ঝড়ো গতিতে একের পর এক ব্যাংক বিপর্যয় বিভিন্ন দেশের সরকারের মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ ঘটনা ২০০৮ সালে ব্যাংক খাতের স্মৃতি মনে করিয়ে দিচ্ছে। যদিও শুরু থেকেই নীতিনির্ধারকদের পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছিল, এবারের ব্যাংক বিপর্যয় ২০০৮-০৯ পরিস্থিতি সৃষ্টি করবে না। অবশ্য গ্রাহক এতে বিশ্বাস রাখতে পারেন এমন আস্থার ফুরসত নেই।

এক সপ্তাহের মধ্যে সিলিকন ভ্যালি ব্যাংক ও সিগনেচার ব্যাংকের মতো দুটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিপর্যস্ত হয়েছে। এসব ব্যাংক বন্ধ হওয়ার পর পতনের ঝুঁকিতে আছে দেশটির আরেক ব্যাংক—ফার্স্ট রিপাবলিক ব্যাংক। তবে এ ব্যাংকের পতন ঠেকাতে এগিয়ে এসেছে যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষস্থানীয় কয়েকটি ব্যাংক। জেপি মরগ্যান ও সিটি গ্রুপের নেতৃত্বে ১১টি ব্যাংক ফার্স্ট রিপাবলিককে ৩ হাজার কোটি ডলার আমানত দিচ্ছে। পাশাপাশি নগদ অর্থ সংকটে পড়া মার্কিন ব্যাংকগুলো সম্প্রতি কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভের কাছ থেকে ৩০ হাজার কোটি ডলার ধার করেছে। তবে এ অর্থের প্রায় অর্ধেক পেয়েছে দুটি হোল্ডিং কোম্পানি। যাদের মালিকানাধীন দুই ব্যাংক মার্কিন কর্তৃপক্ষ এক সপ্তাহের মধ্যে বন্ধ ঘোষণা করেছে।

বার্তা সংস্থা এপির বরাতে ব্রিটিশ পত্রিকা গার্ডিয়ান জানিয়েছে, ফেডারেল রিজার্ভের তথ্যমতে, সিলিকন ভ্যালি ব্যাংক ও সিগনেচার ব্যাংকের দুই হোল্ডিং কোম্পানি সব মিলিয়ে ১৪ হাজার ৩০০ কোটি ডলার ধার করেছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, ২০০৮ সালের আর্থিক সংকটের সময় ব্যাংকগুলোকে উদ্ধার করতে যেসব চুক্তি করা হয়েছিল, ব্যাংক খাতের বর্তমানের অস্থিরতা ফেডারেল রিজার্ভ, মার্কিন ট্রেজারি বিভাগ এবং বেসরকারি খাতকে সেই স্মৃতিই যেন মনে করিয়ে দিচ্ছে। তবে ২০০৮ সালের মতো, প্রাথমিক বিপর্যয়টি এখনি কাটছে বলে মনে হচ্ছে না।

যদিও সিলিকন ভ্যালি ব্যাংকের পতনের জন্য কিছুটা দায়ী করা হচ্ছে বন্ডের দাম কমে যাওয়া। ভালো সময়ে তারা বন্ড কিনেছিল। সে সময় তাদের অনেক আমানতকারী ছিল। আর ব্যাংকের দরকার ছিল ওই টাকা কোথাও খাটানো। কিন্তু সুদের হার বেড়ে যাওয়ার পর বন্ডে বিনিয়োগ আর আকর্ষণীয় থাকে না। এ সমস্যা আরো বৃদ্ধি পায়, যখন তাদের হঠাৎ করে অর্থের প্রয়োজন হয়।

সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান ফন ল্যানশফট কেমপেনের সিনিয়র পোর্টফলিও ম্যানেজার লুক প্লোভিয়ের বলেন, ‘যখন আপনার জরুরিভাবে অর্থের প্রয়োজন হবে, তখন যদি বন্ডের দাম কমতে থাকে, তাহলে সেটি একটি সমস্যা। তখন আপনাকে এমন সম্পদ বিক্রি করতে হবে, অন্য সময়ে হয়তো আপনি তা বিক্রি করতেন না।’

ব্যাংক খাতের সাম্প্রতিক বিপর্যয় প্রসঙ্গে ফেডারেল রিজার্ভের সাবেক শীর্ষ ব্যাংকিং রেগুলেটর র‌্যানডাল কোয়ার্লেস বলেন, ‘ফেডারেল ডিপোজিট ইন্স্যুরেন্স করপোরেশন (এফডিআইসি), ফেড এবং ট্রেজারি বিভাগের সাম্প্রতিক পদক্ষেপের পরও ব্যাংক খাত নিয়ে উদ্বেগের কোনো যৌক্তিকতা দেখছি না।’ 

আগের সংকট ব্যাংক খাত পাল্টে দিয়েছে। এবারের বিপর্যয় হয়তো আরো নতুন কিছু পরিবর্তন নিয়ে আসবে। ফ্রন্টলাইন কমপ্লায়েন্সের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রেসিডেন্ট অ্যামি লিঞ্চ বলেন, ‘‌ব্যাংকগুলো সার্বিক অর্থনীতিতে বড় আকারের ঝুঁকি সৃষ্টি করতে পারে নীতিনির্ধারকরা তা অনুধাবন করতে শুরু করেছেন। তদারককারীরা যে তদারকি বাড়াবেন তা নির্দ্বিধায় বলা যায়।’ 

এদিকে কিছু বিশ্লেষক বলছেন, বড় আকারের সংস্কার আশা করা যাচ্ছে না।  কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভের (ফেড) নেতৃত্বে নীতিনির্ধারকরা শক্ত অবস্থানের পক্ষে। 

সাম্প্রতিক সংকট বৃহৎ ব্যাংকগুলোকেও ওয়াশিংটনের রাডারের আওতায় আনছে।