মহামারীর শুরু থেকেই জিরো কভিড নীতি অব্যাহত রেখেছে চীন। বার বার লকডাউন আরোপ বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতিজুড়ে স্থবিরতা তৈরি করছে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট বিশ্বজুড়ে নিম্নমুখী চাহিদা দেশটির উৎপাদন খাতেও অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। এছাড়া প্রযুক্তি খাতে সরকারের নিয়ন্ত্রণ এবং আবাসন খাতে দীর্ঘস্থায়ী মন্দার কারণে মূল ভূখণ্ড ও হংকংয়ের পুঁজিবাজারে দরপতন ঘটছে নিয়মিতই। এ অবস্থায় চীনা অতিধনীরা নিজেদের সম্পদ কমতে দেখছেন। চলতি বছর তাদের সম্পদে দুই দশকের বেশি সময়ের মধ্যে সবচেয়ে বড় পতন হয়েছে। গতকাল প্রকাশিত একটি বার্ষিক ধনীর তালিকায় এ তথ্য উঠে এসেছে।

গবেষণা প্রতিষ্ঠান হারুন রিস লিস্ট ৫০০ কোটি ইউয়ান (৬৯ কোটি ২০ লাখ ডলার) বা তার বেশি সম্পদ থাকা চীনাদের র‌্যাংকিং প্রকাশ করে থাকে। চীনের শীর্ষ ধনীদের র‌্যাংকিং  প্রকাশ করা প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, চলতি বছর এ পরিমাণ সম্পদ থাকা চীনার সংখ্যা ১ হাজার ৩০৫ জনে নেমেছে। ৫০০ কোটি ইউয়ানের বেশি অর্থের মালিকানা থাকা চীনাদের এ সংখ্যা গত বছরের তুলনায় ১১ শতাংশ কমেছে। তাদের সম্মিলিত সম্পদের পরিমাণ ৩ লাখ ৫০ হাজার কোটি ডলারে দাঁড়িয়েছে। মোট সম্পদের পরিমাণও গত বছরের তালিকা থেকে ১৮ শতাংশ কম।

এদিকে ১ হাজার কোটি ডলারের বেশি সম্পদ থাকা চীনাদের সংখ্যাও ব্যাপকভাবে কমে গিয়েছে। চলতি বছর এমন অতিধনীদের সংখ্যা মাত্র ২৯ জনে নেমেছে। গত বছর এ সংখ্যা ৫৬ জনে ছিল। পাশাপাশি ডলারের হিসাবে দেশটিতে বিলিয়নেয়ারের সংখ্যাও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। ১০০ কোটি ডলারের বেশি সম্পদ থাকা চীনাদের সংখ্যা চলতি বছর ৯৪৬ থেকে কমে ২৩৯ জনে দাঁড়িয়েছে।

এ র‌্যাংকিং প্রকাশ করা হারুন রিপোর্টের চেয়ারম্যান ও প্রধান গবেষক রুপার্ট হুজওয়ার্ফ বলেন, চলতি বছর হারুন চায়না লিস্টে চীনাদের সম্পদের পরিমাণ গত দুই যুগের মধ্যে সবচেয়ে বড় পতন হয়েছে।

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি চীনাদের সম্পদের পরিমাণ সংকুচিত করতে ভূমিকা রেখেছে। পাশাপাশি কঠোর কভিডজনিত বিধিনিষেধ, রিয়েল এস্টেট খাতে দীর্ঘস্থায়ী মন্দা এবং চীনের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে ধীরগতি তাদের সম্পদের পতনকে ত্বরান্বিত করেছে। তাছাড়া সরকারের কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ আলিবাবা ও টেনসেন্টের মতো চীনের প্রযুক্তি জায়ান্টের শেয়ারদরে আঘাত করেছে। সম্প্রতি প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং তৃতীয় মেয়াদে ক্ষমতা পাকাপোক্ত করার পর বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগও চীনা ধনীদের সম্পদের পতনে সহায়তা করেছে। কারণ গত কয়েক সপ্তাহে হংকং ও চীনের মূল ভূখণ্ডের পুঁজিবাজারগুলোয় শেয়ারদর নিম্নমুখী রয়েছে।

চীনা অতিধনীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি সম্পদ কমেছে ইয়াং হুইয়ানের। গত এক বছরে তার সম্পদ ১ হাজার ৫৭০ কোটি ডলার কমেছে। তিনি চীনের বৃহত্তম ডেভেলপার প্রতিষ্ঠান কান্ট্রি গার্ডেনের সংখ্যাগরিষ্ঠ শেয়ারহোল্ডার। একসময় চীনের দ্রুত প্রবৃদ্ধির চালক এ খাতটি পর্বতসম ঋণে ধুঁকছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এ সংকট আরো বাড়ার কারণে খাতসংশ্লিষ্ট বিনিয়োগকারীদের সম্পদও নিম্নমুখী রয়েছে।

চলতি বছর চীনা ধনীদের এ র‌্যাংকিংয়ে দ্বিতীয় বছরের মতো প্রথম স্থানে জায়গা করে নিয়েছেন জং শ্যানশেন। পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত বোতলজাত পানি নোংফু স্প্রিং এবং টিকা প্রস্তুতকারক বেইজিং ওয়ানটাই বায়োলজিক্যাল ফার্মেসি এন্টারপ্রাইজের মালিকানায় থাকা শ্যানশেনের সম্পদ ১৭ শতাংশ বেড়ে ৬ হাজার ৫০০ কোটি ডলারে উন্নীত হয়েছে।

র‌্যাংকিংয়ে দ্বিতীয় শীর্ষ ধনী হিসেবে জায়গা পেয়েছেন টিকটকের মালিকানা প্রতিষ্ঠান বাইটডান্সের প্রতিষ্ঠাতা জং ইমিং। যদিও গত এক বছরে তার সম্পদ কমে গিয়েছে। পুঁজিবাজারে বাইটডান্সের শেয়ারদরে পতনের কারণে তার সম্পদ গত বছরের তুলনায় ২৮ শতাংশ কমে ৩ হাজার ৫০০ কোটি ডলারে দাঁড়িয়েছে।

শীর্ষ ধনীদের এ র‌্যাংকিংয়ে তৃতীয় স্থানে রয়েছেন চীনা ব্যাটারি জায়ান্ট সিএটিএলের চেয়ারম্যান জেং ইউসুন। এছাড়া গত এক বছরে প্রযুক্তি জায়ান্ট টেনসেন্টের প্রতিষ্ঠাতা পনি মার সম্পদ দ্বিতীয় সর্বোচ্চ কমেছে। প্রযুক্তি স্টকের মূল্য পতনের কারণে তার সম্পদ ১ হাজার ৩৬০ কোটি ডলার কমেছে। সর্বশেষ র‌্যাংকিংয়ে পনি মার অবস্থান পঞ্চম। এছাড়া একসময় চীনের শীর্ষ ধনীর কাতারে থাকা জ্যাক মা ও তার পরিবারের অবস্থান চার ধাপ পিছিয়ে ৯ নম্বরে নেমেছে। প্রযুক্তি খাতে সরকারের নিয়ন্ত্রণ আরোপের কারণে চীনা ই-কমার্স জায়ান্ট আলিবাবার প্রতিষ্ঠাতার সম্পদ নিম্নমুখী রয়েছে।