এক দশকের কম সময় আগে অপরিশোধিত জ্বালানি তেল উত্তোলনে রাশিয়া ও সৌদি আরবকে পেছনে ফেলে শীর্ষে উন্নীত হয় যুক্তরাষ্ট্র। এর পর থেকে জ্বালানি পণ্যটির উত্তোলনে আধিপত্য ধরে রেখেছে দেশটি। ওবামা আমলের অনেক নীতি বাতিল করলেও জ্বালানি খাতে এ অবস্থান থেকে সরেননি ডোনাল্ড ট্রাম্প। দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় এলে জ্বালানি আধিপত্য ধরে রাখতে তিনি পিছপা হবেন না। অন্যদিকে এবারের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জো বাইডেন বরাবর জলবায়ু সুরক্ষা ও সবুজ অর্থনীতিতে জোর দিয়ে আসছেন। তবে জয়ী হয়ে হোয়াইট হাউজে গেলে তার পক্ষেও জ্বালানি তেল উত্তোলনে আধিপত্য ধরে রাখার অবস্থান থেকে সরে আসার সুযোগ সীমিত থাকবে বলে মনে করা হচ্ছে।

লন্ডনভিত্তিক প্রতিষ্ঠান আইএইচএস মারকিটের ভাইস চেয়ারম্যান ড্যানিয়েল এয়ারগিন বলেন, রিচার্ড নিক্সন থেকে ডোনাল্ড ট্রাম্প—নয়জন মার্কিন প্রেসিডেন্ট অপরিশোধিত জ্বালানি তেল উত্তোলনে স্বনির্ভর হওয়া ও আধিপত্য প্রতিষ্ঠায় কাজ করেছেন। গত এক দশকে এসব উদ্যোগের সুফল পেয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এবারের নির্বাচনের পর নতুন প্রশাসন চাইলেও হয়তো এ নীতি থেকে সরে আসতে পারবেন না।

চলতি বছরের শুরুতে নভেল করোনাভাইরাসের বৈশ্বিক মহামারী শুরুর আগে যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব কূপগুলো থেকে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দৈনিক গড় উত্তোলন রেকর্ড ১ কোটি ৩১ লাখ ব্যারেলে উঠেছিল। মহামারী শুরুর পর জ্বালানি তেলের চাহিদায় ধস নামে। কমতে থাকে উত্তোলন। এ ধারাবাহিকতায় দেশটিতে জ্বালানি পণ্যটির দৈনিক গড় উত্তোলন এক কোটি ব্যারেলের নিচে নেমে যায়। যদিও মার্কিন প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, গত চার সপ্তাহে দেশটিতে প্রতিদিন গড়ে ১ কোটি ৬ লাখ ব্যারেলের বেশি অপরিশোধিত জ্বালানি তেল উত্তোলন হয়েছে।

আরবিসির বৈশ্বিক পণ্যবাজার কৌশল বিভাগের প্রধান হেলিমা ক্রফট বলেন, জ্বালানি তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস উত্তোলনে আধিপত্য প্রতিষ্ঠায় নেতৃত্ব দিয়েছিল ওবামা প্রশাসন। ট্রাম্প প্রশাসন এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্য আরো এগিয়ে নিয়ে গেছে। এটা ট্রাম্পের অধীনে একটি অনুকূল শিল্প। তিনি এ শিল্পকে চ্যাম্পিয়ন হিসেবে গড়ে তুলেছেন। শক্ত ভিত্তি দিয়েছেন। তবে আধিপত্য ধরে রাখতে গিয়ে পরিবেশ সুরক্ষার বিষয়টিতে অগ্রাধিকার দেননি ট্রাম্প।

অন্যদিকে বাইডেন পরিবেশবান্ধব নীতির প্রচারক। তার নির্বাচনী ইশতেহারে পরিবেশবান্ধব জ্বালানিতে দুই লাখ কোটি ডলারের প্রণোদনা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এ অর্থ জ্বালানি তেল খাতে দেশটির আধিপত্য ধরে রাখতে সহায়তা করবে। তবে জ্বালানি বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বাইডেন নির্বাচনে জয়ী হলে পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর মিথেন নির্গমন সীমিত করে জ্বালানি তেল উত্তোলনে বিধিবিধান বাড়িয়ে তুলতে পারেন।

এ বিষয়ে হেলিমা ক্রফট বলেন, বাইডেন প্রেসিডেন্ট হলে বৈশ্বিক অর্থনীতির সমৃদ্ধি ও যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক স্বার্থ মেনে জ্বালানি তেলের মূল্য নির্ধারণসংক্রান্ত কূটনীতিতে নজর দেবেন। আর ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে জয়ী হলে এ শিল্পকে কৌশলগতভাবে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করবেন। তবে কেউই জ্বালানি তেল উত্তোলনে এখনকার আধিপত্য হাতছাড়া করতে চাইবেন না।

করোনাকালে জ্বালানি তেলের বৈশ্বিক বাজার একটি কঠিন ও অনিশ্চিত সময় পার করছে। সংক্রমণের দ্বিতীয় ঢেউয়ের ঝুঁকিতে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ। শীত মৌসুমে ইউরোপের মতো যুক্তরাষ্ট্র পুনরায় লকডাউনে গেলে জ্বালানি তেলের চাহিদা ফের কমে যাবে। নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বাজারে। এ চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করা ট্রাম্প ও বাইডেন—দুজনের জন্যই কঠিন হবে।

তবে বাইডেন নির্বাচনে জয় পেলে যুক্তরাষ্ট্রের কয়লা খাত চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে। তিনি জ্বালানি পণ্যটির উত্তোলন ও ব্যবহার সীমিত করার পক্ষে। হেলিমা ক্রফট বলেন, বাইডেন প্রশাসন সম্ভবত পরিবেশবান্ধব জ্বালানির জন্য প্রাকৃতিক গ্যাসকে গুরুত্বপূর্ণ সেতু হিসেবে দেখবে এবং কয়লার ব্যবহার কমিয়ে আনবে। তারা প্রাকৃতিক গ্যাসকে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাফতানি উপকরণ হিসেবেও দেখতে পারে। ফলে ইউরোপের দেশগুলো রাশিয়ার প্রাকৃতিক গ্যাস কেনার পরিবর্তে যুক্তরাষ্ট্রের তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) প্রতি ঝুঁকতে পারে।

সিটি গ্রুপের বৈশ্বিক পণ্যবাজার বিভাগের প্রধান ইডি মোর্স বলেন, মার্কিন নির্বাচনের ফল ডিসেম্বরে অনুষ্ঠেয় ওপেক প্লাসের বৈঠকে প্রভাব ফেলতে পারে। বাইডেন জয়ী হলে রাশিয়া ও সৌদি আরবের মধ্যে সম্পর্ককে প্রভাবিত ও দৃঢ় করবে। এতে ওপেক প্লাসের প্রভাবশালী সদস্যরা আরো রক্ষণশীল নীতি নিতে পারে।

তবে হেলিমা ক্রফট এমনটা মনে করছেন না। তার মতে, বাইডেন প্রেসিডেন্ট হলে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সঙ্গে বিস্তৃত পরিকল্পনায় যুক্ত হওয়ার চেষ্টা করতে পারে। অন্যদিকে ট্রাম্প জয়ী হলে ইরানের ওপর সর্বাধিক চাপের নীতি অব্যাহত রাখতে পারে।

অন্যদিকে ইডি মোর্স আশা করছেন, বাইডেন প্রশাসন যেহেতু সবুজ জ্বালানিতে প্রাধান্য দেবে, সেহেতু প্রথম পদক্ষেপে তারা প্যারিস জলবায়ু চুক্তিতে পুনরায় যোগদান করতে পারে। শতভাগ পরিবেশবান্ধব জ্বালানি ব্যবহারের চেষ্টা থাকবে। ২০৫০ সালের মধ্যে পরিবহন ও জ্বালানি খাত থেকে কার্বন ও মিথেন নির্গমন সীমিত করবে।

সিএনবিসি ও অয়েলপ্রাইসডটকম অবলম্বনে