এক. বাংলাদেশ এখন এক কঠিন সময় অতিক্রম করছে। ২০২০ সাল থেকে সংকটের শুরু, তবে ধীরে ধীরে দৃশ্যমান হতে চলেছে করোনা নামক দানবের বিষদাঁত। এ দেশে এ মুহূর্তে করোনা পরিস্থিতি যে ভয়াবহ রূপ নিতে চলেছে, তা বুঝিয়ে বলতে একটি পরিসংখ্যানই আপাতত যথেষ্ট—মৃত্যুর সংখ্যা তির্যক ঊর্ধ্বমুখী এবং ১৩ জুলাই সকাল ৮টা থেকে ১৪ জুলাই সকাল ৮টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় ২১০ জন মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছেন; গত কয়েক দিনে আক্রান্তের হার এক-তৃতীয়াংশের কাছাকাছি, যার মানে দাঁড়ায় পরীক্ষিত ১০০ জনের মধ্যে প্রায় ৩৩ জন করোনা পজিটিভ পাওয়া গেছে। বিজ্ঞজন বলছেন, যত বেশি টেস্ট হবে তত বেশি শনাক্তের সম্ভাবনা। মোট কথা, সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয়া সত্ত্বেও মৃত্যুর মিছিল দীর্ঘতর হচ্ছে। অর্থনীতি প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে, দারিদ্র্য বাড়ছে আর মধ্যবিত্ত জনগোষ্ঠী পড়েছে সবচেয়ে বড় গ্যাঁড়াকলে—সব সঞ্চয় খুইয়ে শুধু ইজ্জত নামের সম্পদটি আঁকড়ে ধরে বসে আছে—না পারছে সইতে, না পারছে কইতে।
বিদ্যমান
‘কড়াকড়ি’ এক লকডাউনের মধ্যেও বাংলাদেশের মানুষ বেহুঁশের মতো ছুটছে এদিক-ওদিক যেন মৃত্যুকে আলিঙ্গন করতে। অনেকে আবার পরছে না মাস্ক, মানছে না বিধিনিষেধ। এই বেপরোয়া গোষ্ঠীকে প্রধানত কয়েক শ্রেণীতে ফেলা যায়। যেমন (ক) অত্যন্ত দরিদ্র, যারা দিনে আনে দিনে খায়। এদের সামনে চয়েস হলো না খেয়ে থাকা নয়তো মৃত্যুর ঝুঁকি নিয়ে কাজের সন্ধানে বের হওয়া। এদের কাছে বর্তমান মুখ্য, ভবিষ্যৎ গৌণ। তাছাড়া চাউর আছে যে রোগটি বড়লোকদের; (খ)
অপেক্ষাকৃত তরুণ ও মধ্যবয়সী ঘরে থাকতে চায় না, তার কারণ করোনার শুরুতে বলা হয়েছিল যে এ রোগ কেবল বয়স্কদের তাড়া করে; (গ)
ক্ষমতাধর ও প্রভাবশালী যারা মনে করেন ক্ষমতার কারণে আইন বা নির্দেশ মানতে তারা বাধ্য নন কিংবা অর্থের বলে বলীয়ান, তাদেরকে করোনা কখনো কাত করতে পারবে না; (ঘ)
অফিস-আদালত কিংবা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারী, যাদের কর্মস্থলে যেতেই হয়, না গেলে চাকরি থাকে না এবং সব শেষে যারা মনে করেন বিধাতা যেকোনো পরিস্থিতেই জীবন রক্ষা করবেন।
যাই
হোক, লকডাউনের মধ্যে জনগণের মধ্যে ‘জোশ মোহাম্মদ’ ভাবসাব দেখে এন্ড্রু কিশোরের গানটা মনে আসে—‘হায়রে মানুষ রঙ্গিন ফানুস দম ফুরাইলে ঠুস/ তবু তো ভাই কারোরই নাই একটুখানি হুঁশ/ হায় রে মানুষ রঙ্গিন ফানুস, রঙ্গিন ফানুস, হায়রে মানুষ।’
কিন্তু
প্রশ্ন ওঠে, এটা কি কেবলই বাংলাদেশের জনগণের বৈশিষ্ট্য?
দুই.
ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ এ. কে. এনামুল হক সম্প্রতি বণিক বার্তায় ‘টিকাকরণে পুরস্কার-তিরস্কার ও আইনের শাসনের অর্থনীতি’ শীর্ষক একটা নিবন্ধ প্রকাশ করেছেন। প্রসঙ্গত বলে রাখা দরকার যে করোনার শুরু থেকে অদ্যাবধি এর আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক প্রভাবের তথ্যভিত্তিক বিশ্লেষণ নিয়ে হাতেগোনা যে কয়জন অর্থনীতিবিদ আমাদের সামনে উপস্থিত হন, তার মধ্যে ড. এনামুল হক অন্যতম। উল্লিখিত তার নিবন্ধে এমন কিছু তথ্য আছে, যা পড়লে এবং ক্ষেত্রবিশেষে হুবহু
উপস্থাপন করলে এ বিপদে কান্নার ভেতরও হাসি চেপে রাখা যায় না। যেমন (ক) আমেরিকার অর্ধেক জনগণ মনে করে না যে করোনা রোগটির অস্তিত্ব আছে। তারা ভাবছে সরকার তাদের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করছে। তারা টিকা নিতে উৎসাহী নয়। অনেক শহরেই তাই টিকা নেয়ার জন্য পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছে। কোনো একটি স্টেট বলেছে যে টিকা নিলে তারা বন্দুক উপহার দেবে। উদ্দেশ্য, যদি তাতে জনগণ অন্তত টিকা দেয়।
(খ) স্বাধীনতাকামী মার্কিনরা টিকা দেয়ার পর ভেবেছিল আর মুখ ঢাকার দরকার নেই। এসব ‘মুসলিম নিয়ম’ আমাদের জন্য বেমানান।
পাঠক
লক্ষ করুন, আমেরিকার মতো উন্নত ও শিক্ষিত দেশের—যে দেশে করোনায় আক্রান্ত ও মৃত্যুর হার সবচেয়ে বেশি—মানুষের মনোভাব যদি এই হয়, তাহলে আমাদের দেশের মানুষের বেপরোয়া আচরণে ব্যথা পাওয়ার কোনো কারণ থাকতে পারে কি?
টিকা
নিয়ে বাংলাদেশের পরিস্থিতি এবং মানুষের আগ্রহ আপাতত সন্তোষজনক, যদিও পৃথিবীর সব দেশেই টিকা নিয়ে সরকার নানা বিপর্যয়ে পড়েছে। এমনকি টিকা নিতে বাধ্য করতে বেশকিছু অস্বাভাবিক ব্যবস্থা করতে হয়েছে, কারণ জনসাধারণের একটি বিরাট অংশ বিশ্বাসই করতে চায় না যে কভিড বলে কিছু আছে। ড. এনামুল বলছেন, (গ)
ইন্দোনেশিয়ার সরকার টিকা নিতে জনগণকে উদ্বুদ্ধ করতে ব্যবস্থা নিয়েছে লটারির। তারা টিকা নেয়ার পর লটারিতে কাউকে দিয়েছে গরু, কাউকে দিয়েছে মুরগি, কাউকে দিয়েছে সাইকেল।
(ঘ) চীন সরকারকে আমরা বলে থাকি তারা সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী। তাদের জনগণ সরকারের কথার বরখেলাপ করার সাহস রাখে না। শেষ পর্যন্ত তারাও আশ্রয় নিয়েছে টিকা গ্রহণকারীদের পুরস্কৃৃত করার। তাদের ১৪০ কোটি জনগণের মধ্যে এ পর্যন্ত মাত্র ২২ কোটি টিকা নিয়েছে। বুঝতেই পারছেন তারা এখনো বেশি লোককে টিকা দিতে পারেনি। অতএব, কী করা যায়? তারাও বলছে জনগণকে টিকা নিতে আর বলছে যদি টিকা নেয়, তবেই তারা পাবে ডিম, খাবার কিংবা টিস্যু পেপার কেনার কুপন। খোদ বেইজিংয়ে টিকা গ্রহণকারীদের ঘটা করে সুনাগরিকের সনদ প্রদান করা হয়েছে। এমনকি তাইওয়ান তাদের জনগণকে টিকা নিতে উৎসাহিত করতে শেষ পর্যন্ত চিকেন ফ্রাইসহ নানা খাবার উপহার দিয়েছে।
তিন.
মাইক্রো ইকোনমিকস ক্লাসে ছাত্রছাত্রীদের পড়াই অর্থনীতির দশ নীতি (Ten Principles
of Economics)। বলা হয়ে থাকে, অর্থনীতিবিদরা অনেক বিষয়েই একমত নন, তবে দশটা বিষয়ে তাদের মধ্যে কোনো দ্বিমত নেই। এর একটা হচ্ছে মানুষ উৎসাহে সাড়া দেয় (People respond
to Incentives)। ভর্তুকি পেলে যেমন উৎপাদক উৎপাদন বাড়ায় (ইতিবাচক উদ্দীপনা), তেমনি
বড় অংকের জরিমানা পেলে (নেতিবাচক উদ্দীপনা) কার্বন নির্গত করতে গিয়ে দুবার ভাবতে হবে। ‘অর্থনীতির একটি নিয়ম হলো পুরস্কার ও শাস্তি। অর্থাৎ মানুষকে তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে কিছু করাতে হলে চাই পুরস্কার ও শাস্তির ব্যবস্থা। সঠিক পুরস্কার ও শাস্তির বিধান থাকলে মানবজাতি অনেক সময়ই তার আচরণ বদলায়। হয়তোবা এজন্যই প্রতিটি ধর্মেও রয়েছে পুরস্কার ও শাস্তির বিধান। নির্বাণ লাভ, পুনর্জন্ম কিংবা বেহেশত প্রাপ্তি যেমন মানুষকে ধর্মীয় চেতনায় উদ্বুদ্ধ করে, তেমনি শাস্তির ভয়ও মানুষকে শান্তির পথে চলতে বাধ্য করে।
আমরা
জেনে আনন্দিত যে আমাদের সরকার এরই মধ্যে উদ্যোগ নিয়েছে দেশের অন্তত ৮০ শতাংশ জনগণকে টিকার আওতায় আনতে। কিন্তু বলা যত সহজ, করা ততটাই কঠিন, অন্তত বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতা তা-ই বলে। ‘গত মার্চ পর্যন্ত চীনে মাত্র সাড়ে সাত কোটি লোক টিকা নিয়েছিল, যা মোট জনগণের মাত্র ৫ শতাংশ। তা দিয়েই তারা দেশের অর্থনীতি ঘুরে দাঁড় করাতে পেরেছিল। তখনো তাইওয়ানে একজনও টিকা নেয়নি। তাদের অর্থনীতি তাতে থামেনি। তাহলে তারা কী মন্ত্র পড়ে দেশের অর্থনীতিকে ঘুরিয়ে দিল? মন্ত্রটি ছোট। সবাই মাস্ক পরেন। এখন পর্যন্ত কভিডের এটাই মূলমন্ত্র। বাকি মন্ত্র জপ কেবল ব্যবসার জন্য। বহুবার বলেছি। মাস্ক ছাড়া আর কোনো মন্ত্র এখনো কার্যকর হয়নি। তবে টিকা দরকার মৃত্যু ঠেকাতে।’
চার.
যারা মাস্ক না পরে প্রকাশ্যে ঘোরাঘুরি করছে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে বটে কিন্তু তা কতটুকু নিবৃত্তিমূলক, এটা ভেবে দেখা দরকার। অর্থাৎ একজন উপার্জনকারী কি মনে করতে পারেন যে তিনি দিনে যত টাকা উপার্জন করবেন বলে মাস্ক না পরেই ঘর থেকে বেরিয়েছেন, তার একটা বড় অংশ কিংবা সবটাই চলে যাবে জরিমানা বাবদ মাস্ক না পরার কারণে? মোট কথা, জেল-জরিমানা যত জোরদার হবে, মাস্ক পরার বা আইন মানার প্রবণতা তত পোক্ত হবে। আর স্বনামধন্য অধ্যাপক যে কথা বলেছেন, তাই-বা ভুলে যাই কী করে—মাস্ক হচ্ছে করোনা মোকাবেলার মোক্ষম মাধ্যম।
অধ্যাপকের
আকুতিটুকু দিয়ে শেষ করি: সংক্রামক রোগের ধর্ম ভুলে গেলে চলবে না। সংস্পর্শে এলেই সংক্রমণ। মৃত্যু অনিবার্য না হলেও ভোগার বিকল্প থাকবে না। কোরবানি আসছে। গরুর মিলনমেলা বসবে। যতই বলুন না কেন, আমরা এবার অনলাইনে কোরবানি দেব কিন্তু আমি হলফ করে বলতে পারি, তা হবে না। কারণ সিংহভাগ জনগণ তা মানবে না। তাই মাস্ক পরিধানের জন্য আমাদের উচিত যুদ্ধ ঘোষণা করা। যাকেই পাবেন মাস্কবিহীন, তাকেই শাস্তির আওতায় আনুন। হাসপাতালে রোগী কিন্তু পাশেই রয়েছেন স্ত্রী কিংবা সন্তান। তার মুখেই নেই মাস্ক! কেউ ভাবতে পারছেন না যে পরের ডাক আমারই হবে।’
চাই
কঠোর ব্যবস্থা, চাই না কঠিন সময়।
আব্দুল বায়েস: জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির খণ্ডকালীন অধ্যাপক










