বাংলাদেশ
থেকে মালয়েশিয়ায়
জনশক্তি রফতানি
দুই বছর
বন্ধ থাকার
পর আবার
শুরু করার
জন্য ১৯
ডিসেম্বর দুই
দেশ চুক্তিতে
উপনীত হয়েছে।
এ চুক্তি
অনুযায়ী ‘গভর্নমেন্ট
টু গভর্নমেন্ট
(জিটুজি) ব্যবস্থাপনায়’
মালয়েশিয়ার উৎপাদনকারী
প্রতিষ্ঠানগুলো জনশক্তি
আমদানি করবে,
ফলে অভিবাসনেচ্ছু
শ্রমিকের অভিবাসন
ব্যয় ১
লাখ টাকার
নিচে চলে
আসবে বলে
দাবি করেছেন
বাংলাদেশ সরকারের
জনশক্তি রফতানি
ও বৈদেশিক
কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের
মন্ত্রী এমরান
আহমদ। কতিপয়
মালয়েশীয় ও
বাংলাদেশী জনশক্তি
রফতানিকারকের সিন্ডিকেটের
দৌরাত্ম্যে অতিষ্ঠ
হয়ে ২০১৯
সালে মালয়েশিয়ার
কিংবদন্তি প্রধানমন্ত্রী
ডা. মাহাথির
মোহাম্মদের সরকার
বাংলাদেশ থেকে
মালয়েশিয়ায় জনশক্তি
আমদানি নিষিদ্ধ
ঘোষণা করেছিল।
ওই সময়
বাংলাদেশ থেকে
মালয়েশিয়ায় অভিবাসনেচ্ছু
শ্রমিককে প্রায়
৪-৫
লাখ টাকা
খরচ করতে
হতো, যার
প্রধান অংশটা
মালয়েশিয়া ও
বাংলাদেশের আদম
বেপারিদের সিন্ডিকেটের
কুক্ষিগত হওয়াটাই
নিয়মে পরিণত
হয়েছিল। ২০০২
সালে ক্ষমতা
ত্যাগের দীর্ঘদিন
পর ২০১৮
সালে পুনর্নির্বাচিত
হয়ে ক্ষমতা
গ্রহণের পর
ডা. মাহাথির
এ কঠোর
পদক্ষেপ গ্রহণে
বাধ্য হয়েছিলেন
মালয়েশিয়ার রাজনীতিবিদ
ও আমলাদের
একটি অংশ
এই পুঁজি
লুণ্ঠনে জড়িত
থাকার প্রমাণ
পাওয়ায়। এর
আগে আরো
একবার বাংলাদেশের
বর্তমান সরকারের
আমলে ২০১২
সালের নভেম্বরে
সরকারি উদ্যোগে
অভিবাসী প্রেরণের
চুক্তি স্বাক্ষরের
পর মাত্র
৪০ হাজার
টাকা খরচে
হাজার দশেক
মানুষ মালয়েশিয়া
যেতে পেরেছিল।
ম্যানপাওয়ার এজেন্সিগুলোর
মাধ্যমে আগে
মালয়েশিয়া যেতে
এর প্রায়
পাঁচ গুণ
বেশি টাকা
লাগত। কিন্তু
মালয়েশিয়া ও
বাংলাদেশ উভয়
দেশের জনশক্তি
ব্যবসায়ীদের সংঘবদ্ধ
সিন্ডিকেটের অপতত্পরতায়
অল্প কিছুদিনের
মধ্যেই দুই
দেশের সরকারের
ওই সদিচ্ছা
ব্যর্থ হয়ে
যায়। ফলে
বাংলাদেশী শ্রমিকদের
অভিবাসন ব্যয়
আবার দুই
দেশের আদম
বেপারি সিন্ডিকেটের
অমানবিক দৌরাত্ম্যের
শিকার হয়
এবং তা
ক্রমে বাড়তে
বাড়তে ২০১৯
সালে বন্ধ
হওয়ার পর্যায়ে
৪-৫
লাখ টাকায়
পৌঁছে গিয়েছিল।
২০১৫ সালের ৯, ১০ ও ১১ আগস্ট দেশের ইংরেজি দৈনিক দ্য ডেইলি স্টারে তিন কিস্তিতে মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশী অভিবাসী প্রেরণে বাংলাদেশ সরকারের দুঃখজনক ব্যর্থতার নেপথ্যে দুই দেশের আদম বেপারিদের সংঘবদ্ধ অপতত্পরতার একটি বিশ্লেষণাত্মক সমীক্ষা প্রকাশিত হয়েছিল, যার কিছু অংশ পাঠকদের জ্ঞাতার্থে উপস্থাপন করছি। সমীক্ষাটির প্রথম কিস্তিতে ওই পদ্ধতিতে অভিবাসীদের কাছ থেকে ২০০৭-০৮ সালে আদায় করা অর্থের একটা ভাগ-বাটোয়ারার চিত্র দেখানো হয়েছে (ছক)।
তথ্যগুলো মালয়েশিয়ার
শ্রমিক অধিকার
সম্পর্কিত সংস্থা
টেনাগানিটা কর্তৃক
সংগৃহীত। দুই
দেশের খরচগুলো
যোগ করলে
দেখা যাচ্ছে
একজন অভিবাসনেচ্ছু
শ্রমিকের কাছ
থেকে এ
প্রক্রিয়ায় ১
লাখ ৬০
হাজার থেকে
২ লাখ
৫০ হাজার
টাকা হাতিয়ে
নেয়া হতো;
যার ভাগ
মালয়েশিয়ার চাকরিদাতা,
এজেন্ট, লবিস্ট,
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়
থেকে শুরু
করে বাংলাদেশের
রিক্রুটিং এজেন্সি,
এজেন্সির শহুরে
দালাল, গ্রামীণ
দালাল সবাই
পেয়ে যাচ্ছে।
এমনকি মালয়েশিয়া
সরকার চাকরিদাতা
ফার্ম থেকে
বিদেশী শ্রমিক
নিয়োগের জন্য
যে লেভি
আদায় করছে
তাও চাপিয়ে
দেয়া হচ্ছে
শ্রমিকের ওপর।
সিঙ্গাপুরে পরিচালিত
আমার ১৯৯৬-৯৭
সালের অভিবাসী
সম্পর্কিত গবেষণায়ও
একই চিত্র
ফুটে উঠেছিল।
সিঙ্গাপুরের মতো
একটি প্রায়
দুর্নীতিমুক্ত দেশে
যদি অভিবাসী
শ্রমিকদের এ
ধরনের শোষণের
শিকার হতে
হয় তাহলে
মালয়েশিয়ায় অবস্থা
আরো খারাপ
হওয়াটাই স্বাভাবিক।
অতএব, বোধগম্য
কারণেই বাংলাদেশের
জনশক্তি রফতানিকারকরা
সরকারের ২০১২
সালের শুভ
উদ্যোগটি বানচাল
করতে উঠেপড়ে
লেগেছিল এবং
সরকারের সঙ্গে
এ ইস্যুতে
তাদের ঝগড়া
ও টানাপড়েন
মালয়েশিয়ায় জনশক্তি
রফতানি প্রক্রিয়াকে
মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত
করেছিল। যেখানে
আগে প্রতি
বছর কয়েক
লাখ বাংলাদেশী
অভিবাসী মালয়েশিয়ায়
যেতেন, সেখানে
সরকার ওই
দায়িত্ব নেয়ার
পর আড়াই
বছরে মাত্র
১০ হাজার
শ্রমিক মালয়েশিয়া
যেতে পারে।
প্রতিবেদনে বলা
হয়েছে, মালয়েশিয়ায়ও
শক্তিশালী আদম
বেপারি চক্র
দুই দেশের
সরকারের বন্দোবস্তে
(জিটুজি) মালয়েশিয়ায়
বাংলাদেশী অভিবাসী
শ্রমিক প্রেরণের
ব্যবস্থাটিকে ভণ্ডুল
করার জন্য
সর্বশক্তি নিয়োগ
করেছিল। এ
দুই কায়েমি
স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর
অপতত্পরতা সফল
হওয়ার ফলে
দুই সরকারের
মাধ্যমে অভিবাসী
শ্রমিক প্রেরণের
ব্যবস্থাটি বন্ধ
করে দিয়ে
আবার ম্যানপাওয়ার
এজেন্সিগুলোর মাধ্যমে
(বিজনেস টু
বিজনেস বা
বিটুবি) শ্রমিক
পাঠানোর ব্যবস্থা
চালু হয়।
সরকারি বন্দোবস্তটা
যেন ব্যর্থ
হওয়ার জন্যই
প্রণীত হয়েছিল।
এবারের চুক্তিটিরও
যেন একই
পরিণতি না
হয়!
পাঠকদের জ্ঞাতার্থে
বলছি, প্রতি
বছর বাংলাদেশের
শ্রমবাজারে প্রায়
১৭-১৮
লাখ কর্মপ্রত্যাশী
মানুষ প্রবেশ
করলেও দেশের
অর্থনীতি সাত-আট
লাখের বেশি
কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা
করতে আজও
অপারগ রয়ে
গেছে। প্রতি
বছর বৈধ-অবৈধ
পথে ছয়-সাত
লাখ মানুষ
বিদেশে চলে
যাওয়ার সুযোগ
না পেলে
বাংলাদেশের সমাজ,
অর্থনীতি ও
রাজনীতিতে বিপর্যয়কর
অবস্থার সৃষ্টি
হতে বাধ্য।
তাই আন্তর্জাতিক
অভিবাসনকে তাত্ত্বিকভাবে
‘মেধা
পাচার’ হিসেবে
দেখার যুক্তি
থাকলেও বেকারত্ব
ও কর্মসংস্থান
সৃষ্টির দৃষ্টিকোণ
থেকে বাংলাদেশের
মতো জনাকীর্ণ
দেশের জন্য
এটাকে ‘সেফটি
ভাল্ব’ হিসেবে
দেখাই যৌক্তিক।
জীবন ও
জীবিকার তাগিদে
বাধ্য হয়ে
এ অভিবাসীরা
বিশ্বের নানা
দেশে ছড়িয়ে
পড়লেও তাদের
অভিবাসন প্রক্রিয়ায়
সরকারের কৃতিত্ব
নেয়ার অবকাশ
নেই। বরং
আমার গবেষণাগুলোয়
বারবার ফুটে
উঠেছে পুরো
অভিবাসন প্রক্রিয়া
ঘিরে বেশির
ভাগ ক্ষেত্রে
লোভাতুর ‘আদম
বেপারি চক্রের’
দোর্দণ্ডপ্রতাপ অভিবাসনপ্রত্যাশীদের
শোষণ, প্রতারণা
ও লুণ্ঠনের
অসহায় শিকারে
পরিণত করে
চলেছে চার
দশক ধরে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ
হলো, বাংলাদেশী
অভিবাসীদের ৯৫
শতাংশই শিক্ষা
ও দক্ষতার
দিক থেকে
বিশ্বের অন্য
দেশের অভিবাসীদের
চেয়ে পেছনে
অবস্থান করছেন।
তাই সবচেয়ে
কম মজুরির
‘থ্রিডি
জব’গুলোই
(ডার্টি, ডেনজেরাস
অ্যান্ড ডিমান্ডিং
জবস) তাদের
ভাগে জুটছে।
কিন্তু পরিবারের
মা-বাবা,
স্ত্রী-পুত্র-কন্যা,
ভাই-বোনদের
ভরণ-পোষণের
দায়িত্ব পালনের
জন্য বাংলাদেশের
অভিবাসীরা তাদের
এই নিম্ন
আয়ের ৫০-৭৫
শতাংশই নিয়মিতভাবে
রেমিট্যান্স হিসেবে
দেশে পাঠান।
অভিবাসী প্রেরণের
ক্ষেত্রে বাংলাদেশের
অবস্থান বিশ্বে
ষষ্ঠ হলেও
বিশ্বের রেমিট্যান্সের
গন্তব্য দেশগুলোর
তালিকায় বাংলাদেশের
অবস্থান এখন
অষ্টম; ভারত,
চীন, মেক্সিকো,
ফিলিপাইন, তুরস্ক,
পাকিস্তান ও
ইন্দোনেশিয়া বাংলাদেশের
চেয়ে এগিয়ে
রয়েছে এ
ব্যাপারে। ২০২০
সালে নভেল
করোনাভাইরাস মহামারীর
তাণ্ডব সত্ত্বেও
বাংলাদেশে ফরমাল
চ্যানেলে রেমিট্যান্সপ্রবাহ
আগের বছরের
চেয়ে ২৪
শতাংশ বেড়ে
২১ দশমিক
৭৪ বিলিয়ন
ডলারে পৌঁছে
গিয়েছিল।
বাংলাদেশের তরুণ,
ভূমধ্যসাগরে ডুবে
মরছেন বাংলাদেশী
অবৈধ অভিবাসী।
আমেরিকা যাওয়ার
জন্য ক্যারিবীয়
দ্বীপপুঞ্জের বিভিন্ন
দেশ থেকে
আটলান্টিক মহাসাগর
পাড়ি দিতে
গিয়ে ডুবে
মরেছেন এ
দেশের অনেকে,
এমনকি মেক্সিকো-মার্কিন
সীমান্তে মারা
পড়েছেন বেশ
কয়েকজন। এদের
সবাই দরিদ্র
পরিবারের সন্তান
নয়, লাখ
লাখ টাকা
আদম বেপারি
ও হিউম্যান
ট্রাফিকিং চক্রগুলোর
লোভাতুর বাণিজ্যে
বিনিয়োগ করে
‘সোনার
হরিণ’ পাওয়ার
মোহে ছুটছে
এ দেশের
উচ্চমধ্যবিত্ত, মধ্যবিত্ত
ও নিম্নমধ্যবিত্ত
পরিবারের সন্তানরা।
অভিবাসনের সফল
অ্যাডভেঞ্চারগুলো আরো
হাজার হাজার
যুবককে স্বপ্ন
দেখাচ্ছে অবৈধ
পথে বিদেশে
পাড়ি দিতে।
এর মধ্যে
মানসিক ব্যাধির
সন্ধান করা
সমীচীন নয়,
‘চেইন
মাইগ্রেশনের’ গতি-প্রকৃতি
এ রকমই
হওয়ার কথা।
বেকারত্বের গ্লানিতে
নিমজ্জিত তরুণদের
এ ধরনের
আচরণ অত্যন্ত
যৌক্তিক।
জনশক্তি রফতানি
ও বৈদেশিক
কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের
মন্ত্রী এমরান
আহমদের প্রতি
আমার আহ্বান—আপনাকে
একজন সজ্জন
ব্যক্তি হিসেবেই
জানি। আপনি
যদি অভিবাসী
শ্রমিকদের আদম
বেপারি ও
দালালদের শোষণ-লুণ্ঠন
থেকে সুরক্ষার
একটি কার্যকর
ব্যবস্থা গড়ে
তুলতে পারেন
তাহলে আপনি
সারা দেশের
জনগণের মনে
স্থায়ী আসন
দখল করতে
সমর্থ হবেন।
বিশ্বের অন্য
কোনো দেশের
অভিবাসী শ্রমিকদের
বাংলাদেশের শ্রমিকদের
এক-তৃতীয়াংশও
খরচ করতে
হয় না।
ভারত, পাকিস্তান,
শ্রীলংকা, ফিলিপাইন,
ইন্দোনেশিয়া, তুরস্ক,
মেক্সিকো ও
ভিয়েতনাম থেকে
তথ্য-উপাত্ত
সংগ্রহ করলে
এ ব্যাপারে
দিকনির্দেশনা পাওয়া
যাবে।
ড. মইনুল ইসলাম: সাবেক সভাপতি, বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতি, একুশে পদকপ্রাপ্ত অর্থনীতিবিদ ও অবসরপ্রাপ্ত প্রফেসর, অর্থনীতি বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়










