডংয়ের মতো অন্যান্য অর্থনৈতিক কেন্দ্রগুলোর রাজস্বও যথেষ্ট কমেছে।










