উত্তর মেরুতে বিলাসবহুল ক্রুজের ভ্রমণের জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত ছিলেন দেড় শতাধিক রুশ ধনী। কিন্তু ক্রিপ্টোকারেন্সিতে লেনদেন কেলেঙ্কারিতে রূপ নিলে পুরো ভ্রমণই ভেস্তে যায়। এখন জাহাজ কোম্পানি থেকে অর্থ ফেরত পেতে আয়োজকরা আদালতে অভিযোগ এনেছেন।
এফটির প্রতিবেদন অনুসারে, এ আয়োজনের কেন্দ্রে রয়েছে আইসব্রেকার জাহাজ ‘ল্য কমঁডাঁ শারকো’, যা ফরাসি বিলিয়নেয়ার পিনোঁ পরিবারের কোম্পানি পোনাঁর অধীন।
বরফাচ্ছাদিত উত্তর মেরু ভ্রমণের এ আয়োজনে ছিল বিলাসবহুল অনেক আকর্ষণ। জাহাজটির যাত্রা নরওয়ের সভালবার্ড দ্বীপ থেকে শুরু হওয়ার কথা থাকলেও শেষ মুহূর্তে তা বাতিল হয়ে যায়। এখন বিষয়টি ফরাসি আদালতে গড়িয়েছে।
পুরো জাহাজটি ভাড়া নিয়েছিল দুবাইভিত্তিক রুশ মালিকানাধীন ট্রাভেল কোম্পানি টিআরভিএল। পরে যুক্তরাষ্ট্রে এক রুশ ক্রিপ্টো উদ্যোক্তা গ্রেফতার হলে পুরো ভ্রমণই বাতিল করে পোনাঁ।
গ্রেফতার ক্রিপ্টো উদ্যোক্তা ইউরি জর্জ গুগনিন ইভিটা ইনভেস্টমেন্টস নামে একটি পেমেন্ট ব্রোকার চালাতেন। এ কোম্পানির মাধ্যমেই লেনদেন হয়েছিল টিআরভিএল ও পোনাঁর মধ্যে। ৫০ কোটি ডলারের বেশি অর্থপচার ও রাশিয়াকে সংবেদনশীল মার্কিন প্রযুক্তি পাইয়ে দেয়ার অভিযোগে এফবিআইয়ের হাতে গ্রেফতার হন ইউরি।
টিআরভিএলের অভিযোগ, ভ্রমণ বাতিল করলেও এরই মধ্যে দেয়া ৮৫ লাখ ডলারের ৫৮ লাখ ডলার ফেরত দেয়নি পোনাঁ।
এ ভ্রমণের দৈর্ঘ্য ছিল দুই সপ্তাহ। যাত্রার অষ্টম দিনে উত্তর মেরুতে ভিড়ত জাহাজ। যাত্রীরা বরফে নেমে ডিজে মিউজিক, বরফে সাঁতার আর গ্রিল বারের মাধ্যমে এক ‘লিজেন্ডারি সেলিব্রেশন’ পার্টিতে অংশ নিতেন। এছাড়া রুশ ব্যান্ড লেনিনগ্রাদ ছিল পুরো আয়োজনের বিশেষ আকর্ষণ।
যাত্রীদের তালিকাও চোখ ধাঁধানো। সেখানে নাম রয়েছে গ্যাজপ্রম গ্যাস স্টেশনের সাবেক কর্মকর্তা, ইয়ানডেক্সের এআই গবেষক, এক জনপ্রিয় টিভি উপস্থাপক, রেস্তোরাঁ ব্যবসায়ী, কৌতুকশিল্পীসহ আরো অনেকে। জাহাজের প্রারম্ভিক কেবিন ভাড়া ছিল ৭০ হাজার ডলার, সবচেয়ে দামি রুমের ভাড়া ছিল ২ লাখ ডলার।
অবশ্য ভ্রমণ পরিকল্পনার শুরু থেকেই কিছু ঝামেলার আভাস দেখা যাচ্ছিল। গত জুলাইয়ে আর্কটিক অঞ্চলের সংবাদমাধ্যমে এ বিলাস ভ্রমণের খবর প্রকাশ হয়। তখন ২ হাজার ৬০০ বাসিন্দা অধ্যুষিত সভালবার্ড দ্বীপে ক্রুজটি নিয়ে প্রতিবাদের সুর চড়ে ওঠে। এর কারণ হলো ইউক্রেনের বিরুদ্ধে রাশিয়ার যুদ্ধ। অন্যদিকে পোনাঁ চাইছিল, তাদের মালিক পিনোঁ পরিবারের নাম যেন রুশভাষী প্রচারণা থেকে সরিয়ে দেয়া হয়।
ভ্রমণ ভেস্তে যাওয়ার পর পোনাঁ ও টিআরভিএল পরষ্পরের বিরুদ্ধে ব্যর্থতার দায় চাপাচ্ছে। পোনাঁ বলছে, লেনদেনের চ্যানেল হিসেবে ইভিটা ইনভেস্টমেন্টসের ব্যবহার ছিল গুরুতর কমপ্লায়েন্স ব্যর্থতা, যা পুরো চুক্তিকে অবৈধ করেছে। তাই পোনাঁ অর্থ ফেরত দিতে বাধ্য নয়। অন্যদিকে টিআরভিএলের দাবি, পোনাঁই প্রথমে ব্রোকার ব্যবহার করতে বলেছিল, তারা অনুমোদনও দিয়েছিল। তাই টিআরভিএলের ওপর কোনো দায় পড়ে না।
এদিকে টিআরভিএলের আইনজীবী বলেছেন, ভ্রমণ বাতিল হওয়া কোম্পানির জন্য পুরোপুরি বিপর্যয়কর পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। কারণ ১৬৫ জন যাত্রী এরই মধ্যে অর্থ পরিশোধ করেছেন, তারা চাইলে মামলা করতে পারেন।
পিনোঁ পরিবার ফ্রান্সের অন্যতম ধনী পরিবার। তাদের মালিকানাধীন হোল্ডিং কোম্পানি আর্টেমিসের অধীনে রয়েছে বিলাসবহুল ব্র্যান্ড গুচি, সাঁ লরাঁ, নিলাম প্রতিষ্ঠান ক্রিস্টিজ ও হলিউড এজেন্সি সিএএর। ২০১৫ সালে পোনাঁ কিনে নেয় পিনোঁ পরিবার। পোনাঁর বহরে সবচেয়ে বিলাসবহুল জাহাজ ল্য কমঁডাঁ শারকো। উত্তর মেরুতে এ ধরনের ভ্রমণ আয়োজন উচ্চাভিলাষী হলেও টিআরভিএল প্রায় সাফল্যের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গিয়েছিল। কিন্তু ইউরির গ্রেফতার ও রাজনৈতিক টানাপড়েন পুরো আয়োজনে জল ঢেলে দিল।










