আন্তর্জাতিক রাজনীতির মঞ্চে ইরান ও আমেরিকা মানেই যেন আদায়-কাঁচকলায় সম্পর্ক। তেহরানের রাস্তায় ‘ডেথ টু আমেরিকা’ স্লোগান আর ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে তেহরানের ওপর একের পর এক নিষেধাজ্ঞা—এটাই সাধারণ চিত্র। কিন্তু এ প্রকাশ্য শত্রুতার আড়ালে লুকিয়ে আছে এক অন্য রকম ইতিহাস। ইতিহাসের পাতায় তাকালে দেখা যায়, নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষা বা আঞ্চলিক স্বার্থের প্রয়োজনে এ দুই চিরশত্রু বারবার একে অন্যের হাত ধরেছে, লড়েছে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে।
আফগানিস্তান থেকে ইরাক কিংবা আইএস দমন থেকে শুরু করে গোপন অস্ত্র লেনদেন—এমন অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে দেখা গেছে ইরান ও আমেরিকার এ ‘শত্রুতা ও মৈত্রীর’ অদ্ভুত রসায়ন। ইরান-আমেরিকার বন্ধুত্ব সবচেয়ে ভালো মঞ্চায়ন দেখা গিয়েছিল আমেরিকান-আফগানিস্তান যুদ্ধে। যেখানে তেহরান ও ওয়াশিংটন অবস্থান নিয়েছিল একই শিবিরে। ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কের টুইন টাওয়ারে হামলার পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ যখন ‘ওয়ার অন টেরর’ বা সন্ত্রাসবাদবিরোধী যুদ্ধের ডাক দিলেন, তখন তার প্রথম লক্ষ্য ছিল আফগানিস্তানের তালিবান সরকার।
মজার ব্যাপার হলো, এ যুদ্ধে আমেরিকার সবচেয়ে বড় সামরিক ও কৌশলগত মিত্র হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিল ইরান। তৎকালীন কুদস ফোর্সের প্রধান জেনারেল কাসেম সোলাইমানি এবং মার্কিন কর্মকর্তাদের মধ্যে জেনেভা ও তেহরানে একাধিক গোপন বৈঠক হয়। ইরান কেবল তাদের ভূখণ্ড দিয়ে মার্কিন মানবিক সাহায্য চলাচলের অনুমতি দেয়নি, বরং তালিবানদের সামরিক অবস্থান, রসদ সরবরাহ লাইন এবং ভূপ্রকৃতি-বিষয়ক অত্যন্ত সংবেদনশীল গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহ করেছিল। বিশেষ করে ২০০১ সালের নভেম্বরে হেরাত শহর মুক্ত করার যুদ্ধে ইরানের বিশেষ বাহিনী এবং মার্কিন বিমান বাহিনী কার্যত সমন্বিতভাবে কাজ করেছে।
ইরানের প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ‘নর্দান অ্যালায়েন্স’ যোদ্ধারা যখন মাটিতে লড়াই করছিল, মার্কিন বি-৫২ বোমারু বিমানগুলো তখন আকাশ থেকে তাদের পথ পরিষ্কার করে দিচ্ছিল। এ অঘোষিত মৈত্রী ছাড়া আমেরিকার পক্ষে এত দ্রুত তালিবানদের হঠানো অসম্ভব ছিল। তবে ইরান যে এই যুদ্ধে আমেরিকাকে সহযোগিতা করেছিল তার একটি জোরালো কারণও অবশ্য রয়েছে। ১৯৯৮ সালে হেরাতে তালিবানরা ইরানি কনস্যুলেটে হামলা চালিয়ে ১১ জন ইরানি কূটনীতিক ও সাংবাদিককে হত্যা করেছিল। মূলত এটির প্রতিশোধ নিতেই হেরাত যুদ্ধে আমেরিকার পাশে দাঁড়িয়েছিল ইরান।
তবে এ সহযোগিতার সম্পর্ক বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। ২০০২ সালের জানুয়ারিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ ইরানকে ‘অশুভ অক্ষশক্তি’ (অ্যাকসিস অব এভিল) হিসেবে ঘোষণা করলে এ ‘বন্ধুত্বের’ অবসান ঘটে। ইরান-আমেরিকার গোপন বন্ধুত্বের আরেকটি প্রামাণ্য দলিল হয়ে আছে ইরান-কন্ট্রা বিতর্ক। আশির দশকে ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় যখন দুই দেশ একে অন্যকে ধ্বংস করতে মরিয়া, তখনই ঘটেছিল বিশ্ব রাজনীতির অন্যতম চাঞ্চল্যকর ‘ইরান-কন্ট্রা অ্যাফেয়ার’।
রোনাল্ড রিগ্যান প্রশাসন জনসমক্ষে ইরানকে ‘সন্ত্রাসবাদের মদদদাতা’ বললেও পর্দার আড়ালে তাদের সঙ্গেই গোপন অস্ত্র ব্যবসায় লিপ্ত হয়েছিল। লেবাননের হিজবুল্লাহর হাতে বন্দি মার্কিন জিম্মিদের মুক্ত করতে ইসরায়েলের মধ্যস্থতায় ইরানের কাছে শত শত ট্যাংকবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র বিক্রি করেছিল আমেরিকা। এ লেনদেনের সবচেয়ে নাটকীয় দিক ছিল সেই অস্ত্র বিক্রির মুনাফা। আমেরিকা সেই টাকা গোপনে ‘কন্ট্রা’ বিদ্রোহীদের কাছে পাঠিয়ে দিয়েছিল, যাতে তারা দেশটির বামপন্থী সরকারকে উৎখাত করতে পারে।
কেবল ইরান-ইরাক যুদ্ধ নয়, ২০১৪ সালে যখন ইসলামিক স্টেট (আইএস) পুরো মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্র বদলে দিতে শুরু করে, তখন ইরান ও আমেরিকা উভয়ই এক অভিন্ন অস্তিত্ব সংকটের মুখোমুখি হয়। আইএসের চরমপন্থী সুন্নি মতাদর্শ ইরানের শিয়া শাসন ব্যবস্থা এবং ওই অঞ্চলে আমেরিকার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব—উভয়ের জন্যই হুমকি ছিল। এ ‘কমন এনিমি’ বা সাধারণ শত্রু আবারো এ দুই ‘প্রকাশ্য শত্রু’ শক্তিকে একপক্ষ করে যুদ্ধক্ষেত্রে নিয়ে আসে।
২০১৬-১৭ সালের ঐতিহাসিক মসুল পুনরুদ্ধারের যুদ্ধের দিকে তাকালে এক বিস্ময়কর সামরিক কৌশল চোখে পড়ে। একদিকে মার্কিন নেতৃত্বাধীন জোট আকাশপথে আইএসের ওপর বিধ্বংসী বোমা হামলা চালাচ্ছে, আর অন্যদিকে মাটিতে কাসেম সোলাইমানির সরাসরি তত্ত্বাবধানে থাকা শিয়া মিলিশিয়া বাহিনী ‘হাশদ আল-শাবি’ সম্মুখ সমরে লড়ছে। যদিও ওয়াশিংটন বা তেহরান কখনই একে অন্যকে ‘মিত্র’ বলে স্বীকার করেনি, কিন্তু ইরাকি সেনাবাহিনীর মাধ্যমে তাদের মধ্যে এক ধরনের ‘কৌশলগত ডিকনফ্লিকশন’ বা সংঘাত এড়ানোর নীতি বলবৎ ছিল। কার্যত আমেরিকার এয়ার পাওয়ার এবং ইরানের ‘বুটস অন দ্য গ্রাউন্ড’—এ দুইয়ের সমন্বয়েই মধ্যপ্রাচ্য থেকে আইএসের খেলাফত নির্মূল করা সম্ভব হয়েছিল।
মসুলের আগে ইরাকের তিকরিত ও ফালুজা মুক্ত করার লড়াইয়েও একই চিত্র দেখা গেছে। তিকরিত অভিযানে শুরুতে ইরান সমর্থিত বাহিনী ব্যর্থ হওয়ার পর মার্কিন বিমান হামলা পরিস্থিতি বদলে দেয়। ২০০৩ সালে সাদ্দাম হোসেনের পতনের পর ইরাকের পুনর্গঠনেও ইরান ও আমেরিকার মধ্যে একটি অলিখিত সমঝোতা ছিল। আমেরিকা চেয়েছিল ইরাকে একটি স্থিতিশীল সরকার থাকুক যা ইরানের শত্রু হবে না, আবার ইরান চেয়েছিল তাদের প্রতিবেশী দেশটিতে এমন এক সরকার থাকুক যার সঙ্গে তাদের ধর্মীয় ও রাজনৈতিক মিল থাকবে।
এ দুই বিপরীতধর্মী চাওয়ার মিলবিন্দুতে দাঁড়িয়ে ইরাকে শিয়া নেতৃত্বাধীন সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়। বহু বছর ধরে ইরাকের মাটিতে মার্কিন সেনা এবং ইরান সমর্থিত বাহিনী একে অন্যের চোখের সামনে থাকলেও বড় কোনো সরাসরি সংঘাতে জড়ায়নি, যতক্ষণ না ২০২০ সালে সোলাইমানি হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে সেই ভারসাম্যে চির ধরে। যা ২০২৬ সালের আজকে পর্যন্ত আর জোড়া লাগেনি।
এ মুহূর্তে ইরান-আমেরিকা সম্পর্ক ইতিহাসের সবচেয়ে জটিল মোড় অতিক্রম করছে। একদিকে পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে টানাপড়েন এবং অন্যদিকে লোহিত সাগরে হুতি বিদ্রোহীদের কর্মকাণ্ড নিয়ে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা। এছাড়া ইসরায়েলের সঙ্গে ২০২৫ সালের যুদ্ধের সময় ইরানের সীমানার ভেতরে পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে এক দফা বোমাবর্ষণও করেছে আমেরিকা। ইরানকে পুরোপুরি কব্জা করে নিতে চলছে পরবর্তী যুদ্ধের প্রস্তুতি।
তার পরও ইরান ও আমেরিকার সম্পর্ককে কখনই সাদা-কালো চশমায় দেখা সম্ভব নয়। এখানে শত্রুতা যেমন সত্য, প্রয়োজনে গোপন সহযোগিতা ঠিক ততটাই বাস্তব। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ভাষায় যাকে বলা হয় ‘রিয়েলপলিটিক’, অর্থাৎ যেখানে জনসমক্ষে দেয়া ভাষণের চেয়ে পর্দার আড়ালের কৌশলগত সুবিধাই শেষ কথা।
ইরান ও আমেরিকা একে অন্যের অস্তিত্ব অস্বীকার করলেও কূটনীতির দাবা খেলায় স্বার্থের প্রশ্নে তারা একে অন্যের অবিচ্ছেদ্য অংশও। ইতিহাসও এ বক্তব্যকে সমর্থন দেয়। ওই অঞ্চলে রাজনৈতিক পরিবেশের যখনই বড় কোনো পরিবর্তন এসেছে, তারা তখনই আভির্ভূত হয়েছে একে অন্যকে সহযোগী রূপে। আবার যখনই এদের বন্ধুত্ব ভেঙেছে, দুই পক্ষেই রক্তক্ষরণও বেড়েছে কয়েক গুণ। ২০২৬ সালের এ উত্তাল সময়ে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন একটাই—আগামী দিনে কোনো নতুন ‘সাধারণ শত্রু’ কি আবারো এ দুই চিরশত্রুকে একই টেবিলে বসাবে? নাকি দৃশ্যমান শত্রুতাই তাদেরকে মুখোমুখি করবে নতুন কোনো যুদ্ধক্ষেত্রে?
তুহিন সাইফুল ইসলাম: ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক ও লেখক










