ভৌগোলিক অবস্থানগত কারণে বিভিন্ন সময় বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, কালবৈশাখী, টর্নেডো, নদীভাঙন, উপকূলভাঙন, খরা, শৈত্যপ্রবাহসহ নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগে আক্রান্ত হয় বাংলাদেশ। রয়েছে ভূমিকম্প ঝুঁকিও। বিগত সময়ের তুলনায় প্রাকৃতিক দুর্যোগের মাত্রা বেড়েছে। তবে দুর্যোগ আঘাত হানার ঘটনা বাড়লেও তাতে ক্ষয়ক্ষতির হার কমেছে। দুর্যোগ ঝুঁকিপূর্ণ দেশের তালিকায় খানিকটা উন্নতিও হয়েছে বাংলাদেশের। বিশেষ করে আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ, পূর্বাভাস ও যোগাযোগের উন্নতি, বনায়ন এবং ঝড়ের আগে স্বেচ্ছাসেবকদের মাধ্যমে উপকূলবাসীকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নিয়ে মৃত্যুর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে কমিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে, যার কৃতিত্ব সরকারের। তবে এ মুহূর্তে বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবগুলো বিবেচনায় নিয়ে দক্ষ দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি গড়ে তুলতে মনোযোগী হতে হবে।

শ্রীলংকার সরকার দুর্যোগ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং উন্নয়ন পরিকল্পনায় ‘সেভেন থিমেটেক কম্পোন্যান্টস’ বা সাতটি মূল বিষয়ের ওপর জোর দিয়ে কর্মসূচি পরিচালনা করছে। জাতীয় নীতি প্রণয়ন ও ম্যান্ডেটগুলো পর্যালোচনার পাশাপাশি দুর্যোগ ব্যবস্থাপনাবিষয়ক দক্ষতা বিকাশের প্রয়োজনীয়তা শনাক্তকরণ ও সংশ্লিষ্ট বিধিমালার বাস্তবায়নকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে তারা। তাছাড়া অগ্রিম সতর্কতার অংশ হিসেবে দুর্যোগ হওয়ার আগেই প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণে জোর দিয়েছে। জাতীয় জরুরি প্রস্তুতি পরিকল্পনার আওতায় স্থানীয় ও জেলা পর্যায়ে জরুরি কেন্দ্র স্থাপন এবং শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে জনসচেতনতা তৈরি করছে।

আশার কথা, বাংলাদেশ বন্যা মোকাবেলায় ৮ হাজার ২০০ কিলোমিটার বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ এবং ৩ হাজার ৪০০ কিলোমিটার উপকূলীয় বেড়িবাঁধ নির্মাণ করেছে। প্রায় দুই হাজার ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র এবং ২০০ বন্যা আশ্রয়কেন্দ্র গড়ে তোলা হয়েছে। কিন্তু এসব অবকাঠামো নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ও ব্যবস্থাপনাগত ত্রুটি রয়ে গেছে। কিছু আশ্রয়কেন্দ্র আবার প্রভাবশালীদের দখলে। ফলে দুর্যোগ মোকাবেলায় ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। এসব আশ্রয়কেন্দ্র দ্রুত সংস্কার জরুরি। এছাড়া ঝুঁকি-কবলিত জনগোষ্ঠীর ঝুঁকি মোকাবেলার সামর্থ্য বৃদ্ধি এবং সুনির্দিষ্ট ঝুঁকির মধ্যে তাদের বিপদাপন্ন হওয়ার শঙ্কা হ্রাস করতে একটি সার্বিক দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কাঠামো গড়ে তোলার লক্ষ্যে কৌশলগত বিভিন্ন বিষয়ের ওপর জোর দিতে হবে। ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা কর্মসূচিগুলোকে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের মূলধারায় সম্পৃক্ত করার পাশাপাশি স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালীকরণ ও ক্ষমতায়ন গুরুত্বপূর্ণ। এছাড়া প্রস্তুতিমূলক কর্মকাণ্ডগুলোর পরিসর বৃদ্ধি করা, জরুরি ভিত্তিতে দুর্যোগ পূর্বাভাস পদ্ধতি শক্তিশালী করা এবং খাদ্যনিরাপত্তা ও সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে।

টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রায় জলবায়ু প্রসঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তন ও এর প্রভাব মোকাবেলায় জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণের কথা বলা হয়েছে। এ অবস্থায় ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, নদীভাঙনের পাশাপাশি গুরুত্ব দিতে হবে ভূমিকম্পের বিষয়টিতেও। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ঢাকা-চট্টগ্রাম ও সিলেটে রিখটার স্কেলে একটি ৭ মাত্রার ভূমিকম্প হলে কমপক্ষে ৩ লাখ ৭৬ হাজার ভবন ও অবকাঠামো ভেঙে পড়ার শঙ্কা রয়েছে। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হবে লাখো মানুষ। তাছাড়া এতগুলো ভবন ভেঙে গেলে সেগুলো থেকে নাগরিকদের উদ্ধার করা এবং ভাঙা অংশ সরানোর মতো সক্ষমতা এ মুহূর্তে আমাদের নেই। দুর্যোগ প্রস্তুতির অংশ হিসেবে বিষয়টিকে আমলে আনা জরুরি। উন্নয়ন কার্যক্রমে প্রকৃতি ও পরিবেশের বিষয়গুলোকে গুরুত্ব না দেয়া হলে তা ভবিষ্যতে বড় ধরনের ক্ষতির কারণ হয়। এর মধ্যে পরিবেশগত ও আর্থিক ক্ষতি অন্তর্ভুক্ত। উন্নত অনেক দেশের উদাহরণ আমাদের সামনে রয়েছে। যারা পরিবেশ দূষণের বিষয়গুলোকে অগ্রাধিকার না দেয়ার কারণে বর্তমানে বড় ধরনের প্রভাব মোকাবেলা করছে। আমাদের বিদ্যমান উন্নয়ন অগ্রযাত্রায়ও তাই প্রকৃতি ও পরিবেশের বিষয়গুলো আমলে নেয়া চাই।

বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে দীর্ঘমেয়াদে অন্যদের তুলনায় সবচেয়ে বেশি জিডিপি হারাবে বাংলাদেশ। শুধু তা-ই নয়, ২০৫০ সালের মধ্যে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে পড়বে বাংলাদেশের ১৩ কোটি ৪০ লাখ মানুষ। জিডিপির (দেশজ উৎপাদন) ৬ দশমিক ৭ শতাংশ ক্ষতি হবে। ‘জলবায়ু পরিবর্তনে ঝুঁকিপূর্ণ দক্ষিণ এশিয়া’ শীর্ষক বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে ‘বাংলাদেশ চাপ্টারে’ উল্লেখ করা হয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ২০৫০ সাল নাগাদ জিডিপিতে ক্ষতির আর্থিক পরিমাণ দাঁড়াবে প্রায় ১৭১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। আশঙ্কা করা হয়েছে, বাংলাদেশের তিন-চতুর্থাংশ মানুষের জীবনযাত্রার মান নিচে নেমে যেতে পারে। তাই দুর্যোগ প্রস্তুতির অংশ হিসেবে টেকসই দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কাঠামো গড়ে তোলার বিকল্প নেই। কার্যকর ও নিয়মতান্ত্রিক দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার জন্য জাতীয় থেকে ইউনিয়ন পর্যায়ে প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, বিভাগ, এজেন্সি, স্থানীয় সরকার সংস্থা ও জনগণের মধ্যে যথাযথ সমন্বয় বজায় রাখা গুরুত্বপূর্ণ। দুর্যোগ আক্রান্ত জনগণের ভোগান্তি হ্রাস করার লক্ষ্যে দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকারিতা নিশ্চিত করাও জরুরি।

একটি দেশের দীর্ঘদিনের অর্জিত অর্থনৈতিক ও সামাজিক অগ্রগতি দুর্যোগের কারণে বিলীন হয়ে যেতে পারে, যা একটি দেশকে কয়েক দশক পেছনে ঠেলে দেয়। তাই দুর্যোগ-পরবর্তী বিভিন্ন উদ্ধার ও পুনর্বাসন কার্যক্রম সম্পাদনের পাশাপাশি দুর্যোগ-ঝুঁকি হ্রাসে কার্যকর পদক্ষেপ এবং দক্ষ দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি গড়ে তোলা নীতিনির্ধারকদের মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রাখা জরুরি। আমাদের মনে রাখতে হবে বিশ্বের জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। দুর্যোগ-ঝুঁকি এবং বিপদাপন্ন হওয়ার দিক থেকে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান যথাক্রমে ষষ্ঠ ও পঞ্চদশ। তাই জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, প্রকৃতিতে মানুষের অপরিকল্পিত হস্তক্ষেপ, নদী শাসন প্রভৃতির প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ নানা প্রভাবজনিত কারণে বাংলাদেশের বিপদাপন্ন হওয়ার শঙ্কা কয়েক গুণ বেড়েছে। বিভিন্ন সময়ের প্রাকৃতিক দুর্যোগগুলোয় যেমন জানমালের ক্ষতি হয়েছে, তেমনি অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণও অনেক বেড়ে গেছে, যা বাংলাদেশকে তার উন্নয়ন অগ্রযাত্রা থেকে পিছিয়ে দিচ্ছে।