জ্বালানি তেলের দাম গতকাল ৫ শতাংশ কমেছে। শীর্ষ অপরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানিকারক দেশ চীনের মন্দার শঙ্কা এবং ইরানের জ্বালানি তেল বাজারে আসার সম্ভাবনায় গতকাল দরপতন হয়েছে। এছাড়া শীর্ষ জ্বালানি তেল উত্তোলনকারী দেশ সৌদি আরবের উত্তোলন বাড়ানোর পরিকল্পনাও এতে প্রভাব রেখেছে।

বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, গতকাল ফিউচার মার্কেটে আন্তর্জাতিক বাজার আদর্শ ব্রেন্টের দাম শূন্য দশমিক ৯ শতাংশ কমে ব্যারেলপ্রতি ৯৪ দশমিক ২৬ ডলারে দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে মার্কিন বাজার আদর্শ ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েটের (ডব্লিউটিআই) ব্যারেলপ্রতি ৪৫ সেন্ট বা শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ কমে ৮৮ দশমিক ৯৬ ডলারে দাঁড়িয়েছে।

বাজারে গতিশীলতা আনতে সোমবার সুদহার কমিয়েছে চীনের কেন্দ্রীয় ব্যাংক। সাংহাই, কুনশান ও বেইজিংয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ শিল্প কেন্দ্রে দীর্ঘমেয়াদি লকডাউনের ধাক্কায় চীনের অর্থনীতিসহ পুরো বিশ্ব অর্থনীতিতে প্রভাব পড়েছে। এশিয়ার শীর্ষ অর্থনীতির এ জিরো-কভিড পলিসির কারণে জুলাইয়ে কারখানা কার্যক্রম ও খুচরা বিক্রিতে মারাত্মক প্রভাব পড়েছে।

চীনের জাতীয় পরিসংখ্যান ব্যুরো (এনবিএস) সম্প্রতি এক প্রতিবেদনে জানায়, জুলাইয়ে দেশটির শিল্পোৎপাদন খাতের প্রবৃদ্ধি ছিল ৩ দশমিক ৮ শতাংশ। যেখানে গত জুনে এ খাতের প্রবৃদ্ধি ছিল ৩ দশমিক ৯ শতাংশ। খুচরা বিক্রিতেও মাত্র ২ দশমিক ৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে। জুনের ৩ দশমিক ১ শতাংশের তুলনায় যা কমেছে। অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের শীর্ষ ভোক্তা দেশ চীন। দেশটির অর্থনীতির এমন বেহাল দশায় দাম কমাতে বাধ্য হচ্ছে রফতানিকারক দেশগুলো।

এদিকে শীর্ষ জ্বালানি তেল উত্তোলনকারী সৌদি আরামকো জানায়, সৌদি সরকার অনুমতি দিলে দৈনিক উত্তোলন দিনপ্রতি ১ কোটি ২০ লাখ ব্যারেলে নিয়ে যেতে প্রস্তুত রয়েছে। তবে জ্বালানি তেল রফতানিকারক দেশগুলোর সংগঠন ওপেকের বৈঠকে অবশ্য উত্তোলন বাড়ানোর কোনো ইঙ্গিত দেয়নি সৌদি কর্তৃপক্ষ।

এদিকে ২০১৫ সালে স্বাক্ষরিত ইরান পারমাণবিক চুক্তিতে প্রত্যাবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে সংশ্লিষ্টরা। এতে বাজারে ইরানের জ্বালানি তেল প্রবেশ সহজতর হবে। ভারতের মতো দেশ একসময় ইরানের জ্বালানি তেলের ওপর বড় আকারে নির্ভরশীল ছিল। পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং পারমাণবিক চুক্তিতে ফিরে গেলে বিনা বাধায় তেহরানের সঙ্গে লেনদেন সম্ভব হবে ভারত, চীনসহ বিভিন্ন আমদানিকারকের। এতে আরো কয়েক দফা অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম কমবে বলে আশা করা হচ্ছে।

পশ্চিমাদের সঙ্গে তেহরানের চুক্তি পুনর্বহাল হলে ইরানের অপরিশোধিত জ্বালানি তেল সহজেই বাজারে প্রবেশ করতে পারবে। উপসাগরীয় দেশটি দৈনিক ২৫ লাখ ব্যারেল জ্বালানি তেল উত্তোলন করে থাকে।

ইন্টারন্যাশনাল এনার্জি এজেন্সির (আইইএ) সাম্প্রতিক পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলতি বছর দৈনিক ৩ লাখ ৮০ হাজার ব্যারেল করে বাড়ছে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের বৈশ্বিক চাহিদা। মোট দৈনিক চাহিদা বৃদ্ধির পরিমাণ দাঁড়াবে ২১ লাখ ব্যারেলে। গত মাসে আইইএ জ্বালানি তেলের বৈশ্বিক চাহিদা পূর্বাভাস কমিয়েছিল। তবে চলতি মাসে তা অস্বাভাবিক বাড়ানো হয়। বিশেষ করে ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য, সৌদি আরব ও ইরাকে চাহিদা লক্ষণীয় মাত্রায় বাড়বে। তবে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও গ্যাস থেকে জ্বালানি তেলে স্থানান্তর বাদে অন্যান্য খাতে পণ্যটির চাহিদা নিম্নমুখীই থাকবে বলে জানিয়েছে আইইএ। এ কারণে চাহিদা প্রবৃদ্ধিতে কিছুটা বাধার সৃষ্টি হতে পারে। বিশেষ করে চলতি বছরের চতুর্থ প্রান্তিকে জ্বালানি তেলের চাহিদা বৃদ্ধির পরিমাণ দাঁড়াবে মাত্র দৈনিক ৪০ হাজার ব্যারেল।

আইইএর প্রতিবেদনে বলা হয়, চলতি বছর অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের মোট বৈশ্বিক চাহিদার পরিমাণ দাঁড়াবে দৈনিক ৯ কোটি ৯৭ লাখ ব্যারেল। আগামী বছর তা আরো বেড়ে ১০ কোটি ১৮ লাখ ব্যারেলে উন্নীত হতে পারে।

গত মাসে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের বৈশ্বিক সরবরাহ বেড়ে মহামারীপূর্ব অবস্থায় পৌঁছেছে। সরবরাহের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে দৈনিক ১০ কোটি ৫ লাখ ব্যারেলে। উত্তর সাগর, কানাডা ও কাজাখস্তানে রক্ষণাবেক্ষণ কার্যক্রম শেষ হওয়ায় সরবরাহ গতিশীল হয়ে ওঠে। অন্যদিকে রফতানিকারক দেশগুলোর মিত্র জোট ওপেক প্লাস মোট জ্বালানি তেল উত্তোলন দৈনিক ৫ লাখ ৩০ হাজার ব্যারেল করে বাড়িয়েছে। জোটটির উত্তোলন লক্ষ্যমাত্রাও ছিল ঊর্ধ্বমুখী।