বেশ কয়েক বছর ধরেই মন্দা পরিস্থিতির মধ্যে রয়েছে দেশের পুঁজিবাজার। আস্থাহীনতার কারণে প্রায় দুই বছর ধরে প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের (আইপিও) মাধ্যমে নতুন কোনো কোম্পানি তালিকাভুক্ত হয়নি। এ অবস্থায় ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে একটি রাজনৈতিক সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর পুঁজিবাজার পরিস্থিতির পরিবর্তন হবে বলে প্রত্যাশা করছেন বিনিয়োগকারীরা। রাজনৈতিক দলগুলো তাদের নির্বাচনী ইশতাহারে পুঁজিবাজার সংস্কার, কারসাজি বন্ধ ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দিয়ে রেখেছে।
আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে মূলত বাংলাদেশ জাতীয়বাদী দল (বিএনপি) ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন জোটের মধ্যে। এরই মধ্যে প্রধান এ দুই রাজনৈতিক দল তাদের প্রকাশিত ইশতাহারে পুঁজিবাজার নিয়ে বিভিন্ন পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে। পাশাপাশি জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর গড়ে ওঠা তরুণদের রাজনৈতিক প্লাটফর্ম জাতীয় নাগরিক পার্টিও (এনসিপি) তাদের নির্বাচনী ইশতাহারে পুঁজিবাজার উন্নয়নে নানা উদ্যোগের কথা বলেছে।
বিএনপি তাদের নির্বাচনী ইশতাহারে পুঁজিবাজার সংস্কার ও উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এক্ষেত্রে দলটি বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের স্বাধীনতা ও স্বায়ত্তশাসন, পুঁজিবাজার সংস্কার কমিশন গঠন, পুঁজিবাজারে স্বচ্ছতা আনার পাশাপাশি কারসাজি বন্ধ করা, শক্তিশালী বন্ড ও ইকুইটি মার্কেট গঠন, করপোরেট বন্ড ও সুকুক প্রবর্তন, প্রবাসীদের জন্য ইনভেস্টমেন্ট গেটওয়ে চালু করা, ব্লকচেইন প্রযুক্তির ব্যবহার ও বিদেশী বিনিয়োগ বাড়ানো, পুঁজিবাজারে প্রবেশাধিকার সহজলভ্য করা, স্টার্টআপ ও এসএমই খাতের জন্য ডিজিটাল আইপিও এক্সপ্রেস ব্যবস্থা চালু করা, পুঁজিবাজার ট্রাইব্যুনাল গঠন এবং শিক্ষার্থীদের মধ্যে পুঁজিবাজার-সংক্রান্ত শিক্ষার প্রসারে উদ্যোগ নেয়ার অঙ্গীকার করেছে।
পুঁজিবাজারে সব ধরনের অনিয়ম ও কারসাজি বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেয়ার পাশাপাশি আস্থাহীনতা দূর করে পুঁজিবাজারকে কার্যকর ও গতিশীল করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। সেই সঙ্গে পুঁজিবাজার কেলেঙ্কারির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিচারের আওতায় আনার কথা বলছে দলটি।
জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে পুঁজিবাজার নিয়ে বিশদ পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেছে। দলটি আগামী পাঁচ বছরে বাজার মূলধন ও জিডিপির অনুপাত ৫০ শতাংশে উন্নীত করা, বন্ড মার্কেট ফার্স্ট কৌশলের মাধ্যমে অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য ব্যাংক ঋণের বদলে বন্ড, সুকুক ও রিয়েল এস্টেট ইনভেস্টমেন্ট ট্রাস্টের ওপর জোর দেয়ার কথা বলছে। শর্ট সেলিং, ইন্ট্রা ডে ট্রেডিং, কমোডিটি ডেরিভেটিভস ও ডিজিটাল কারেন্সি ট্রেডিং চালুর প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে। ইনসাইডার ট্রেডিং ও কারসাজি রোধে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসির প্রয়োগক্ষমতা জোরদার, আধুনিক ফরেনসিক অ্যানালিটিকস ও প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি চালু করবে বলে ইশতাহারে উল্লেখ করেছে এনসিপি। পুঁজিবাজারের মামলার দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য আলাদা বেঞ্চ গঠন, ভুল প্রতিবেদন বা জালিয়াতির ক্ষেত্রে অডিট ফার্মের লাইসেন্স বাতিল ও কঠোর জরিমানার বিধান, অডিটর রোটেশন ও স্বাধীন পরিচালকদের ভূমিকা কার্যকর করা, পেনশন ফান্ড, গ্র্যাচুইটি ফান্ড ও লাইফ ফান্ডকে করছাড়ের মাধ্যমে বাজারে নিয়ে আসা, বিনিয়োগকারীর ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করতে আলাদা ন্যায়পাল নিয়োগ এবং ইনভেস্টর প্রোটেকশন ফান্ড শক্তিশালী করার কথা বলছে দলটি। সরকারি কোম্পানিগুলোর তালিকাভুক্তি এবং ভালো মানের বেসরকারি কোম্পানির জন্য কর প্রণোদনার পাশাপাশি ডুয়াল ও ক্রস-লিস্টিংয়ের মাধ্যমে বাংলাদেশের পুঁজিবাজারকে আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে যুক্ত করার পাইলট উদ্যোগ গ্রহণেও প্রতিশ্রুতি দিয়েছে এনসিপি।
রাজনৈতিক দলগুলোর ইশতাহারে পুঁজিবাজারের উন্নয়ন ও সংস্কারের ইস্যু অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়টিকে স্বাগত জানিয়েছেন পুঁজিবাজারের অংশীজনেরা। পুঁজিবাজারের স্টক ব্রোকারদের সংগঠন ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ডিবিএ) গতকাল এক বিবৃতিতে নির্বাচনী ইশতাহারে পুঁজিবাজার সংস্কার ও উন্নয়নমূলক পরিকল্পনা অন্তর্ভুক্ত করায় বিএনপি ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর প্রতি সন্তোষ প্রকাশের পাশাপাশি দল দুটির শীর্ষ নেতৃত্বসহ নীতিনির্ধারকদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন ডিবিএর প্রেসিডেন্ট সাইফুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘অতীতে রাজনৈতিক দলগুলো পুঁজিবাজারকে যথাযথ গুরুত্ব দেয়নি। দীর্ঘদিন ধরে ডিবিএ সরকারের পাশাপাশি বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে বৈঠক, সভা ও সেমিনারের মাধ্যমে পুঁজিবাজারকে একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক খাত হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া এবং নীতিগত সহায়তা প্রদানের দাবি জানিয়ে আসছে। দেশের ইতিহাসে এই প্রথম রাজনৈতিক দলগুলো পুঁজিবাজারকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে নির্বাচনী ইশতাহারে অন্তর্ভুক্ত করেছে এবং এ খাতের সংস্কার ও উন্নয়ন নিয়ে সুস্পষ্ট পরিকল্পনা জনগণের সামনে উপস্থাপন করেছে।’ ঘোষিত ইশতাহারের যথাযথ বাস্তবায়নের মাধ্যমে পুঁজিবাজারের টেকসই উন্নয়ন, সুশাসন প্রতিষ্ঠা, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি, বাজারে আস্থা পুনরুদ্ধার এবং সামগ্রিক গতিশীলতা আরো ত্বরান্বিত হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।










