কয়লার ব্যবহার ক্রমান্বয়ে কমিয়ে আনছে ইউরোপীয় দেশগুলো। অন্যদিকে পরিচ্ছন্ন জ্বালানির দাম কমছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের উন্নত দেশগুলো কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ করে দিচ্ছে। নতুন প্রকল্প এড়িয়ে চলছে এশিয়ার অনেক দেশও। উদ্দেশ্য কয়লার মতো ক্ষতিকর জ্বালানির ব্যবহার পরিহার করা। তবে জ্বালানি পণ্যটির এমন অবস্থার মধ্যেও আশা খুঁজছে রাশিয়া। কয়লা রফতানি বাড়াতে একাট্টা প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। এশিয়ার বাজার ধরার উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা তার, যা বাস্তবায়নে বড় বিনিয়োগ করছে মস্কো। খবর ব্লুমবার্গ।

কয়েক বছরের মধ্যে কয়লা বাণিজ্যে নিজেদের অবস্থান আরো শক্ত করতে চায় রাশিয়া। বিশেষ করে এশিয়ার বাজারে নিজেদের হিস্যা বৃদ্ধির পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে পুতিনের সরকার। এজন্য রেল প্রকল্প উন্নয়নে ১০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করছে দেশটি। এ কাজ দ্রুত শেষ করার জন্য কারাভোগকারী কয়েদিদের ব্যবহারের চিন্তা করছে কর্তৃপক্ষ। যদিও সোভিয়েত যুগের এ প্রথার পুনর্ব্যবহার নিয়ে সমালোচনা হচ্ছে। তবে এটিতে কান দিচ্ছে না মস্কো। তারা মনে করছে, প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে কয়লা রফতানিতে বড় সাফল্য ছুঁতে সক্ষম হবে সরকার।

কয়লা বাণিজ্য নিয়ে রীতিমতো বাজি ধরতে যাচ্ছেন পুতিন। তিনি মনে করেন, এ বাণিজ্যে শেষ পর্যন্ত তারা নিজেদের অবস্থান ধরে রাখতে পারবেন। জ্বালানিটির চাহিদার প্রবৃদ্ধি থাকবে। অন্যান্য দেশে চাহিদায় মন্দা এলেও চীনসহ এশিয়ার বড় বাজারগুলোতে ব্যবহার বাড়বে। আর এ চিন্তা থেকেই ট্রান্স সাইবেরিয়ান ও বৈকাল-আমুর-মেইন লাইন (বিআইএম) রেললাইন প্রসার ও উন্নয়নে কাজ করছে দেশটি। এ রেলপথ পশ্চিম রাশিয়াকে প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের সঙ্গে যুক্ত করেছে।

কয়লা উত্তোলনের প্রধান অঞ্চলগুলোকেও দীর্ঘতম এ দুটি রেল সুবিধার আওতায় আনতে চান পুতিন। এজন্য অঢেল বিনিয়োগে মনোযোগ তার। উদ্দেশ্য কয়লাসহ অন্যান্য পণ্যের কার্গো পরিবহন সক্ষমতা বাড়ানো। এজন্য ২০১৩ সালেই উন্নয়নকাজ শুরু হয়। ৫২০ বিলিয়ন রুবল (স্থানীয় মুদ্রা) বিনিয়োগের আওতায় ২০১৩ সালেই উন্নয়নকাজ শুরু হয়। ফলে এরই মধ্যে এ পথে পণ্য পরিবহনের সক্ষমতা দ্বিগুণের বেশি বেড়েছে, বছরে ১৪ কোটি ৪০ লাখ টন। ২০২৪ সালের মধ্যে এ পথে বছরে ১৮ কোটি ২০ লাখ টন পণ্য পরিবহন করতে চায় দেশটি।

রাশিয়ার কয়লা উত্তোলনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোও সরকারের এ পরিকল্পনা নিয়ে বেশ আশাবাদী। তারা মনে করছে, সবকিছু ঠিক থাকলে এশিয়ার বাজারে কয়লার চাহিদা বাড়বে, এটাই স্বাভাবিক। ইউএমএমসি হোল্ডিং নামে পশ্চিম সাইবেরিয়ার একটি কয়লা কোম্পানির উপপ্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (ডিসিইও) এভজেনি ব্রাগিন বলেন, কয়লা রফতানিতে আমাদের বড় সুযোগ রয়েছে। এ সুযোগ ধরতে রেল অবকাঠামোর উন্নয়ন ও প্রসার করতে হবে।

বিশ্লেষকরাও মনে করছেন, জিডিপিতে কয়লা বাণিজ্যের অবদান বাড়াতে চায় রাশিয়া। এজন্যই এ ধরনের বড় পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে পুতিনের সরকার। টিএস লম্বার্ডের বিশ্লেষক মদিনা ক্রুস্তলেভার মতে, মজুদ কয়লাকে দ্রুত অর্থে রূপান্তর করতে চায় রাশিয়া। খনিতে মজুদের চেয়ে জিডিপিতে এটির অংশ বাড়ুক, রুশ সরকার এখন এমন চিন্তা করছে বলে মনে করেন লন্ডনভিত্তিক প্রতিষ্ঠানটির এ বিশ্লেষক।

তবে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে বিশ্ববাণিজ্যে যখন কয়লার হিস্যা কমে আসছে, তখন জ্বালানি পণ্যটি নিয়ে রুশ সরকারের এমন আশাবাদের শক্তি কোথায়। কীভাবে বাজি ধরার সাহস পাচ্ছেন পুতিন। এ বিষয়ে বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, পুতিনের মূল শক্তিই এখন চীন। দেশটির সঙ্গে রাশিয়ার স্থল সীমান্ত রয়েছে। এছাড়া শি জিন পিংয়ের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক কাজে লাগাতে চান রুশ প্রেসিডেন্ট। অন্যদিকে অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে বেইজিংয়ের উষ্ণ সম্পর্ক এক্ষেত্রে রাশিয়ার জন্য বাড়তি পাওয়া। কারণ বিশ্বের অর্ধেকেরও বেশি কয়লা এককভাবে ব্যবহার করে চীন, যার অন্যতম সরবরাহকারী ছিল ক্যানবেরা। তবে করোনাভাইরাসের উৎস নিয়ে বিতর্কের জেরে দেশটির সঙ্গে চীনের উষ্ণতা রাশিয়ার জন্য এখন সোনায় সোহাগা হয়ে ফিরেছে।

তবে কয়লা বাণিজ্য নিয়ে বড় সম্ভাবনার স্বপ্ন রাশিয়ার জন্য কতটা স্বস্তির হবে, সেটি নিয়ে যথেষ্ট সংশয় আছে। কারণ এরই মধ্যে জাতিসংঘের ইন্টার গভর্নমেন্টাল প্যানেল অন ক্লাইমেট চেঞ্জ (আইপিসিসি) বিশ্বব্যাপী কয়লার ব্যবহার দ্রুত কমিয়ে আনার পরামর্শ দিচ্ছে। জীবাশ্ম জ্বালানিভিত্তিক প্রকল্প না নেয়ার কথা বলছে ইন্টারন্যাশনাল এনার্জি এজেন্সিও (আইইএ)। বৈশ্বিক উষ্ণায়ন রোধে এ উদ্যোগে সাড়া দিচ্ছে অনেক দেশ। এমনকি যে চীনের ওপর নির্ভর করে কয়লা বাণিজ্যের বড় স্বপ্ন দেখছে রাশিয়া, সেই চীনও ২০২৬ সাল নাগাদ জ্বালানিটির ব্যবহার কমিয়ে আনতে চাচ্ছে। এছাড়া চাহিদা মোকাবেলায় অভ্যন্তরীণ উত্তোলনের ওপরও জোর দিচ্ছে বেইজিং। ফলে পুতিনের উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা মস্কোর জন্য শেষ পর্যন্ত হিতে বিপরীত হতে পারে, এমন সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেয়া যাচ্ছে না।