মনে করুন তিন বন্ধু হাঁটতে বেরিয়েছেন। রাস্তার ধারে এক দোকানে তিনটা চা অর্ডার করলেন। তখন আপনাদের মধ্যে কেউ কি চা বিক্রেতাকে বিশেষ কোনো নির্দেশনা দেবেন? যেমন একজন বলবেন, আমারটা চিনি ছাড়া। আরেকজন লাল (লিকার) চা। আপনি হয়তো দুধ ছাড়া চায়ের মজাটাই পান না! দোকানদার কিন্তু একই সময়ে তিনজনের প্রত্যাশা অনুযায়ী চা পরিবেশন করবেন। কেউ একটু আদা বা লেবু দিতে বললে সেটাও করবেন। এটাই হলো কাস্টমাইজেশন।

কিন্তু পার্ক বা খেলার মাঠে যারা বড় ফ্লাক্সে চা ফেরি করেন, তাদের কাছেও কি এমন সেবা পাবেন? খুব সম্ভবত, না। কেন তারা আপনাদের চাহিদা অনুযায়ী আলাদা বৈশিষ্ট্যের চা সরবরাহ করতে পারেন না? কারণ তারা সবার জন্য একই রকম চা তৈরি করে বিক্রি করতে বের হন। আলাদা কোনো বৈশিষ্ট্য যোগ বা বিয়োগ করার সুযোগ থাকে না। এটা হলো স্ট্যান্ডার্ডাইজেশন।

এমন ব্যবসায়ীরা একই পণ্য সবার কাছে অফার করেন, যার যার সেটা দরকার তারা সেটা ক্রয় করেন। আপনার যে বন্ধু চিনি ছাড়া চা চেয়েছিলেন, তিনি হয়তো এমন ক্ষেত্রে চা পানে বিরত থাকবেন। তবুও সেই চা মুখে তুলবেন না। কারণ ডায়াবেটিক রোগীর তেমন চা খাওয়ার চেয়ে না খাওয়া ঢের ভালো।

আবার ভাবুন দর্জির কাছে গিয়ে জামা-কাপড় বানানোর বিষয়টা। আপনি যদি বয়স্ক বাবার জন্য লুঙ্গিতে ইলাস্টিক লাগিয়ে দিতে বলেন, কোনো সমস্যা নেই কিংবা কোনো গরু ব্যবসায়ী পকেটমারের হাত থেকে অর্থ নিরাপদ রাখতে যদি লুঙ্গির ভেতরের দিকে একটা পকেট বানাতে চান, তাও সে বানিয়ে দেবেন কিন্তু বাংলাদেশের কোনো দোকানে তেমন বৈশিষ্ট্যের লুঙ্গি কিনতে পাওয়া যায় না। এখানে দর্জির কাছে বানানো লুঙ্গি কাস্টমাইজড। আর দোকানে সেলাই করা লুঙ্গি হলো স্ট্যান্ডার্ডাইজড।

বলতে পারেন, স্ট্যান্ডার্ড প্রডাক্টেও তো ভিন্ন সাইজ বা কালার থাকে। কথা সত্য। কিন্তু সেটাও আরেকটা স্ট্যান্ডার্ড। যাদের চাহিদার সঙ্গে সেই বৈশিষ্ট্য ফিট করবে, শুধু তারাই কিনবে। তবে তাতে কিছু সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট। যেমন দর্জি আপনাকে টাখনুর ওপর পরার মতো প্যান্ট বানিয়ে দিতে পারবেন। কিন্তু কোনো রেডিমেড প্যান্ট প্রস্তুতকারী সে রকম প্যান্ট অফার করেন না! আর সে কারণেই স্ট্যান্ডার্ড প্যান্ট কেনার পর আবার দর্জির কাছে গিয়ে ‘কাস্টমাইজড’ করে নিতে হয়।

কিশোর ও তরুণরা নিজের টি-শার্ট ‘অনন্য’ করার লক্ষ্যে দোকান থেকে কেনা গেঞ্জি নিয়ে সরাসরি দর্জির কাছে চলে যান। তারপর কোন জায়গায় কতটুকু চিপা করলে তার শরীরের কোন অংশ প্রদর্শন করা যাবে তা ব্যাখ্যা করেন। দর্জি তখন সে মোতাবেক কাস্টমাইজড করে দেন। আবার হয়তো দুটো টি-শার্ট কিনে একটার কিছু অংশ কেটে আরেকটায় জোড়া লাগিয়ে নতুন কিছু তৈরি করার নির্দেশনা দেন। দর্জি সেই অনুযায়ী কাজ করেন। নারীদের অধিকাংশ পোশাক পুরোপুরি ‘রেডি’ না থাকার কারণও সেটা। যেন নিজেদের পছন্দমতো তারা সেলাই করিয়ে নিতে পারেন। এমনটা করার মাধ্যমে তারা ‘আনকমন’ পোশাক পরার অনুভূতি পান।

এভাবে কাস্টমারের চাহিদা অনুযায়ী বাড়ির ডিজাইন, আসবাব তৈরি, গিফট আইটেম প্রস্তুত, জুতা-স্যান্ডেল বানানো, রিকশায় গন্তব্যে যাওয়া বহুল প্রচলিত কাস্টমাইজড সার্ভিস। এমনকি স্ট্যান্ডার্ড কেকে বিশেষ কালার, ফ্লেভার যু্ক্ত করে ব্যক্তির নাম লিখে তাকে কাস্টমাইজড করা হয়। আজকাল ই-কমার্স সাইটগুলো নানাভাবে ক্রেতার চাহিদা অনুযায়ী পণ্য তৈরি করে সরবরাহ করছে। এভাবে বিস্তৃত কালেকশনের চেয়ে বিশেষ গোষ্ঠীর প্রত্যাশা মেটানোর ব্যাপারে প্রবণতা বাড়ছে।

এখন প্রশ্ন হলো, একজন মার্কেটার হিসেবে এ বিষয়টা কেন বোঝা জরুরি? আপনি যদি ব্যাপক উৎপাদন ও বণ্টনের ক্ষমতা রাখেন, বিপুল পরিমাণ প্রমোশনাল বাজেট থাকে তাহলে স্ট্যান্ডার্ড প্রডাক্ট অফার করেন—আপাতত কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু সীমিত সামর্থ্য নিয়ে তেমন প্রতিযোগিতায় নেমে ভালো করা তো দূরের কথা, টিকে থাকাও মুশকিল হতে পারে।

যেমন একজন নবীন প্রকাশক যদি গল্প, উপন্যাসের মতো জনপ্রিয় ধারার বই প্রকাশে তত্পর হন, হয়তো কখনই তিনি খ্যাতিমান কোনো লেখকের পাণ্ডুলিপি ম্যানেজ করতে পারবেন না। আর সেটা না পারলে তার প্রকাশিত বই সেভাবে বিক্রি হবে না। পুঁজি আটকে দমবন্ধ অবস্থা হবে। দারিদ্র্যের দুষ্টচক্র থেকে হয়তো কখনই বের হতে পারবেন না।

কিন্তু তিনি যদি বিশেষ কোনো ঘরানার বই প্রকাশে বিশেষভাবে মনোযোগী হন, যে ব্যাপারটা তিনি নিজেও ভালো বোঝেন, সেই লাইনের লোকদের সঙ্গে ভালো যোগাযোগ আছে। তারা হয়তো প্রতিষ্ঠিত লেখক নন। কিন্তু ভালো কন্ট্রিবিউট করার সামর্থ্য রাখেন। এমন লোকদের অনুরোধ করে যদি কয়েকটা জুতসই পণ্য প্রকাশ ও প্রমোট করতে পারেন, তার কপাল খুলে যেতে পারে।

কারণ লোকে কবি-গল্পকার-ঔপন্যাসিকদের বই কেনে লেখকের নাম দেখে। আর নন-ফিকশন বা সৃজনশীল বই কেনে ‘কনটেন্ট’ দেখে! তাই বিজনেস, ক্যারিয়ার, যোগ ব্যায়াম এমনকি পুষ্টিসংক্রান্ত বিশেষ সেগমেন্টের বই প্রকাশ করে একসময় তিনি খ্যাতিমান প্রকাশক হলেও হতে পারেন। বড় কথা হলো, আপাতত টিকে থাকা তুলনামূলকভাবে সহজ হবে।

এটা বোঝার জন্য পাড়া-মহল্লায় ভ্রাম্যমাণ সবজি বিক্রেতাদের লক্ষ করুন। তারা অভিজাত এলাকায় বিক্রি করার জন্য বিশেষ কিছু আইটেম নিয়ে বের হন। দিনের প্রথম ভাগে সেগুলো তাদের কাছে চড়া দামে বিক্রি করেন। সন্ধ্যায় অবশিষ্ট সবজিগুলো ফুটপাতে দাঁড়িয়ে পথচারীদের কাছে বিক্রি করে দেন। অর্থাৎ ফ্রেশ সবজি বিক্রি করার মাধ্যমে তার ওইদিনের ব্যবসা হয়ে যায়। অবশিষ্টগুলো বিক্রি করে যা পান তাতেই সন্তুষ্ট। পারতপক্ষে তারা কোনো অবিক্রীত পণ্য নিয়ে ঘরে ফেরেন না!

এভাবে তারা বিক্রয়কৃত পণ্যের জীবনচক্র দিনের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে ফেলেন। লাভ-লোকসান যা-ই হোক, দিন শেষে নগদ মূূলধন হাতে বাড়ি ফেরেন। পরদিন সকালে আবার নতুন করে পরিকল্পনা সাজায়। তেমনিভাবে ফেরি করে ফল বিক্রেতা, হকার কিংবা ট্রেন-বাস স্টেশনে সংবাদপত্র বিক্রেতাদের খেয়াল করুন। কাস্টমাইজেশনের বাস্তব দৃষ্টান্ত দেখা যাবে। প্রতিদিন বা প্রত্যেক সপ্তাহে তারা পণ্যের আইটেম বদলে ফেলেন। যখন কাস্টমার যা প্রত্যাশা করেন, তারা সেগুলো নিয়েই ক্রেতাদের সামনে হাজির হন। ফলে সবজি, ফল বা সংবাদপত্রের মতো (উপযোগ নিঃশেষ হওয়া অর্থে) পচনশীল পণ্যের বিক্রেতা হয়েও তাদের পুঁজি হারান না।

অন্যদিকে অনেক বড় ব্যবসায়ী বিপুল পরিমাণ পণ্যের সংগ্রহ নিয়েও টিকে থাকতে হিমশিম খাচ্ছেন। তারা হয়তো আরো সমৃদ্ধ সংগ্রহের ব্যাপারে মনোযোগী হচ্ছেন। ভাবছেন ব্যবসায়ের ওই পণ্য সমাহার তাদের দীর্ঘমেয়াদে মুনাফা দেবে। কিন্তু সেই পণ্যগুলো ক্রয় বাবদ মূলধন আটকে যাওয়া, ঘর ভাড়া, কর্মচারীদের বেতন, ইউটিলিটি বিল ইত্যাদি পরিশোধ শেষে আর হিসাব মেলাতে পারেন না। তারা বড় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনা করলেও আর্থিক টানাপড়েন যায় না। অনেকটা শরত্চন্দ্রের বিলাসী গল্পে বর্ণিত ‘অতিকায় হস্তী লোপ পাইয়াছে কিন্তু তেলাপোকা টিকিয়া আছে’ অবস্থা!

দুনিয়ার খ্যাতিমান কোম্পানিগুলো কম লাভজনক আইটেম নির্মমভাবে ছেঁটে ফেলে। ক্রেতাদের নিত্যনতুন চাহিদা বিবেচনায় তারা পণ্য উন্নয়ন ও অফার করে। এভাবে স্লিম-ফিট হওয়ার মাধ্যমে তাদের ব্যবসাকে লাভজনক করে। তাই বিশাল কলেবর নিয়ে যারা ধুঁকছেন, তাদের পুরো ব্যবসা ঢেলে সাজানোর ব্যাপারে ভাবা দরকার। জেনারেল থেকে কাস্টমাইজড হওয়ার ব্যাপারে মনোযোগী হওয়া জরুরি। নইলে দীর্ঘমেয়াদে টিকে থাকা সত্যিই কঠিন হবে। কারণ প্রতিযোগিতার মাত্রা ক্রমেই তীব্রতর হচ্ছে।

মানুষের পকেটে পয়সা যে হারে বাড়ছে, অনন্য হওয়ার আকাঙ্ক্ষা তার চেয়েও দ্রুতগতিতে বাড়ছে। নইলে ৬০ লাখ টাকায় কোরবানির গরু কিংবা ৪ লাখ টাকায় লেহেঙ্গা কোনো যৌক্তিক মানুষের কেনার কথা নয়। দেশে যেখানে সাধারণ জিলাপির কেজি ১৫০ টাকা, সেখানে পাঁচতারকা হোটেলে গিয়ে ১ হাজার ৮০০ টাকা দরে ‘জেলাবি’ কেনার লোকের অভাব হয় না! অনেকে সেটা কিনতে না পেরে হাপিত্যেশ করেন। নানা ক্ষেত্রে এমন মার্কেট সাইজ ক্রমেই প্রসারিত হচ্ছে। তাই ইউনিক পণ্য অফার করার মাধ্যমে লাভজনক হওয়ার পথ খুঁজতে হবে।

বাংলাদেশের খ্যাতিমান রেস্টুরেন্টগুলোয় খাবার খরচ বহুক্ষেত্রে ইউরোপ-আমেরিকার চেয়ে বেশি। তার পরও তাদের ব্যবসা ক্রমবর্ধনশীল। এটা ইঙ্গিত করে যে পণ্য অফারে আপনাকে বিশেষভাবে মনোযোগী হতে হবে। আপনার ব্যবসায়ের আকার বড় করার চেয়ে ‘অনন্য’ হওয়া বেশি জরুরি। সেটা সম্ভব হলে হাতে গোনা কিছু কাস্টমারকে সার্ভ করেও আপনার লক্ষ্য অর্জন হতে পারে। তাছাড়া সেটা সম্ভব হলে ক্রেতাদের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক গড়ে উঠবে এবং অভিযোগের মাত্রা হ্রাস পাবে। প্রয়োজনে ক্রেতারা প্রিমিয়াম প্রাইস দেবেন। সর্বোপরি ব্যবস্থাপনা খরচ হ্রাস পাবে। ফলে আকার ছোট হলেও মুনাফা থাকবে সন্তোষজনক।

উপরের উদাহরণগুলো দেখে মনে হতে পারে যে কাস্টমাইজেশন কৌশল বুঝি শুধু ছোট প্রতিষ্ঠানেই কাজ করে। না, বরং আজকাল বহু খ্যাতিমান প্রতিষ্ঠান ধারাটিকে নিজেদের মতো করে গ্রহণ করেছে। নাইকি তার অন্যতম উদাহরণ। তাদের প্রডাক্টে বিশেষ কোনো বৈশিষ্ট্য প্রত্যাশা করে ক্রেতারা যোগাযোগ করলে তারা সেই অনুযায়ী জুতা তৈরি করে দেয়। পৃথিবীর অসংখ্য অ্যাথলিট ও ফুটবলার এ সার্ভিস নিয়ে থাকেন।

তাছাড়া অ্যামাজন ও নেটফ্লিক্সের মতো প্রতিষ্ঠান এখন ‘মাস কাস্টমাইজেশন’-এ বিশেষভাবে মনোযোগী হয়েছে। এতে তারা প্রত্যেক কাস্টমারকে আলাদাভাবে সার্ভ না করলেও নিত্যনতুন প্রডাক্ট লাইন অফার করছে। এর মাধ্যমে তারা বিশেষ গোষ্ঠীর ক্রেতাদের প্রত্যাশাকে ছুঁতে চেষ্টা করছে। এতে সাপ্লাই চেইন সম্পর্কিত বেশকিছু সুবিধা মেলে। পাশাপাশি ক্রেতাদের সঙ্গে সৃষ্টি হয় দীর্ঘমেয়াদি ও আন্তরিক সম্পর্ক।

বিশ্ব পরিস্থিতি যেদিকে যাচ্ছে, তাতে আগামীতে ব্যবসায় টিকে থাকার জন্য ‘ফ্লেক্সিবল’ হওয়া শিখতে হবে। বিপুল সংগ্রহের বোঝা লাভজনক না হলে সেটা ছেঁটে ফেলতে হবে। গণপ্রতিযোগিতা থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করে নিতে হবে। বিপুল পরিমাণ উৎপাদন ও বণ্টনের চেয়ে কিছুসংখ্যক সন্তুষ্ট ক্রেতাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।  

সর্বোপরি কথা হলো, আগামী দিনের ব্যবসায় বিপুল পরিমাণ মূলধন, যন্ত্রপাতি, লোকবলের চেয়েও বেশি দরকার হবে সৃজনশীল ধারণা, আন্তরিক সেবা ও নিত্যনতুন উদ্ভাবনী ক্ষমতা। সেগুলোর যথাযথ প্রয়োগের মাধ্যমেই শুধু গতিশীল এ প্রবণতার সঙ্গে তাল মেলানো সম্ভব। নইলে যেকোনো সময় ছিটকে পড়ার ঝুঁকি রয়ে যায়।

 

ড. মো. আব্দুল হামিদ: শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগের শিক্ষক ও ‘মার্কেটিংয়ের সহজপাঠ’ বইয়ের লেখক