পুরান ঢাকার আরমানিটোলা। সেখানে অবস্থিত হাজী মুসা ম্যানশনের ছয় তলা ভবনের নিচের গুদাম থেকে অগ্নিকাণ্ডে এখন পর্যন্ত চারজনের মৃত্যু হয়েছে। কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। এদের মধ্যে ইব্রাহিম সরকারের পরিবারের কথাই ধরা যাক। ছয় সদস্যের পরিবারের ছোট মেয়ে কলেজপড়ুয়া সুমাইয়া সরকার দগ্ধ হয়ে মারা গেছেন। দগ্ধ হয়ে আইসিইউতে আছেন বড় মেয়ে মুনা সরকার ও তার জীবনসঙ্গী আশিকুজ্জামান খান। ঢাকা মেডিকেলের বার্ন ইউনিটে চিকিত্সা নিচ্ছেন ছেলে জুনায়েদ সরকার ও স্ত্রী সুফিয়া সরকার। হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন নিজেও।

অগ্নিকাণ্ডের এ ট্র্যাজিডি ইব্রাহিমের বুকের ভেতরে দাউদাউ করে জ্বলছে। মাত্র দেড় মাস আগে বড় মেয়ের বিয়ে হয়েছে। মেয়ে পড়ত জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে, জামাতা বুয়েটে। করোনার মধ্যে ঘরোয়াভাবে বিয়ে হয়েছে। হয়তো পরে জাকজমকপূর্ণভাবে বিয়ের অনুষ্ঠান করতেন বাবা ইব্রাহিম। কতশত স্বপ্ন ছিল আশিক-মুনা নবদম্পতির মনেও। কিন্তু সব স্বপ্নও যেন এখন মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছে। বাবার আকুতি পরিবারের অন্য সদস্যদের বেঁচে থাকা নিয়ে। ইব্রাহিম সরকারের আকুতি, ‘আল্লাহ আমার পরিবারের সদস্যদের বাঁচিয়ে দেন’।

পুরান ঢাকায় অগ্নিকাণ্ডের এমন ঘটনা এটিই প্রথম না। ২০১৯ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি চকবাজারের চুড়িহাট্টার সেই ভয়াবহ ঘটনা আজও আমরা ভুলতে পারিনি। অগ্নিকাণ্ডের সে ঘটনায় স্বজন হারানো সেই সব ক্ষত এখনো দগদগে। ওয়াহেদ ম্যানশানে সংঘটিত আগুনে পুড়ে মারা যান ৭৮ জনের মতো। অথচ এ ঘটনার দুই বছর পার হয়েছে। বহু প্রতিশ্রুতি ও আশ্বাস মিলেছে। কমিটি গঠন হয়েছে। প্রতিবেদন জমা পড়েছে। সেগুলোর ওপর হয়তো ধূলার স্তুপ পড়েছে। সরেজমিনে তদন্তের পর তদন্ত চলেছে। অভিযান চলেছে। কিন্তু পরিস্থিতির বদল ঘটেনি। বহাল তবিয়তে রয়েছে এসব এলাকার রাসায়নিক গুদাম, প্লাস্টিক কারখানা। ফলাফল আরমানিটোলার অগ্নিকাণ্ড।

২০১০ সালের ৩ জুন রাসায়নিক গুদামের ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে প্রাণ হারান ১২৫ জন। এসব ট্র্যাজিডি কর্তা ব্যক্তিদের টনক নড়াতে পারে না। সাময়িক আশ্বাসেই তারা পরিস্থিতি শান্ত করতে চান। এরপর চলে আলোচনা ও পর্যালোচনা। এক পর্যায়ে সেটাও থেমে যায়। তখন এসব দৌঁড়ঝাপের জন্য অপেক্ষা করতে হয় অন্য কোনো দুর্ঘটনার!

গণমাধ্যমে পুরান ঢাকার আবাসিক এলাকায় রাসায়নিক গুদাম থাকার বিষয় তুলে ধরে অনেক প্রতিবেদন প্রকাশ হয়েছে। তারপরও সংশ্লিষ্ট এলাকার অনেক বাড়িতে রয়েছে রাসায়নিক গুদাম। সবমিলিয়ে এক একটি বাড়ি যেন এক একটি মৃত্যুকূপ। বৈধ-অবৈধ এসব রাসায়নিক গুদাম ও প্লাস্টিক কারখানা আবাসিক এলাকা থেকে সরিয়ে ফেলার আশ্বাসও দেয়া হয়েছে বিভিন্ন সময়ে। প্রকল্পও নেয়া হয়েছে। কিন্তু সেসব কার্যত এখনো বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে আবাসিক এলাকাতে অতিদাহ্য এসব রাসায়নিক রাখার বিরুদ্ধে নিয়মিত জোরদার অভিযানও চলে না। ফলে একটি দুর্ঘটনার ক্ষত শুকাতে না শুকাতেই নতুন দুর্ঘটনা ঘটে। অগ্নিকাণ্ডে মৃত্যুর মিছিল দীর্ঘ হয়। বাড়তে থাকে অবহেলাজনিত মৃত্যুর তালিকাও।

তবে সেসব নিয়ে যেন তেমন কোনো মাথা ব্যাথা থাকে না কর্তা ব্যক্তিদের। তারা সাময়িক আশ্বাস দেন। সমাধানের অলীক স্বপ্ন দেখান। তারপর ভুলেও যান। ফলে এসব আশ্বাস বাস্তবায়নের গতিতে ভাটা পড়ে। পুরান ঢাকার এসব রাসায়নিক গুদাম ও কারখানা সরিয়ে ফেলার উদ্যোগ কতটা কচ্ছপ গতিতে এগোচ্ছে, সেটি উঠে এসেছে বণিক বার্তায় প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে। যেখানে দেখা যায়, পুরান ঢাকা থেকে রাসায়নিক কারখানা স্থানান্তরে বিসিক কেমিক্যাল পল্লী নামে একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে শিল্প মন্ত্রণালয়। মন্ত্রণালয়ের বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক) প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে। ২০১৮ সালের ৩০ অক্টোবর ‘বিসিক কেমিক্যাল পল্লী, ঢাকা’ নামের প্রকল্পটি একনেকের অনুমোদন পায়। কথা ছিল ২০২২ সালের জুনের মধ্যে মুন্সীগঞ্জের সিরাজদিখান উপজেলায় প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হবে। তবে ২০২১ সালের এপ্রিল পর্যন্ত প্রকল্পের অগ্রগতি হলো, কেবল শুরু হয়েছে মাটি ভরাটের কাজ।

প্রাথমিকভাবে ২০১ কোটি ৮১ লাখ টাকায় বিসিকের এ প্রকল্পের আওতায় কেরানীগঞ্জের দক্ষিণ ব্রাহ্মণকীর্ত্তা মৌজায় ৫০ একর জমি চিহ্নিত করে ৯৩৬টি প্লট করার কথা বলা হয়েছিল। পরে চুড়িহাট্টা ট্র্যাজেডির পর প্রকল্পটি সংশোধন করে মুন্সীগঞ্জের সিরাজদিখানে ৩০৮ দশমিক ৩৩ একর জমি নিয়ে ‘বিসিক ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক, মুন্সীগঞ্জ (প্রথম সংশোধিত)’ প্রকল্প করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। সিরাজদিখানের কামারখান্দা, চিত্রকোট ও গোয়ালখালী মৌজায় বাস্তবায়িত এ প্রকল্পের আওতায় ২ হাজার ২৯০টি প্লট তৈরি হবে। সংশোধিত প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে ১ হাজার ৬১৫ কোটি ৭৩ লাখ টাকা। তবে এ প্রকল্পের অগ্রগতি নিয়ে ত্রুটি বিচ্যুতির কথা জানিয়েছে খোদ পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়াধীন বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি)।

তাদের প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রকল্প এলাকায় কাজ শুরু না হলেও সিরাজদিখান উপজেলার গোয়ালখালী গ্রামে পাঁচ হাজার বর্গফুটের একটি অফিস ভাড়া নেয়া হয়েছে। প্রতি মাসে এ অফিস ভাড়া বাবদ ব্যয় হচ্ছে প্রায় ৮০ হাজার টাকা। এছাড়া প্রকল্পের আওতায় একটি গাড়ি ভাড়া করে প্রতি মাসে ৮০ হাজার টাকা ভাড়া দেয়া হচ্ছে। আইএমইডির প্রতিবেদনে এটিকে ‘অপ্রয়োজনীয়’ বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।

এছাড়া মুন্সীগঞ্জের প্রকল্প এলাকা তৈরি হওয়ার আগে সাময়িকভাবে রাসায়নিক কারখানাগুলো ঢাকার শ্যামপুরে উজালা ম্যাচ ফ্যাক্টরিতে সরিয়ে নেয়ার সিদ্ধান্ত হয় ২০১৯ সালে। চুড়িহাট্টার দুর্ঘটনার পর ছয় মাসের মধ্যে এসব রাসায়নিকের গুদাম ও কারখানা সরাতে সময়সীমা বেঁধে দেয়া হয়। তবে দুই বছরেও তা সরেনি। এরও আগে নিমতলীর ঘটনার পর সে বছরই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় গঠিত কমিটি অগ্নিকাণ্ড প্রতিরোধে কিছু সুপারিশ করেছিল। যার অন্যতম ছিল রাসায়নিকের কারখানা ও গুদামগুলো সরিয়ে নেয়া। কিন্তু এসব সুপারিশ কেবল ফাইলবন্দি হয়েই রয়ে গেছে। পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। এ নিয়ে সরকারের বিভিন্ন দপ্তর-সংস্থার মধ্যে একে অপরের অসহযোগিতার কথাও বলা হয় বিভিন্ন সময়ে। 

সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোর এ সমন্বয়হীনতা ও দায়িত্ব-কর্তব্যের অবহেলায় দেশে প্রতিনিয়ত অবহেলাজনিত মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে। এগুলো যতটা না দুর্ঘটনা, তার চেয়ে বেশি অবহেলাজনিত মৃত্যু। সেই অর্থে এগুলো হত্যাকাণ্ডও বটে। অথচ এসব নৈরাজ্য বন্ধ করতে সংশ্লিষ্টরা বরাবরই থাকছেন নির্বিকার। আমরাও সহজে ভুলে যাই।

লেখক: সংবাদকর্মী