বিশ্বের শীর্ষ কয়লা উত্তোলন ও রফতানিকারী দেশগুলোর তালিকায় রাশিয়া অন্যতম। আগামীতে জ্বালানি পণ্যটির উত্তোলন ও রফতানি আরো বাড়ানোর পরিকল্পনা করেছে দেশটি। এ ধারাবাহিকতায় ২০৩৫ সাল নাগাদ কয়লার আন্তর্জাতিক রফতানি বাণিজ্যে নিজেদের হিস্যা বাড়িয়ে ২৫ শতাংশে উন্নীত করার রূপরেখা তৈরি করেছে রাশিয়া। জ্বালানি পণ্যটির রফতানি বাণিজ্যে দেশটির বর্তমান হিস্যা ১১ শতাংশ। অর্থাৎ আগামী ১৫ বছরের মধ্যে পণ্যটি রফতানি দ্বিগুণের বেশি বাড়ানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে দেশটি। খবর রাশিয়া টুডে ও রয়টার্স।

রাশিয়ার জ্বালানি মন্ত্রণালয় থেকে ইস্যু হওয়া রাষ্ট্রীয় কৌশলগত একটি খসড়া দলিল অনুসারে, ২০২৪ সালের মধ্যে কয়লার বার্ষিক উত্তোলন বাড়িয়ে ৪৪ কোটি ৮০ হাজার টন থেকে ৫৩ কোটি টনে উন্নীত করার সক্ষমতা অর্জন করতে পারে দেশটি। ২০৩৫ সাল নাগাদ জ্বালানি পণ্যটির উত্তোলন আরো বাড়িয়ে বছরে ৪৮ কোটি ৫০ হাজার টন থেকে ৬৬ কোটি ৮০ লাখ টনের রেকর্ড ছুঁতে পারে রাশিয়া।

উত্তোলন বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে এ সময় কয়লার আন্তর্জাতিক রফতানি বাণিজ্যে দেশটির অবস্থান আরো শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে। বিশেষত এশিয়া প্যাসিফিকের দেশগুলো, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, মধ্য এশিয়া ও আফ্রিকার দেশগুলোতে কয়লা সরবরাহে রাশিয়ার অবস্থান আরো পোক্ত হতে উঠতে পারে। তবে এ সময় বসে থাকবে না দেশটির অভ্যন্তরীণ চাহিদা। আগামী বছরগুলোতে দেশটিতে পণ্যটির অভ্যন্তরীণ চাহিদাতেও ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা দিতে পারে। রাশিয়ার জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশটি বছরে ১৯ কোটি ৬০ লাখ টনের মতো কয়লা ব্যবহার করে। এক দশকের মধ্যে দেশটিতে জ্বালানি পণ্যটির ব্যবহার বর্তমানের তুলনায় ১২ শতাংশ বাড়তে পারে।

আগামীতে চীন হয়ে উঠতে পারে রাশিয়ার কয়লা রফতানি বাণিজ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ। এরই মধ্যে দেশটি থেকে চীনের বাজারে পণ্যটির রফতানি উল্লেখযোগ্যহারে বেড়েছে। বর্তমানে প্রতি বছর বেইজিংয়ে গড়ে তিন কোটি টনের বেশি কয়লা রফতানি করেন মস্কোর রফতানিকারকরা। আগামী বছরগুলোতে এ রফতানি আরো বৃদ্ধির জোরালো সম্ভাবনা রয়েছে। রাশিয়ার জ্বালানি মন্ত্রণালয় প্রত্যাশা করছে, আগামী ১৫ বছরের মধ্যে বর্তমানের তুলনায় চীনে পণ্যটির রফতানি বাড়িয়ে প্রায় দ্বিগুণে উন্নীত করতে সক্ষম হবে তারা। ২০৩৫ সাল নাগাদ চীনে বছরে গড়ে ৫ কোটি ৫০ লাখ টন কয়লা রফতানির পরিকল্পনা রয়েছে দেশটির।

চীনের বাইরে এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে এ সময় রাশিয়ার কয়লা রফতানির অন্যতম বাজার হয়ে উঠতে পারে ভারত। ২০৩৫ সালের মধ্যে রাশিয়া থেকে ভারতে কোকিং কোলের রফতানি ব্যাপক হারে বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। পণ্যটির রফতানিতে পরবর্তী ধাপে থাকতে পারে ভিয়েতনাম। নতুন কয়েকটি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু করার উদ্দেশ্যে ভিয়েতনাম এরই মধ্যে দেশটি থেকে তিন গুণের বেশি কয়লা আমদানি বাড়িয়েছে। ভবিষ্যতেও এ ধারা অব্যাহত থাকতে পারে বলে মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।

এছাড়া মার্কিন এনার্জি ইনফরমেশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (ইআইএ) পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী এক দশকের মধ্যে ইন্দোনেশিয়াকে টপকে বিশ্বের শীর্ষ কয়লা রফতানিকারক দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে রাশিয়া।

রাাশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ শিল্প খাতের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরেই কয়লার অবস্থান প্রথম সারিতে। জ্বালানি পণ্যটির সাশ্রয়ী উত্তোলন খরচে রাশিয়া বিশ্বের শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে, যা পণ্যটির রফতানি বাণিজ্যে দেশটিকে বাড়তি সুবিধা দিয়েছে। সর্বনিম্ন উত্তোলন খরচের সঙ্গে সহজ ও সাশ্রয়ী পরিবহন ব্যবস্থা দেশটি থেকে জ্বালানি পণ্যটির রফতানি মূল্য আরো কমিয়ে এনেছে। এতে অস্ট্রেলিয়া ও দক্ষিণ আফ্রিকাসহ বিশ্বের অন্যান্য শীর্ষ কয়লা রফতানিকারী দেশগুলোর সঙ্গে রাশিয়ার প্রতিযোগিতা আরো সহজ হয়ে গিয়েছে। ফলে আগামীতে পণ্যটি নিয়ে দেশটির উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা একেবারে অসম্ভব নয় বলে মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।

গত বছরও দেশটির কয়লা রফতানি খাতে প্রবৃদ্ধি বজায় ছিল। রাশিয়ার ফেডারেল কাস্টমস সার্ভিসের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সালে দেশটি থেকে সব মিলিয়ে ২০ কোটি ৫৩ লাখ ৯০ হাজার টন কয়লা আন্তর্জাতিক বাজারে রফতানি হয়েছিল। ২০১৮ সালের তুলনায় গত বছর দেশটি থেকে পণ্যটির রফতানি প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছিল ২ দশমিক ৯ শতাংশ।

তবে চলতি বছরের শুরু থেকেই দেশটি থেকে কয়লা রফতানিতে মন্দা ভাব বজায় রয়েছে। নভেল করোনাভাইরাসের প্রকোপে বৈশ্বিক পরিবহন ব্যবস্থা এলোমেলো হয়ে পড়া এক্ষেত্রে মূল প্রভাবক হিসেবে কাজ করেছে বলে মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা। ২০২০ সালের প্রথম দুই মাসে (জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি) রাশিয়া থেকে কয়লা রফতানি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১০ দশমিক ২ শতাংশ কমে গেছে। এ সময় দেশটি সব মিলিয়ে ২ কোটি ৬৫ লাখ ৯০ হাজার টন কয়লা আন্তর্জাতিক বাজারে রফতানি করেছে। চলতি বছরের প্রথম দুই মাসে জ্বালানি পণ্যটির রফতানি থেকে দেশটি আয় করেছে মোট ১৭৫ কোটি ডলার, আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় যা ৩২ দশমিক ৩ শতাংশ কম।

দেশটি থেকে এ সময় কয়লা রফতানি হ্রাসের অন্যতম প্রধান কারণ ছিল দক্ষিণ কোরিয়ার আমদানি হ্রাস। বিশ্বের চতুর্থ শীর্ষ কয়লা রফতানিকারক দেশটি রাশিয়া থেকে প্রতি বছর প্রচুর কয়লা আমদানি করে থাকে। চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে (জানুয়ারি-মার্চ) দক্ষিণ কোরিয়ায় জ্বালানি পণ্যটির আমদানি কমে গত এক দশকের সর্বনিম্নে নেমে গিয়েছে।