কয়েক দিনের টানা বৃষ্টিতে তলিয়ে গিয়েছে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার সড়ক। কোথাও কোথাও জমেছে হাঁটুসমান পানি। জলাবদ্ধতায় সড়কে সৃষ্টি হয়েছে তীব্র যানজট। এতে ভোগান্তিতে পড়েছে অফিসগামী যাত্রীসহ নানা শ্রেণী-পেশার মানুষ। গোটা ট্রাফিক ব্যবস্থার ওপরও পড়েছে এর বিরূপ প্রভাব। জলাবদ্ধতা অন্যতম বড় সমস্যা হলেও ঢাকার সড়ক অবকাঠামো উন্নয়নে বিষয়টি তেমন গুরুত্ব পাচ্ছে না। সমন্বয়হীনভাবে প্রতিটি সংস্থা নিজের মতো করে প্রকল্প অনুমোদন ও বাস্তবায়ন করছে। সেসব প্রকল্প ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নতি দূরে থাক, প্রাকৃতিক জলাধারগুলো ধ্বংস করছে। ফলে বিপুল অর্থ ব্যয় সত্ত্বেও জলাবদ্ধতা নিরসনে সুফল মিলছে না। বরং এর ভয়াবহতা দিন দিন বাড়ছে। এ সমস্যা নিরসনে প্রাকৃতিক জলাধার পুনরুদ্ধার এবং উন্নত ড্রেনেজ ব্যবস্থা গড়ে তোলার পরামর্শ নগর পরিকল্পনাবিদদের। এটা আমলে নিয়ে নগর কর্তৃপক্ষ ও সেবা সংস্থাগুলোর সক্রিয়তা জরুরি।
দুই দশক আগেও ঢাকার জলাবদ্ধতা পরিস্থিতি অনেক ভালো ছিল। বৃষ্টি-বর্ষণে মুষ্টিমেয় কয়েকটি সড়কের কোনো কোনো স্থানে সামান্য পানি জমলেও দু-এক ঘণ্টার মধ্যে তা সরে যেত। এখন জলাবদ্ধতার সমস্যা ও নাগরিক দুর্ভোগ অসহনীয় পর্যায়ে উপনীত হয়েছে। অল্প বৃষ্টিতে প্রায় সর্বত্রই দীর্ঘক্ষণ পানি আটকে থাকছে। ক্রমাবনতিশীল জলাবদ্ধতার পেছনে কিছু কারণ দায়ী। সময়ান্তরে শহরটি অপরিকল্পিতভাবে কলেবরে বেড়েছে। কিন্তু দ্রুত সম্প্রসারণশীল শহরের সঙ্গে সংগতি রেখে পানি নিকাশের কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তোলা যায়নি। মাত্র ৪০ শতাংশ এলাকা ড্রেনেজ ব্যবস্থার আওতায় আছে। বাকি ৬০ শতাংশ এলাকায় পানি নিকাশ হয় প্রাকৃতিকভাবে। একসময় এ শহরের পানি নিকাশের জন্য অনেক খাল ছিল, ছিল চারপাশে নদী। শহরটি ছিল খাল ও নদীবেষ্টিত। এর ভেতরে ছিল আরো অনেক জলাধার ও নিম্নাঞ্চল। দুঃখজনকভাবে অপরিকল্পিত উন্নয়নে খালগুলোর অধিকাংশেরই অস্তিত্ব এখন বিলীন। যে কয়টির অস্তিত্ব বিদ্যমান সেগুলো অবৈধ দখলের কারণে পরিণত হয়েছে সরু নালায়। কিছু জলাধার ও পুকুর আবার সরকার ভরাট করে কাজে লাগিয়েছে। আর সমতলে গড়ে তোলা হয়েছে কংক্রিটের অবকাঠামো। ফলে ঢাকায় পানি নেমে যাওয়ার সুযোগ পাচ্ছে না। প্রবাহিত হয়ে সড়কে উঠে আসছে। আবার বিভিন্ন সংস্থার সমন্বয়হীনতা এবং ড্রেনেজ ব্যবস্থা সংস্কারে অপরিণামদর্শিতাও সমস্যাটি বাড়িয়ে তুলছে। সব মিলিয়ে রাজধানীতে সৃষ্টি হচ্ছে জলাবদ্ধতা ও যানজট।
অনেক আগে ব্রিটিশ নগর পরিকল্পনাবিদ স্যার প্যাট্রিক গেডিস ঢাকা শহরের জলাবদ্ধতা নিরসনে শহরের ভেতরের এবং আশপাশের নদী, খালসহ প্রাকৃতিক জলাধারগুলোর রক্ষণাবেক্ষণে বিশেষ গুরুত্ব প্রদানের কথা বলেছিলেন। দীর্ঘ সময় পর এখনো অনেক নগর পরিকল্পনাবিদ একই কথা বলছেন। বাস্তবতা হলো, খাল ও নদী উদ্ধার এবং সেগুলো সংস্কার করার তাগিদ বহুদিন ধরে উচ্চারিত হলেও কাজের কাজ কিছু হয়নি। বহু ঘোষণা ও পরিকল্পনার কথা শোনা গিয়েছে। কিছু উদ্যোগ-পদক্ষেপও নিতে দেখা গিয়েছে। কিন্তু কার্যকর সুফল মেলেনি। সমন্বয়হীনতা ও অধিক্রমণের সমস্যা কাটাতে দুই বছর আগে ঢাকা ওয়াসার কাছ থেকে রাজধানীর খাল ও ড্রেনেজ ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব দুই সিটি করপোরেশনের কাছে হস্তান্তর করা হয়। সিটি করপোরেশন এরই মধ্যে কিছু উদ্যোগও নিয়েছে। ঢাকা জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিভিন্ন খালে থাকা অবৈধ স্থাপনার একটি তালিকা করা হয়েছে। অস্তিত্বহীন একটিসহ চারটি খালে অবৈধ স্থাপনা শনাক্ত করে অভিযান চালিয়েছে। দখলদার ও অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে এ ধরনের অভিযান কিছুটা কাজে দিয়েছে। তাই বাকি খাল ও জলাধারগুলোর দায়িত্ব অন্যান্য সংস্থার কাছ থেকে দুই সিটি করপোরেশনের কাছে হস্তান্তর করা দরকার। রাজধানী ও আশপাশের খালগুলো উদ্ধারের পর যথাযথভাবে রক্ষণাবেক্ষণের পাশাপাশি পানি নিষ্কাশনের লক্ষ্যে সঠিক পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হলে তা নগরীর জলাবদ্ধতা নিরসনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এছাড়া রাজধানীর জলাবদ্ধতা নিরসনে যেসব প্রতিষ্ঠানের প্রত্যক্ষ ভূমিকা রয়েছে সেগুলো এক ছাতার নিচে আনা জরুরি। এ উদ্যোগ নেয়া দরকার এখনই।
সন্দেহ নেই, খাল ও নদীগুলো অবৈধ দখলমুক্ত করে সচল করা সম্ভব হলে রাজধানীর পানি নিকাশ ব্যবস্থায় যে পরিবর্তন আসবে, তাতে জলাবদ্ধতা অনেকটা কমে যাবে। পুরোপুরি নয়। পূর্ণ সুফল পেতে গোটা শহরকে সিটি করপোরেশনের ড্রেনেজ সিস্টেমের আওতায় আনতে হবে। বাড়াতে হবে নগর কর্তৃপক্ষের সক্ষমতা। বিদ্যমান ড্রেনগুলো বর্জ্যে ভরাট হয়ে গিয়েছে। বিগত সময়ে ড্রেনেজ সিস্টেমের কোনো উন্নতি হয়নি। ড্রেনেজ নেটওয়ার্কের সংস্কার হয়নি; তা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নও করা হয়নি। বৃষ্টির পানিতে ড্রেনগুলোর তলানিতে কঠিন বর্জ্য শক্ত হয়ে গিয়েছে। এগুলো পরিষ্কার করা দরকার। দ্রুত পানি নিকাশের জন্য যে বক্স কালভার্ট নির্মাণ করা হয়েছে, তাও তেমন কাজে আসছে না। এর বিভিন্ন কারণের মধ্যে একটি হলো, ভুল নকশায় এগুলো নির্মাণ করা হয়েছে। কেন এমন হয়েছে, তা খতিয়ে দেখার দাবি রাখে। বলতে গেলে, দ্রুত পানি নিকাশের জন্য সিটি করপোরেশনকে সম্ভাব্য সব ব্যবস্থা নিতে হবে। এখানে একটা কাঠামোগত ও প্রকৌশলগত গলদও রয়ে গিয়েছে। বেশির ভাগ দেশে ড্রেনেজ ব্যবস্থা রাস্তার এক প্রান্তে হলেও আমাদের দেশে তা রাস্তার মাঝখানে। ফলে মাঝখানে রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি করতে হয়। এতে যান ও মানুষ চলাচলে বাড়তি দুর্ভোগ পোহাতে হয়। আবার ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়নে নেই কোনো দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। কাজটি চলছে অস্থায়ীভাবে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ড্রেনেজ ব্যবস্থাটি এক বছর পার করার উপযোগী করে তৈরি করা হয় এবং তা করা হয় বর্ষার আগে আগে। শুকনো মৌসুমে করা হয় না। কাজেই জলাবদ্ধতা সৃষ্টিতে এ ধরনের পরিকল্পনাহীনতাও বড় ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করছে। জলাবদ্ধতার জন্য আমরা নগরবাসীও কম দায়ী নই। অসচেতনভাবে ময়লা-আবর্জনা, বিশেষ করে পলিথিন ব্যাগ ড্রেনসহ যেখানে সেখানে ফেলে দিই। ড্রেনেজ সিস্টেম অকেজো হয়ে পড়ার এটিও একটা কারণ। এ ব্যাপারে আমাদের সচেতন হতে হবে। যথাস্থানে ময়লা-আবর্জনা ও পলিথিন ব্যাগ ফেলার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে।
দিন দিন যেভাবে জলাবদ্ধতার ভয়াবহতা বাড়ছে তা বেশ দুশ্চিন্তার। এর ফলে শুধু যে তীব্র যানজট সৃষ্টি হচ্ছে তা নয়; বহুমাত্রিক নাগরিক ভোগান্তিও বাড়ছে। তাই এটা সমস্যা সমাধানে স্বল্পমেয়াদি চিন্তা নয়; দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে এগোতে হবে। সিটি করপোরেশনের সক্রিয়তা ও অন্যান্য সেবা সংস্থার কার্যকর সমন্বয়ে দ্রুত এ সমস্যার পরিত্রাণ মিলবে, এটিই প্রত্যাশিত।










