সাংবিধানিক অধিকার, জনগণের প্রতি সরকারের দায়িত্ববোধ কিংবা মানুষ হিসেবে মানবিক সেবা ও কর্তব্যের ন্যূনতম ছোঁয়া হারিয়ে দেশের স্বাস্থ্যসেবা এখনো অনেকের জন্য ভাগ্যনির্ভর হয়ে আছে, নাগরিক অধিকার হিসেবে নয়। স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতে গত তিন দশকে শিশু ও মাতৃমৃত্যুর হ্রাস, টিকাদান কর্মসূচি সম্প্রসারণ, সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ, গ্রাম-শহরে হাসপাতাল ও চিকিৎসক সংখ্যা বাড়লেও এ সাফল্যের আড়ালে আজও রয়েছে চরম নাগরিক বঞ্চনার বাস্তবতা এবং অনিয়ম ও দুর্নীতির কালো হাত। সরকারি হাসপাতালের নাজুক অবস্থা ও পর্যাপ্ত ডাক্তারের অভাব, রোগীর কষ্ট, চিকিৎসক-সহায়ক কর্মীদের অনীহা, রোগীকে হাসপাতালে মনোযোগ দিয়ে না দেখে বাইরে নিজ চেম্বারের ঠিকানা দেয়া, অপ্রয়োজনীয় টেস্ট ও ওষুধের চাপ, এসব আজ আমরা প্রায়ই দেখছি ও শুনছি। এমনকি বলতে গেলে আমরা নিজেরাই এর জ্বলন্ত সাক্ষী এবং ভুক্তভোগী। বাধ্য হয়েই মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত মানুষ সামর্থ্য অনুযায়ী দেশের বেসরকারি হাসপাতালে ও বিত্তশীলরা বিদেশে চিকিৎসা করাতে যাচ্ছে।

সম্প্রতি অধ্যাপক ড. একে আজাদ খানকে প্রধান করে স্বাস্থ্য খাতের একটি সংস্কার কমিটি করে অন্তর্বর্তী সরকার। এ কমিটি তাদের প্রতিবেদনে বিভিন্ন অনিয়মের কথা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে উল্লেখ করেছে। সেই সঙ্গে বিভিন্ন সুপারিশও করছে। আশা করি, সাধারণ সব নাগরিকের কথা ভেবে এবং সাংবিধানিক দায়িত্ব মনে করে নির্বাচিত সরকার আরো কঠোর ও কঠিনভাবে এর প্রয়োগ ও বাস্তবায়ন করবে। কেননা সরকারি ও বেসরকারি উভয় খাতের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক থেকে সর্বনিম্ন অফিস পর্যন্ত অনিয়ম ও অবহেলার খবরও প্রায় সংবাদ শিরোনামে উঠে আসে। কিন্তু কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হয় না। চিকিৎসকরা যদি ভিজিট ফি একটু কমিয়ে রোগীর প্রতি একটু বেশি সময় নিয়ে মনোযোগ দিয়ে রোগ সম্পর্কে জানতেন, দায়িত্ববোধের পরিচয় দিতেন এবং একটু মানবিক হতেন, তাহলে অনেক রোগীকেই অপ্রয়োজনীয় টেস্ট বা ব্যয়বহুল চিকিৎসা বা অপ্রোজনীয় ওষুধ কেনা থেকে বাঁচানো যেত। সেই সঙ্গে যেসব রোগী চিকিৎসার জন্য বিদেশে যান, তাদের সংখ্যাও অনেক কমে আসত। এতে দেশের অর্থনৈতিক ক্ষতি কম হতো এবং দেশের স্বাস্থ্য খাতের প্রতি জনগণের আস্থাও বাড়ত। সাংবিধানিক অধিকার ও মানবিক দায়িত্বের কাছাকাছি হলেও আজও আমাদের দেশের স্বাস্থ্যসেবা পুরোপুরি নাগরিক অধিকার হিসেবেই উপলব্ধ হয়নি।

দেশে স্বাস্থ্য খাতের জন্য চমৎকার নীতিমালা থাকলেও বাস্তবে প্রয়োগের ক্ষেত্রে ঘাটতি প্রকট। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ জিডিপির মাত্র শূন্য দশমিক ৭৪ শতাংশ, যা গত বছরের থেকে সামান্য কমেছে। একই সময়, স্বাস্থ্যসেবায় ব্যক্তির প্রত্যক্ষ ব্যয় (নিজ পকেট থেকে ব্যয়) মোট খরচের প্রায় ৭৩ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। এর অর্থ জনগণ কর দিয়েও সরকারি চিকিৎসাসেবায় মূল্যায়িত হয় না, বরং বারবার তাদের পকেট থেকেই খরচ করতে হয়। এক্ষেত্রে সরকারি হাসপাতালের ফুল-টাইম চিকিৎসকদের জন্য নীতি থাকতে হবে যাতে তারা বেসরকারি হাসপাতালে চেম্বার না করে সরকারি হাসপাতালে রোগী দেখেন এবং এজন্য ওভারটাইম বা ভর্তুকির ভিত্তিতে অতিরিক্ত টাকা পান। বেসরকারি ও সরকারি উভয় খাতে চিকিৎসক-পরামর্শ ফি, টেস্ট ফি ও রিপোর্ট দেখা ফি নির্ধারণ করে তা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণে আনা জরুরি। এদিকে বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকের সংখ্যা পাঁচ হাজারেরও বেশি হলেও মান ও নৈতিকতা আজ প্রশ্নবিদ্ধ।

বাংলাদেশের সংবিধান স্বাস্থ্যসেবাকে মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। রাষ্ট্রের দায়িত্ব শুধু হাসপাতাল নির্মাণ নয়; সরকারি ও বেসরকারি উভয় খাতেই নৈতিক মান, জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করে নিন্মোক্ত বিষয়গুলোকে আমলে নিয়ে কঠোর ও নিয়মিত তদারকির মাধ্যমে শাস্তির আওতায় আনা:

  • সব বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকের বাধ্যতামূলক নিবন্ধন ও বার্ষিক মান নিরীক্ষা-অডিট; জালিয়াতি ধরা পড়লে লাইসেন্স বাতিল ও অর্থদণ্ডের ব্যবস্থা।
  • ই-হেলথ গভর্নেন্স প্লাটফর্ম চালু করে প্রেসক্রিপশন, টেস্ট অর্ডার ও বিলিং-রিয়েলটাইম রেকর্ড রাখা।
  • ‘‌নো গিফট, নো কিকব্যাক’ নীতি বাস্তবায়নে জিরো টলারেন্স।
  • রোগীর অধিকার আইন প্রণয়ন: স্বচ্ছ বিল, দ্বিতীয় মতামত, গোপনীয়তা ও অভিযোগ নিষ্পত্তি নিশ্চিত করতে হবে।
  • সর্বজনীন স্বাস্থ্যবীমা চালু করা এখন সময়ের দাবি: বর্তমানে মাত্র ৫ শতাংশ নাগরিক বীমার আওতায়।
  • প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় বিনিয়োগ বাড়ানো। PubMed Central+ দেশে প্রাথমিক পর্যায়ে প্রতি ১ ডলার বিনিয়োগে পরবর্তী চিকিৎসা ব্যয়ে ৪ ডলার সাশ্রয় হওয়ার আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা রয়েছে।
  • স্থানীয়ভাবে প্রশিক্ষিত কমিউনিটি হেলথ ওয়ার্কারদের জন্য সার্টিফায়েড ক্যারিয়ার পথ ও পারফরম্যান্স ইনসেনটিভ নিশ্চিত করা।
  • চিকিৎসা শিক্ষার্থীদের শুরুতেই তাদের ভবিষ্যৎ সেবা ও দায়িত্ব সম্পর্কে মৌলিক ও মানবিক ধারণা দিয়ে বুঝাতে হবে, চিকিৎসা শিক্ষার এ বিশাল খরচের টাকা এ দেশের জনগণের করের টাকা।

অগ্রগতি বা অবনতি যাই হোক না কেন, আমরা যদি শুধু নারী-শিশুর ছোট্ট তথ্যটা বিবেচনায় নেই তাহলে দেখব, নারী ও শিশুদের প্রতি চিকিৎসকদের আরো গভীর মনোযোগী হতে হবে। গর্ভবতী ও প্রসবকালীন নারীদের এবং শিশুদের চিকিৎসায় কিছুটা অগ্রগতি হলেও তা আশানুরূপ নয়। কারণ এখনো নারী-শিশু মৃত্যুহার হতাশাজনক। এখানেও ডাক্তার ও হাসপাতালের কর্তারা শিশুদের জন্মকালীন সময়ে নরমাল কিংবা সিজার ডেলিভারির উছিলায় সাধ্যের বাইরে সাধারণ মানুষদের কাছ থেকে বহুগুণ টাকা আদায় করে থাকেন। এক্ষেত্রে শুধু ২০২৩ সালের ইউনিসেফ ও ইউএন আইজিএমই তথ্য অনুযায়ী দেখা যায়, বাংলাদেশে পাঁচ বছরের কম বয়সী প্রতি এক হাজার শিশুতে মৃত্যুহার ৩১ জন, শিশু মৃত্যুহার প্রতি হাজারে ২৪ এবং নবজাতক মৃত্যুহার এখনো ১৮ বিদ্যমান। নারী শিশুদের মৃত্যু পুরুষ শিশুদের তুলনায় কিছুটা কম, যেমন ২৮ বনাম ৩৩। ১৯৯৩-৯৪ সালে এ হার ছিল ১৩৩, যা এখন উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। যেমন জন্মের প্রথম ২৮ দিনেই প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ শিশুর মৃত্যু ঘটে এবং বছরে প্রায় ৬৩ হাজার মৃতপ্রসব ঘটে থাকে।

আর হিসাব অনুযায়ী, প্রতি এক লাখ জীবন্ত শিশুর জন্মের পরে ১১৫ নারীর মৃত্যু হয়ে থাকে, যা ২০০০ সালের ৫২৩ থেকে ৭৯ শতাংশ কম। তবু গৃহে প্রসব, দক্ষ চিকিৎসাসেবার ঘাটতি ও আর্থিক ঝুঁকি ও অভাবের কথা বিবেচনায় আনলে বৈষম্যের ধারণা থেকেই যায়। তাই এক্ষেত্রে চিকিৎসা সেবার উন্নতি, মনিটরিং জোরদার, মাতৃত্বকালীন নারীর প্রতি যত্ন বৃদ্ধি এবং বাণিজ্যিক মনোভাব সর্বনিম্ন স্তরে নামিয়ে আনতে হবে। ২০২৩ সালে সিজারিয়ান অপারেশনের হার ৬৮-৭৪ শতাংশ পৌঁছেছে, যা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশে সর্বোচ্চ ১৫ শতাংশ।

চিকিৎসক-রোগীর সম্পর্ক ক্রমেই যান্ত্রিক হয়ে উঠছে: সময়, সহানুভূতি ও দায়িত্বশীলতা, যা একসময় ছিল চিকিৎসা পেশার প্রাণ, আজ অনেক ক্ষেত্রেই অনুপস্থিত। PubMed Central গত তিন বছরে বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল-এ ৩৫০টিরও বেশি চিকিৎসা অবহেলার অভিযোগ জমা পড়লেও শুধু ১৭টি ক্ষেত্রে শাস্তি হয়েছে। এ শিথিলতা ভুক্তভোগীদের ক্ষোভ বাড়াচ্ছে। শুধু দেশের কাঠামোগত উন্নয়নই নয়, এখন প্রয়োজন একটি নৈতিক জাগরণ। চিকিৎসা পেশাকে শুধু জীবিকা নয়, মানবতার সেবায় পরিণত করতে হবে। রাষ্ট্র, চিকিৎসক সমাজ ও নাগরিক, সব পক্ষের সম্মিলিত দায়িত্ব আছে এ পরিবর্তনের। এখনই কঠোর আইন ও জবাবদিহি না আনলে, স্বাস্থ্যসেবা পরিণত হবে এক বিশৃঙ্খল বাজারে, যেখানে মানবতা হেরে যাবে মুনাফার কাছে।

সময় এসেছে দৃঢ় সিদ্ধান্তের। আইন মানবে স্বাস্থ্য খাত, না হলে আইন মানাতে হবে এ খাতকে। জনগণ কর দেয়, বিনিময়ে তারা চায় গ্যারান্টিযুক্ত, মানবিক ও সাশ্রয়ী চিকিৎসাসেবা। স্বাস্থ্যসেবা কোনো পণ্য নয়, এটি জীবন ও মর্যাদার অধিকার। রাষ্ট্র যদি এ নৈতিক কর্তব্য এখনই নিশ্চিত করে, তাহলে শুধু স্বাস্থ্য নয়, আস্থা, ন্যায় ও মানবিকতাও ফিরে আসবে।

একেএম মাহফুজুর রহমান: ডেপুটি ডিরেক্টর (ফ্যাকাল্টি এইচআর), নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি