সংবাদপত্রে দেখলাম এবং আমার প্রকাশক একদিন ফোন করে জানালেন যে, প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর ১৫০ কোটি টাকার বই কিনতে যাচ্ছে। সংবাদটি নিশ্চয়ই আনন্দের এবং একটু ভিন্নধর্মী! কারণ সরকারি শিক্ষা বিভাগ এতগুলো টাকার বই কিনবে! আমাদের দেশে সরকারি স্কুল কলেজের সংখ্যা খুবই নগণ্য, তবে সেগুলোর প্রতিটিতেই পাঠাগার আছে। সেগুলোর জন্য কখনও কেন্দ্রীয়ভাবে বই কেনা হয় কিনা, এ ধরনের খবর কখনও দেখিনি। 

বেসরকারি স্কুল কলেজের সংখ্যই বেশি। সেগুলোতে কিছু কিছু বই স্থানীয়ভাবে ক্রয় করা হয়, কমিটির মর্জি অনুযায়ী কিংবা প্রতিষ্ঠান প্রধানের আগ্রহের ওপর নির্ভর করে।  প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর একসঙ্গে এতগুলো বই ক্রয় করবে তাতো আমাদের দেশে কল্পনাও করা যায় না। সরকারি প্রতিষ্ঠানে বই কিনবে কেন। জ্ঞানচর্চার প্রতি হঠাৎ এই আগ্রহ কেন বিষয়টি আমাকে একটু ভাবিয়ে তুলেছে। কিন্তু তারপরেই শুনলাম যে, বইগুলো কেনা হবে মাত্র কয়েকটি প্রকাশনা থেকে। 

দ্বিতীয় আর একটি সংবাদ হচ্ছে, এই বইগুলো কেনায় কোনো নিয়ম মানা হবে না। 

সবকিছু মিলে একটু ধাঁধার মধ্যে পড়ে গেলাম। আরও পরে  জানলাম যে, বঙ্গবন্ধুর শততম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে সারাদেশের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ‘বঙ্গবন্ধু কর্নার’ তৈরি করা হচ্ছে সেখানে বইগুলো দেয়া হবে। বিষয়বস্তু সাধারণত বঙ্গবন্ধুর জীবনকর্ম, মুক্তিযুদ্ধ এবং  বাংলাদেশ। এটি নিশ্চয়ই প্রশংসনীয় উদ্যোগ। আমাদের শিশুরা বই পড়বে, তাদের জানার জগত বিস্তৃত হবে। কিন্তু নিয়ম না মেনে বই কেনা কেন? এমনিতেই অনিয়মের শেষ নেই সরকারি অফিস আদালতে। প্রায় সব সরকারি  দফতরে জনগণের সেবা শূন্যের কোঠায়। তারা চাকরি করেন সরকারের, জনগণের সঙ্গে তাদের কোনো লেনদেন নেই! এটি যেন সব সরকারি দফতরের নিয়ম এবং নীতি। কাজ যদি কিছু করতেই হয় তাহলে আপনাকে সরকারের প্রভাবশালী কারোর মাধ্যমে যেতে হবে, নয়তো গুনতে হবে বড় অংকের ঘুষ। 

শিশুদের জন্য বই কেনার ক্ষেত্রেও সেই একই অবস্থা? তাহলে সেই বই পড়ে শিশুরাই বা কী শিখবে আর আমরাই বা বিবেকের কাছে কী জবাব দেব? শুনেছি জাতীয় গ্রন্থাগার অধিদপ্তর ও জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র মিলে প্রতিবছরই নাকি দুই থেকে তিন কোটি টাকার বই কেনে। এসব কেনাকাটার সঙ্গে  অনেক দীর্ঘসূত্রতা, ধরা করাসহ আরও অনেক বিষয় জড়িয়ে থাকে। সবকিছু মিলে সৃজনশীল বইয়ের জগত, সৃজনশীল প্রকাশনা শিল্প বেশ দুরবস্থার মধ্যে আছে। 

বাংলাদেশ প্রকাশনা শিল্পের সঙ্গে জড়িত আছে শ’তিনেক প্রকাশক। তারা প্রতিবছর নতুন বই প্রকাশ করেন, নতুন লেখকদের বই ছাপেন। এই সংখ্যা ১৮ কোটি মানুষের দেশে গড়ে হাজার চারেকের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে। কারণ জ্ঞান, জ্ঞানের বিস্তার ইত্যাদি নিয়ে তো কারোর এত চিন্তাভাবনা নেই, বা থাকার কথাও নয়। বই সবাই পড়তে পারে না, বইয়ের মধ্যে যে, মানসিক খাবার লুক্কায়িত সেটি সবাই খেতেও জানেন না। 

আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যার একবার বলেছিলেন, ‘বই পড়ার পর যে জ্ঞান মানুষের মধ্যে সঞ্চারিত হয় তা মানুষের মনে ছড়িয়ে যায় যা হজম করার ক্ষমতা সবার থাকে না। ’ এটি যথার্থই সত্য। আর তাই আমরা দেখি একটু সচ্ছল হলে দু’জন বন্ধু মিলে আড্ডা দিতে দিতে বার্গার কফি কিংবা কোল্ড ড্রিংক খেয়ে আটশ, এক হাজার টাকা বিল করে ফেলেন, ওয়েটারের হাতে পঞ্চাশ টাকা ধরিয়ে দিয়ে দিব্যি চলে আসেন, একটি বিকাল এভাবে কাটিয়ে দেন। কিন্তু দুইশ বা তিনশ টাকা দিয়ে হয়তো সারা বছরেও বই কেনা হয় না। 

জানা গেছে যে, বাংলাদেশ জ্ঞান ও সৃজনশীল প্রকাশক সমিতি প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরকে চিঠি দিয়েছে যাতে নির্বাচিত প্রতিটি বইয়ের ৬৫ হাজার কপি ক্রয় প্রক্রিয়া বাতিলের আবেদন করা হয়েছে। সৃজনশীল প্রকাশকদের কাছে উপযুক্ত বইয়ের তালিকা ও নমুনা কপি আহ্বানের মাধ্যমে বাছাই কমিটি কর্তৃক বই নির্বাচন করে দ্রুত ক্রয প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে তারা অনুরোধ করেছেন। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর থেকে এখনও কোনো প্রতিক্রিয়া জানানো হয়নি। 

তারা দাবি করেছেন যে, ৩০০ প্রকাশকের কাছ থেকে ৫০ লাখ টাকার বই কিনলে কমপক্ষে ছয়শ থেকে দুই হাজার আইটেমের কয়েক হাজার করে বই কেনা সম্ভব। এটি করা হলে তিনশ প্রকাশক মোটামুটি সমানুপাতিক হারে বই সরবরাহ করতেন এবং বেঁচে যেত সৃজনশীল প্রকাশকরা, বেঁচে যেতেন তাদের পরিবার পরিজন, এই দুর্বিসহ সময়ে। 

বিভিন্ন প্রকাশকদের কাছ থেকে মুক্তিযুদ্ধ ও বাংলাদেশ নিয়ে লিখিত বই ক্রয় করলে একদিকে যেমন ভালো বইগুলো সংগ্রহ করা যেত অন্যদিকে প্রকাশকরাও বেঁচে যেতেন, সেই সঙ্গে কিছু লেখকও কিছু রয়্যালটি পেতেন। যেটি এই প্রকাশনা শিল্পে একটি বিরল ঘটনা, মাত্র দু’চারজনের ক্ষেত্রে এটি ঘটে। 

বলা যায়, পেশাদরিত্ব এই শিল্পে একেবোরেই গড়ে ওঠেনি।  পেশাদারিত্ব গড়ে না ওঠার পেছনে সবাই কমবেশি দায়ী। সৃজনশীল প্রকাশনা শিল্পের সঙ্গে যারা জড়িত তাদের ভেতর দেখা যায় যারা টাকা দিযে বই ছাপান তাদের অগ্রাধিকার দিয়ে থাকেন। নগদ কিছু পাওয়ার জন্য তাদের বই ছাপিয়ে দেয়া হয়। কিন্তু সেই বই পাঠক পড়বেন কিনা সে নিযে তারা চিন্তা করেন না। 

তাছাড়া যে বই পাঠকের হৃদয়কে সমৃদ্ধ করবে না বা করে না, পাঠককে আনন্দ দিবে না, নতুন তেমন কিছু দিবে না সে জাতীয় বই তারা কেন আগেভাগে ছাপেন, সেটি একটি অশ্চর্যজনক বিষয়। যে বই পাঠকের হৃদয়কে নাড়া দেয়, যে বই পাঠক চান বা বইয়ের কন্টেন্ট দেখলেই চাইবেন; শিক্ষার্থীদের, শিক্ষকদের, অন্য অনেক পেশার লোকদের কাজে লাগবে- সেই বই তারা ফেলে রাখেন, খোঁজ রাখেন না। তারা খুঁজে টাকা দিয়ে কারা বই ছাপাবেন সে ধরনের লেখকদের। এটি আমাদের প্রকাশনা শিল্পের একটি অন্ধকার দিক। 

এই শিল্পের সঙ্গে যারা জড়িত তাদের দায়িত্ব তো শুধু একুশে ফেব্রুয়ারির মেলায় একটি স্টল দিয়ে নতুন কিছু বই টাকা দিয়ে ছেপে তাদের মাধ্যমে কিছু ‘জোরপূর্বক বিক্রি করা’ নয়। তাদের দায়িত্ব হচ্ছে পাঠকদের কাছে ভালো বই পৌঁছে দেয়া, নতুন নতুন পাঠক সৃষ্টি করা। একজন পাঠক যখন অপাংক্তেয় কোনো বই হাতে পেয়ে পড়েন, এভাবে তার বইপড়ার স্বাদ নষ্ট করে দেয়া হয়। তার তখন ‘ঘর পোড়া গরু যেমন সিঁদুরে মেঘ দেখলেই ভয় পায়’ তেমন অবস্থা হয়। তার রুচি দীর্ঘদিনের জন্য কিংবা সাড়া জীবনের জন্য নষ্ট করে দেয়া হয়া। 

এটিতো সৃজনশীল প্রকাশনা শিল্পের করার কথা নয়। নিজের অভিজ্ঞতায় দেখেছি, যেসব লেখা শিক্ষা বিষয়ক যা শিক্ষার্থী, শিক্ষক, যারা শিক্ষক হবেন, সমাজ নিয়ে যারা ভাবেন তাদের নিয়ে লেখা পত্রপত্রিকায় আসে, সে লেখাগুলোর সমৃদ্ধ ও প্রসারিত কপি দিয়ে বই করার জন্য যখন প্রকাশকদের বলি, তখন তারা নেনও কিন্তু রেখে দেন ছাপার একেবারের শেষের সারিতে। মেলা শেষ হয় তখনও তারা ছাপেন না। ছাপি, ছাপছি করে দু’একবছর একেবারেই ছাপেন না। তারা যারা টাকা দিয়েছে তাদেরটা ছাপেন। 

পাঠকদের রুচি নষ্ট হওয়া কিংবা পাঠকদের কাছে ভালো কিছু পৌঁছানো, এ বিষয়টি না ঘটলে এ শিল্পে দুর্দিন তো থাকবেই। সবাই তো হুমায়ূন আহমেদ স্যার নন, কিংবা জাফর ইকবাল স্যার নন। তাদের একটি বই নেয়ার জন্য প্রকাশকরা হন্যে হয়ে খুঁজেন, বহু ধরাধারি করেন। কিন্তু নতুন লেখক বানাতে হবে, নতুন ভালো লেখকদের চিন্তার জগতকে প্রসারিত করার জন্য সমৃদ্ধ করার জন্য যে প্রচেষ্টা, যে সহযোগিতা প্রয়োজন তা প্রকাশকরা করেন না। কাজেই প্রকাশনা শিল্পের দুদর্শার জন্য শুধু পাঠক কিংবা সরকার দায়ী নয়, কমবেশি সবাই দায়ী। 

আমি শুনে অবাক হয়েছি যে, দু চারটি ছাড়া প্রায় সব প্রকাশকদের জেলা পর্যায়ে কোনো প্রতিনিধি নেই, কোনো বইয়ের দোকানের সঙ্গে যোগাযোগ নেই। দেশের ৬৪টি জেলায় যদি কোনো প্রকাশকের পরিচিত একটি করেও দোকান থাকে আর দশটি করে বই পাঠানো হয় তাহেল কিন্তু ৬৪০ টি বই চলে গেল। প্রতিটি জেলায় গড়ে ১৪টি  উপজেলা আছে । ৪৮৫টি উপজেলায় যদি ৫টি করে বইও যায় তাহলে কত হাজার বই বিক্রি হলো! 

একজন প্রকাশকের প্রতিটি জেলায় বা উপজেলায় যে নিজের দোকান থাকতে হবে এমন নয়, বা বেতনভোগী কর্মী রেখে দিতে হবে এমনও নয়। একটু ভিন্ন ধরনের ব্যবস্থাপনা, বইয়ের বড় বড় দোকানদারদের সঙ্গে এক ধরনের যোগাযোগ রক্ষা করার বিষয়টি এখানে করা প্রয়োজন। সেটি তারা করেন না। তাদের ধারণা একুশে বই মেলায় সবাই তাদের কাছে এসে বই কিনবে। না হয় লেখককে জোর করে ধরিয়ে দিবেন বই বিক্রি করতে। 

বই প্রকাশ ও বিপণন তো আলাদা স্কিল, আলাদা দক্ষতা, আলাদা বিষয়। লেখকদের তো সেই ধরনের দক্ষতা থাকার কথা নয়। থাকবে না। তিনি তারা চিন্তার জগতে, ভাবনার জগতে থাকেন। এই কাজগুলো প্রকাশকেরই। তাই সবার প্রকাশক হওয়া উচিত নয়, বিশেষ করে যারা শুধু ব্যবসার মানসিকতা নিয়ে এই পেশায় আসেন। ব্যবসা তারা অবশ্যই করবেন কিন্তু সেটি মানসম্মত বই না ছেপে সাময়িক অর্থের লোভে নিম্নমানের বইকে অগ্রাধিকার দিয়ে নয়। পাঠক সৃষ্টি করা, বইয়ের বাজার প্রসারিত করার মুখ্য দায়িত্ব তাদেরই। 

এসব তারা করেন না বলেই সরকারি কোনো বই কেনার কথা এলে তারা দৌড়ঝাঁপ শুরু করেন। শুরু হয় কে কাকে পেছনে ফেলে সামনে আগাবে। আর সরকারি কর্মকর্তাদের মধ্যে শুরু অসৎ লেনদেন। এভাবে দেশের সর্বত্রই যদি দুর্নীতি থাকে তাহলে মানুষ যাবে কোথায়, লেখকরা যাবেন কোথায়?  অসৎ উপায়েই যদি এসব করতে হয় তাহলে বইয়ের মতো পবিত্র বস্তুর কারবার না করাই ভালো। অন্য বহু ব্যবসা আছে। সেগুলোর দিকে হাত বাড়ানো যেতে পারে। 

বই শিল্প, প্রকাশনা শিল্প তো সাধারণ কোনো ব্যবসা নয়, এটি জ্ঞানের জগত, এটি আলাদা জগত, আলাদা পেশা। সেটি খেয়াল রাখতে হবে। আমরা চাই এই পেশায় পুরো পেশাদারিত্ব সৃষ্ট হোক তাহলে পাঠকও বাড়বে, প্রকাশকদের ব্যবসারও প্রসারণ ঘটবে। তখন আর অসৎ সরকারি কর্মকর্তাদের পেছনে ছুটতে হবে না, ঘুষ দিয়ে বই বিক্রির কথা চিন্তা করতে হবে না। 

লেখক: শিক্ষা বিশেষজ্ঞ ও গবেষক

ব্র্যাক শিক্ষা কর্মসূচিতে কর্মরত