আগুন শব্দটার কথা শুনলেই মনে ভয় জাগে। তার ওপর যদি শোনা যায় বৈশ্বিক বাজারে আগুন লেগেছে, তাহলে তো কথাই নেই। এ আগুনের শিখা বিদেশের গণ্ডি পেরিয়ে দেশেও ঢুকে পড়েছে। খাদ্যসামগ্রী থেকে শুরু করে প্রসাধনসামগ্রী, বাস ভাড়া থেকে শুরু করে প্লেন ভাড়া সবখানেই এর তাপ অনুভূত হচ্ছে। কথা হলো, এ আগুন লাগাল কে? এটা অনেক বড় প্রশ্ন। কিন্তু এটা কি অতিরিক্ত চাহিদার কারণে হয়েছে, না নিষেধাজ্ঞার জন্য, নাকি বৈদেশিক মূল্যবৃদ্ধি কিংবা তেজি ডলারের জন্য হয়েছে। আসলে করোনা-পরবর্তী বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের সঙ্গে সঙ্গে সামগ্রিক চাহিদা বাড়ছিল যা পণ্য মূল্যবৃদ্ধিতে ভূমিকা রেখেছে। এরপর যখন এ বছরের ২৪ ফেব্রুয়ারি রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হয় তখনই সব চিত্র পাল্টে গেল। পাল্টাপাল্টি নিষেধাজ্ঞার কারণ বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থা বলতে গেলে একেবারেই ভেঙে গেল। শুধু তাই নয়, পরিবহন ব্যবস্থার সমস্যা, ক্রমবর্ধমান অনিশ্চয়তা, জ্বালানি থেকে খাদ্যদ্রব্য সবকিছুর দাম বাড়ায় বৈশ্বিক মূল্যবৃদ্ধিকে আরো ত্বরান্বিত করছিল। এ রকম কঠিন পরিস্থিতিতে যুক্ত হলো ডলারের ক্রমাগত মূল্যবৃদ্ধি। ডলারের মূল্য গত বছর থেকেই ঊর্ধ্বগামী। কিন্তু এ গ্রীষ্মে অনেক বেড়ে গেল। মূল্যস্ফীতি মোকাবেলায় একদিকে ফেডারেল রিজার্ভ আগ্রাসীভাবে সুদের হার বাড়াচ্ছিল এবং বাড়াচ্ছে, অন্যদিকে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে ক্রমবর্ধমান অনিশ্চয়তার মুখে সারা দুনিয়া থেকে বিশেষ করে উদীয়মান অর্থনীতিগুলো থেকে পুঁজি নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে বাইডেনের দেশে চলে যেতে লাগল। ডলার শক্তি সঞ্চয় করতে লাগল। পৃথিবীর দাপুটে মুদ্রাগুলো পর্যন্ত যেমন ইউরো, ব্রিটিশ পাউন্ড, জাপানি ইয়েন তাদের শক্তি হারাতে লাগল।

আমাদের মতো ছোট এবং উন্মুক্ত অর্থনীতির জন্য এ রকম অভিঘাতের ঝুঁকি সহ্য করা খুবই কঠিন। কারণ বিশ্ববাজারে আমরা মূল্য নির্ধারণ করতে পারি না, আমরা হচ্ছি দামগ্রহীতা দেশ। আমাদের জোগানরেখা সবসময় সমান্তরাল। যেমন বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম যা হবে, তাই আমাদের মেনে নিতে হবে। বৈশ্বিক মূল্যবৃদ্ধি ও বিনিময়মূল্যের বৃদ্ধি—এ দুয়ের সম্মিলিত প্রভাব আমাদের দেশে ঢুকে মূল্যস্ফীতি বা দামের আরো বৃদ্ধি ঘটাতে লাগল। অর্থনীতিবিদরা একে বলেন, আমদানীকৃত মূল্যস্ফীতি। ইউরোমনিটর ইন্টারন্যাশনাল ম্যাক্রো মডেলের হিসাব অনুযায়ী, ২০২২-২৩ সালে বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতির হার ধরা হয়েছে যথাক্রমে ৭ দশমিক ৯ এবং ৫ শতাংশ। আর উন্নয়নশীল বিশ্বের জন্য এ হার হলো যথাক্রমে ৯ দশমিক ৫ এবং ৬ দশমিক ৫ শতাংশ। বাংলাদেশে এ হার জুন, ২০২২-এর ৭ দশমিক ৫৬ থেকে কমে জুলাই, ২০২২-এ ৭ দশমিক ৪৮ শতাংশে নেমে এসেছে। কিছুটা স্বস্তির যদি না নিম্ন সম্ভাবনা কিন্তু উচ্চ-মন্দ প্রভাবের কোনো ঘটনা না ঘটে। ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার ভাষায় যেগুলোকে টেইল ইভেন্ট বলা হয়।

মূল্যস্ফীতির সমস্যা হলো ধনী মানুষ যদিও এতে কিছুটা বিরক্ত হয় কিন্তু মধ্যবিত্ত এবং গরিব মানুষ এতে বিরক্ত ও ক্ষুব্ধ হয়। কেন? কারণ, তার পকেটে যে টাকা আছে তা দিয়ে সে আর আগের মতো বাজার করতে পারছে না। মানে তার ক্রয়ক্ষমতা কমে গিয়েছে, বাজারে সে দরকষাকষির সুযোগ হারাচ্ছে। সবকিছুর সারকথা হলো টাকার মূল্য কমে গিয়েছে, নিজেকে সে অসহায় মনে করছে। তাহলে বোঝা গেল মূল্যস্ফীতিটা আমাদের কাম্য নয়। আবার এটি যদি দ্রুত বাড়ে (যাকে বলে তীব্র ও অপ্রতিরোধ্য মূল্যস্ফীতি)  তাহলে তো কথাই নেই। পাঠক চমকে গেলেন? বেশি দিন আগের কথা নয়। দক্ষিণ আমেরিকার দেশ ভেনিজুয়েলায় মূল্যস্ফীতি ছিল ‘শুধুমাত্র’ ২৭৪ শতাংশ, ২০১৮ সাল নাগাদ এটি তীব্র ও অপ্রতিরোধ্য গতিতে বাড়তে বাড়তে হয়ে যায় ১ লাখ ৩০ হাজার শতাংশ। এক কাপ কফির দাম ছিল ৯ লাখ বলিভার। ২০০৮ সালে জিম্বাবুয়ে তাদের মুদ্রা বাতিল করে দেয়, যখন মূল্যস্ফীতির হার ৫০০ বিলিয়ন শতাংশ হলো। ১৯৯৪ সালে নিকারাগুয়ার এবং আর্মেনিয়ার অর্থনীতি মূল্যস্ফীতি দ্বারা আক্রান্ত হয়েছিল। উন্নত দেশ জার্মানিতে ১৯২২-২৩ এর দিকে প্রতি ৪১ ঘণ্টায় দাম বেড়ে দ্বিগুণ হয়ে যেত। তাহলে শুনুন, গৃহিণীরা কী করল! তারা দেখল, তাদের কাছে যে অর্থ রয়েছে তা দিয়ে জ্বালানি কিনলে রান্নার চুলা যতটুকু সময় ধরে জ্বালানো যায় তার চেয়ে বেশি সময় জ্বালানো যায় যদি সে অর্থকেই জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা যায়। কাজেই তারা তাদের মুদ্রাকে রান্নার জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করতে লাগল।

এত কথা বলার উদ্দেশ্য, মুদ্রা যদি তার স্বকীয় মূল্য হারিয়ে ফেলে, মানুষ তখন বিপন্ন হয়ে যায়, এ আশঙ্কা থেকেই কেউ কেউ অবস্থা বেগতিক দেখলে স্বর্ণ বা ডলার সঞ্চয় করতে থাকে। কারণ এদের সহজাত মূল্য সেভাবে কমে যাওয়ার সম্ভাবনা অনেক কম। এজন্য বিশ্বে যখন ডলার ও পণ্যমূল্য বাড়া শুরু হলো অনেকেই আমাকে জিজ্ঞাসা করছিল তারা কিছু ডলার বা স্বর্ণ কিনে রাখবে কিনা!

এখন প্রশ্ন হলো কীভাবে বিভিন্ন চ্যানেলের মাধ্যমে সৃষ্ট এ মূল্যস্ফীতির লাগাম টেনে ধরা যায়। পৃথিবীর প্রায় অর্থনীতিতে পলিসি সুদের হার বাড়ানো হয়েছে ও হচ্ছে, যার মাধ্যমে বিনিয়োগ ও ভোক্তা চাহিদা কমার মাধ্যমে সামগ্রিক চাহিদা কমবে বলে আশা করা হয়। এতে চাহিদা বৃদ্ধিজনিত মূল্যস্ফীতি কমবে বলে আশা করা যায়। আমাদের দেশেও অর্থনীতির এ অস্ত্র ব্যবহার করা যেতে পারে। ছোট দেশ হিসেবে আমাদের অনেক কিছু বিবেচনায় নিতে হয়। আগেই বলেছি, যেখানে আমরা দামগ্রহীতা দেশ, সেখানে আমদানির লাগাম টেনে ধরাটা আরেকটা বিকল্প হতে পারে। কিছু কিছু পণ্যের আমদানি একেবারেই সাময়িক বন্ধ করা যায়। বাংলাদেশ ব্যাংক এরই মধ্যে ২৭ পণ্যের আমাদানিতে ১০০ শতাংশ মার্জিন আরোপ করেছে। আবার ৩০ লাখ ডলার বা তার চেয়ে বেশি মূল্যের পণ্য আমদানিতে ২৪ ঘণ্টা আগে বাংলাদেশ ব্যাংককে জানাতে বলা হয়েছে।  আশা করা যায়, এর মাধ্যমে সম্ভাব্য মানি লন্ডারিংয়ের রাশ টেনে ধরা যাবে, যা বহুল আলোচিত একটি বিষয়। আমদানি কমানো ও মুদ্রা পাচার রোধের মাধ্যমে ডলারের ওপর চাপ কমবে, যা আমাদের রিজার্ভে ধনাত্মক প্রভাব ফেলবে। রাজস্ব নীতির একটি বড় অস্ত্র কর ব্যবস্থা। করের ভিত্তি বাড়ানোর মাধ্যমে সরকারি আয় না বাড়ালে বাজেট ঘাটতির ঝুঁকি আরো বেড়ে যাবে। এটি আবার ভবিষ্যতে মুদ্রাস্ফীতির সম্ভাবনাও বাড়িয়ে দেবে। 

একটি কথা না বললেই নয়, তা হলো চাহিদা জোগানের ওপর ডলারের মূল্য ছেড়ে দেয়ার বিষয়টি। বাজার ব্যবস্থায় ডলারের মূল্য নিরূপণ করা হোক। এতে রেমিট্যান্সও বাড়বে, যার মাধ্যমে আমাদের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও বাড়বে। আরেকটি হলো, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। আমরা যদি পদ্মা সেতু বানাতে পারি, তাহলে আমরা জলে-স্থলে অনুসন্ধানের মাধ্যমে নতুন নতুন জ্বালানি ক্ষেত্রও আবিষ্কার করতে পারব। তাছাড়া জ্বালানিসাশ্রয়ী যন্ত্রপাতি আমদানির শুল্ক কমাতে হবে। আমাদের অভ্যন্তরীণ সাপ্লাই চেইনে আরো শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে হবে যাতে প্রাথমিক জোগানের শুরু থেকে ভোক্তা পর্যায়ে ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা যায়। আমদানিনির্ভর কৃষিপণ্য দেশে যাতে বেশি বেশি উৎপাদন করা যায় সেদিকেও নজর দিতে হবে। খেলাপি ঋণের লাগাম টেনে ধরার মাধ্যমে ব্যাংকিং তথা অর্থনীতির স্থিতিশীলতা রক্ষায় বাংলাদেশ ব্যাংক দুর্বল ব্যাংকগুলোকে আরো দিকনির্দেশনা দিচ্ছে। আর্থিক খাতের সংস্কারের কথাও অনেকে বলছেন। রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার কারণে অনেক দেশে মূল্যস্ফীতির প্রভাব আরো তীব্র হয়েছে। ঘরের কাছে পাকিস্তান এর বড় উদাহরণ। কাজেই এসব বিষয়ে সবাই দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখবে বলে আমরা আশা করি। আসলে অর্থনীতির নীতির প্রতি মানুষের আস্থা কেমন, তার ওপর অনেক কিছু নির্ভর করে। গোটা দুনিয়ার আর্থিক ব্যবস্থা এ বিশ্বাসের ওপর টিকে আছে। বিশ্বাস নষ্ট হলে কী হয়, তা আমরা ২০০৮ সালের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকটের সময় দেখেছি। কাজেই আতঙ্কিত না হয়ে ধৈর্যের সঙ্গে পরিস্থিতি সামলে দেয়াটাও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার একটি বড় নিয়ামক হিসেবে কাজ করে, বিশেষ করে সংকটকালে।

কাজী নাইম মোরশেদ: ব্যাংকার
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক