সাম্প্রতিক বছরগুলোয় ডেঙ্গু প্রবলভাবে হানা দিচ্ছে। শুধু ২০২০ সালে ডেঙ্গুর প্রকোপ কম ছিল। বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য, শক্তিশালী করোনা ভাইরাসের কারণে দুর্বল হয়ে পড়েছিল ডেঙ্গু। পরের বছর করোনার সংক্রমণ কমতেই আবার শক্তিশালী হয়ে উঠেছে ডেঙ্গু। বছরের শুরু থেকে এ পর্যন্ত সরকারি হিসেবে ৪০ ব্যক্তি ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেছেন এবং আক্রান্তদের সংখ্যা ক্রমে বাড়ছে। সার্বিক বিষয় নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। কিন্তু কর্তৃপক্ষের মধ্যে দায় এড়িয়ে যাওয়া বা অন্যের ওপর দায় চাপানোর প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। এমনকি বিশ্বের অন্যান্য দেশের চেয়ে বাংলাদেশে ডেঙ্গু আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা কম বলে আত্মতুষ্টি খোঁজার চেষ্টা করা হচ্ছে। এর কোনোটিই কাম্য নয়। পরিস্থিতির আরো অবনতি হওয়ার আগেই সমন্বিত ব্যবস্থা নেয়ার মাধ্যমে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ ও আক্রান্তদের যথাযথ চিকিৎসা নিশ্চিতে জরুরি ভিত্তিতে পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন। এক্ষেত্রে স্থানীয় সরকারকে আরো সক্রিয় হতে হবে।

বর্তমান আবহাওয়া, তাপমাত্রা ও থেমে থেমে বৃষ্টিপাত ডেঙ্গু জ্বরের বাহক এডিস মশার বংশ বিস্তারের জন্য উপযোগী। মশা দমনে দ্রুত ব্যবস্থা না নেয়ায় দিন দিন পরিস্থিতির অবনতি হচ্ছে। বছরের এ সময় প্রায়ই থেমে থেমে বৃষ্টি হয়। যে কারণে বাড়ির আশপাশে, ছাদের টবে ও চৌবাচ্চায় পানি জমে যায়। এসব জমে থাকা পানিতেই জন্মায় ডেঙ্গুর জীবাণু বহনকারী এডিস মশা। ফলে সাধারণত জুন থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এডিস মশার বিস্তার থাকে অনেক বেশি। সময়টাকে ডেঙ্গুর মৌসুমও বলা হয়। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখা মশা জরিপ করে থাকে। তাদের এবারের জরিপেও দেখা গিয়েছে, আগের দুই বছরের তুলনায় ২০২২ সালে মশার পরিমাণ বেশি পাওয়া গিয়েছে। রাজধানীর চলমান মেগা প্রজেক্ট ও বড় আবাসন প্রকল্পগুলোর মশা পরিস্থিতি তাদের পক্ষে দেখা সম্ভব হয়নি বলে খবর প্রকাশ হয়েছে। তার মানে এবারের মৌসুমে ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ে একটি আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে। প্রতি মৌসুমে ডেঙ্গু আতঙ্ক ছড়ালেও এ নিয়ে সরকারের পক্ষ থেকে টেকসই কোনো উদ্যোগ নেয়া হয় না। ডেঙ্গু বেড়ে গেলে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নেয়া হয় ঠিকই, কিন্তু প্রকোপ কমে গেলে বিশেষজ্ঞদের সুপারিশকে আর গুরুত্ব দেয়া হয় না। বিষয়টি হতাশাজনক। এ মুহূর্তে সরকারের স্থাপনা, রাস্তাঘাট, উন্মুক্ত স্থান, নির্মাণাধীন স্থাপনা কোথাও পানি জমার সুযোগ না দিতে জোরালো ভূমিকা রাখতে হবে সিটি করপোরেশনকে। মশক নিধন অভিযানে কোনোভাবে অবহেলার সুযোগ নেই। এডিসের প্রজনন উৎস পাওয়া গেলে ভবন মালিকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে নগরবাসীকে সতর্ক করে সচেতনতামূলক প্রচারণা চালানো। নাগরিকদেরও দায়িত্ব তাদের ব্যক্তিগত পরিসর ও আশপাশে কোথাও পানি জমতে না দেয়া।

অবাক করার বিষয় হলো, গত কয়েক বছর ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব নিয়মিত বেড়ে চললেও, এর জন্য কর্তৃপক্ষের যথেষ্ট প্রস্তুতি নেই। জনস্বাস্থ্যের দায়িত্বে নিয়োজিতরা এ বিষয়ে যথেষ্ট প্রস্তুতি না থাকা এবং দেরি করে ব্যবস্থা নেয়ার দায় থেকে মুক্তি পেতে জনগণের কাঁধে দোষ চাপাচ্ছেন। রাজধানীর দুই সিটি করপোরেশন প্রশাসন বোধ হয় ভুলে গেছে, প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধই উত্তম। আপাতদৃষ্টিতে মনে হয়, সিটি করপোরেশনের যখন ডেঙ্গুবিরোধী ব্যবস্থা নেয়ার দরকার ছিল তখন সেটি নেয়া হয়নি, দেরিতে শুরু হয়েছে। সময়মতো প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেয়ার পরিবর্তে ঢাকঢোল পিটিয়ে এমন সময় ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে যখন লার্ভা পরিপূর্ণভাবে এডিস মশায় পরিণত হয়েছে। ফলে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যাও বেড়েই চলেছে। অবশ্যই প্রতিটি স্বাস্থ্য সংকট সমাধানে জনসাধারণ ও কর্তৃপক্ষের সম্মিলিত চেষ্টা প্রয়োজন। তবে সিটি করপোরেশনের বাসিন্দারা নিজ উদ্যোগে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ করতে পারার সুযোগ কম। শহরের অধিকাংশ বিস্তৃত জায়গায় যেখানে এডিস মশার লার্ভা জন্মায়, সেগুলো পাবলিক স্পেস হওয়ায় সেখানে শুধু সিটি করপোরেশনই ব্যবস্থা নিতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) অন্যতম পরামর্শ হলো এর বাহক নিয়ন্ত্রণ বা সংক্রমণ বন্ধ করা। যেকোনো সুপারিশ বাস্তবায়নে রোগ নিয়ন্ত্রণ সংস্থা এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সমন্বিত পদক্ষেপের দরকার পড়ে। মানুষ মশা তাড়ানো, মশারির ব্যবহারের মতো ব্যক্তিগত সুরক্ষার কথা জানে। কিন্তু জরিপে দেখা গিয়েছে, বাহকের বংশ বৃদ্ধি, বংশ বৃদ্ধির সময় এবং কত দূর পর্যন্ত রোগটি ছড়াতে পারে, তা নিয়ে মানুষের জানাশোনার মধ্যে পার্থক্য রয়েছে।

কলকাতার কোনো এলাকায় ডেঙ্গুর উপস্থিতি পাওয়া গেলে ওই এলাকা লকডাউন করা হয়। আর ওই এলাকার এডিস মশা সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আনা হয়। ফলে ওই মশা অন্য এলাকায় যেতে পারে না। আমাদের এখানে এক এলাকায় ফগার মেশিনে ওষুধ ছিটানো হলে মশাগুলো অন্য এলাকায় চলে যায়। ফলে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে আসে না। এর জন্য আমরা পুরসভাকে কলকাতার মডেল অনুসরণ করতে বলেছি। কারণ কলকাতার আলো, বাতাস, পরিবেশ ও মানুষের সংস্কৃতি প্রায় আমাদের মতোই। ওই মডেল এখানেও কার্যকর হবে। এছাড়া কলকাতার কোনো এলাকায় ডেঙ্গু রোগী পাওয়া গেলে সঙ্গে সঙ্গে র্যাপিড অ্যাকশন চিকিৎসা টিম ওই রোগীকে হাসপাতালে ভর্তি করে দেয়। তিনি কীভাবে আক্রান্ত হলেন তার বিবরণ জেনে ডেঙ্গুর উত্পত্তিস্থল খুঁজে নির্মূল করা হয়। অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্নের মোনাশ বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘ওয়ার্ল্ড মসকিউটো প্রোগ্রাম’ নামে একটি কর্মসূচির মাধ্যমে ২০১৪ সাল থেকে ‘ভালো মশা’ দিয়ে মশা মারার একটি উদ্যোগ শুরু করেছে। ২০১৪ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত অস্ট্রেলিয়ার টাউন্সভিলি শহরে ভালো মশা ছেড়ে দেয়। এ কর্মসূচির সময় দেখা যায়, শহরে বসবাস করা নাগরিকদের মধ্যে যারা ওই সময়ে শহরের বাইরে অন্য কোথাও যাননি তাদের মধ্যে মাত্র চারজনের ডেঙ্গু ধরা পড়ে। কর্মসূচি শুরুর আগে এ সংখ্যাটি ছিল ৫৪। অস্ট্রেলিয়া, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, ব্রাজিল, কলম্বিয়া এবং শ্রীলংকাসহ ১২টি দেশের সরকার মাঠ পর্যায়ে পরীক্ষামূলক এ কর্মসূচি চালাচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, মশার সংখ্যা কমাতে এটি একটি নতুন কার্যকর পদ্ধতি। তবে বাংলাদেশে এ ধরনের পদ্ধতি নেই।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে এ-সংক্রান্ত একটি প্রস্তাব দিয়েছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। যেখানে ছয়টি হাসপাতালকে প্রয়োজনীয় জনবলসহ ডেঙ্গুর চিকিৎসায় ডেডিকেটেড করার কথা বলা হয়েছে। আমরা আশা করছি, এ প্রস্তাবটি দ্রুত অনুমোদন পাবে এবং বাস্তবায়িত হবে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে আমাদের অনুরোধ, এ হাসপাতালগুলোর প্রতিদিনের কার্যক্রম কার্যকর ও ফলপ্রসূ করতে উপযুক্ত পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনা করার। এ পরিকল্পনার বাস্তবায়নে দেরি করা উচিত হবে না। এছাড়া করোনার এ ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্যে ২০১৯ সালের মতো অথবা তার চেয়েও ভয়াবহ ডেঙ্গু পরিস্থিতি এড়াতে বিষয়টিকে হালকাভাবে নেয়া উচিত হবে না। এটা স্পষ্ট, সিটি করপোরেশন এ জায়গাগুলো নিয়মিত পরিষ্কার, স্প্রে কিংবা ফগিং করেনি। আমরা আশা করব ডেঙ্গু আরো বিপজ্জনক হওয়ার আগে সিটি করপোরেশন আরো সক্রিয় হবে। অবশ্যই ডেঙ্গু প্রতিরোধ ব্যবস্থায় মানুষের অংশগ্রহণ প্রয়োজন, এমনকি তাদের নিজের স্বাস্থ্যের কথা বিবেচনায় নিয়েও এটি করতে হবে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ২০২০ সালের মধ্যে বিশ্ব থেকে ডেঙ্গু আক্রান্তের হার কমপক্ষে ২৫ শতাংশ এবং মৃত্যুহার ৫০ শতাংশ কমিয়ে আনার লক্ষ্যে ২০১৭ সালে প্রথমবারের মতো ডেঙ্গুর ভ্যাকসিন মানবদেহে ব্যবহারের জন্য অনুমোদন দেয়। এর বয়সসীমা বেঁধে দেয়া হয় ৯ থেকে ৪৫ বছর। আন্তর্জাতিক ওষুধ উদ্ভাবক ও প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান স্যানোফি পাস্তুর ওই ভ্যাকসিন প্রস্তুত করে। এর নাম দেয়া হয়েছে ডেঙ্গভেক্সিয়া। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অনুমোদনের আগে প্রথমবারের মতো ২০১৫ সালে মেক্সিকোয় এ ভ্যাকসিন বাজারে ছাড়ে প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান। একই বছর ফিলিপাইন ও ব্রাজিলে ভ্যাকসিন চালু করা হয়। বর্তমানে ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, এলসালভাদর, কোস্টারিকা, গুয়াতেমালা, পেরু ও প্যারাগুয়েসহ বিশ্বের ২০টি দেশে এ ভ্যাকসিন চালু আছে। অন্যদিকে সিডিসি আটলান্টার তথ্য অনুসারে চলতি বছরের মে মাসে যুক্তরাষ্ট্রে এ ভ্যাকসিন চালুর অনুমোদন দেয় এফডিএ (ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন)। তবে এক্ষেত্রে বয়সসীমা ঠিক করে দেয়া হয় ৯-১৬ বছর। এদিকে বাংলাদেশ সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইডিসিআর) সিডিসি আটলান্টার এফিলিয়েটেড প্রতিষ্ঠান হওয়ার পরও এ ক্ষেত্রে অগ্রগতি নেই। 

বছরব্যাপী সারা দেশে এখন থেকে এডিস মশা নির্মূলে পরিবেশগত ব্যবস্থাপনা, জৈবিক ব্যবস্থাপনা, রাসায়নিক নিয়ন্ত্রণ এবং যান্ত্রিক পদ্ধতির সমন্বিত ক্রাশ পরিকল্পনা নিতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে ভাইরাস নিয়ে, মশার ডিম ধ্বংসে প্রয়োজনীয় গবেষণা বাড়াতে হবে। তাহলে কোনো ভাইরাসের আক্রমণ শুরু হলে সেটি নিয়ে কাজ করার মতো দক্ষ জনবল তৈরি হবে। জনগণের প্রত্যক্ষ সংযোগ ছাড়া ডেঙ্গু বা বিভিন্ন রোগ ও মহামারী, কোনো কিছুর বিরুদ্ধেই প্রতিরোধ গড়া সম্ভব হবে না। সমন্বিত কার্যক্রম পরিচালনা আবশ্যক। তবে আতঙ্ক নয়, সতর্ক ও সচেতনতাই ডেঙ্গু প্রতিরোধ করতে পারে। আমরা আশা করব ডেঙ্গু আরো বিপজ্জনক হওয়ার আগে সিটি করপোরেশন সক্রিয় হবে। অবশ্যই ডেঙ্গু প্রতিরোধ ব্যবস্থায় মানুষের অংশগ্রহণ প্রয়োজন, এমনকি তাদের নিজের স্বাস্থ্যের কথা বিবেচনায় নিয়েও এটি করতে হবে।