যমুনা নদীর ওপর বঙ্গবন্ধু সেতু চালু হওয়ার ২২ বছর পেরিয়ে গেলেও উত্তরাঞ্চলের মানুষের মাথাপিছু আয় ও সঞ্চয় আগের মতোই রয়ে গেছে। সেতুর কারণে যোগাযোগ সহজ হলেও দেশের পূর্বাংশ থেকে বিনিয়োগ উত্তর জনপদে পৌঁছেনি। ফলে দেশের এই অনগ্রসর অঞ্চলের অর্থনীতিতে গুণগত পরিবর্তন আসেনি। সংশ্লিষ্ট অঞ্চলে দারিদ্র্যের হারও জাতীয় দারিদ্র্য গড়ের চেয়ে বেশি। সেতু উদ্বোধনের পর উত্তরবঙ্গের কৃষিপণ্য ঢাকার বাজারে এনে বিক্রি করা ও ব্যক্তি যাতায়াত সহজ হয়েছে সত্য। বিনিয়োগকারীরা এ সুযোগে বাস-ট্রাকের ব্যবসায় নামলেও উত্তরাঞ্চলের শিল্পে বিনিয়োগে সাড়া মিলছে না। এজন্য গ্যাসের স্বল্পতার কথাই বলছেন উদ্যোক্তারা। গতকাল বণিক বার্তায় প্রকাশিত সংশ্লিষ্ট এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সহসাই উত্তরাঞ্চলে (রংপুর-সৈয়দপুর) গ্যাসের দেখা মিলছে না। কয়েক দফা উদ্যোগ নিয়েও উত্তরাঞ্চলে গ্যাস নিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি। বগুড়া পর্যন্ত গ্যাসের লাইন স্থাপন হলেও রংপুর, সৈয়দপুর পর্যন্ত পাইপলাইন স্থাপন হয়নি এখনো। ভূমি অধিগ্রহণ ও নদী ক্রসিং নিয়ে জটিলতায় পিছিয়ে যাচ্ছে গ্যাস পাইপলাইন স্থাপনের কাজ।

দেশের সবচেয়ে পিছিয়ে থাকা উত্তরাঞ্চলে দারিদ্র্য ও আয়/সম্পদের অসমতা বেশি বলে গবেষণায় দেখা গেছে। কৃষির ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় সেখানে আয় ও সঞ্চয়ের প্রবৃদ্ধি অপেক্ষাকৃত কম। আর আয় বাড়াতে হলে শিল্পায়নের বিকল্প নেই। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে বড় ভূমিকাও রাখছে শিল্পায়ন। এ সবকিছুর পেছনে শক্তি জুগিয়েছে সহজলভ্য প্রাকৃতিক গ্যাস। গত দুই দশকে আমাদের ব্যবসা-বাণিজ্য বড় হয়েছে, বিনিয়োগও বেড়েছে। সেখানে জ্বালানি খাতের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কৃষিতে অভূতপূর্ব উন্নতি করেছে বাংলাদেশ। কৃষির এই উন্নতির পেছনে সারের প্রাপ্যতা বড় ভূমিকা রেখেছে। আর এ সার উৎপাদনের মূল কাঁচামালও ছিল প্রাকৃতিক গ্যাস। বিদ্যুতের নিশ্চয়তা না থাকলে শিল্প গড়ে ওঠে না। বাংলাদেশে শিল্পায়নের প্রথম ধাপে সস্তায় বিদ্যুৎ পেয়েছিলেন উদ্যোক্তারা। এর পেছনেও ভূমিকা ছিল গ্যাসের। সস্তায় গ্যাস পাওয়ার ফলে কারখানায় নিজস্ব বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থা (ক্যাপটিভ) গড়ে তুলতে পেরেছেন ব্যবসায়ীরা। গ্যাসের এ সুবিধা পেয়েছে দেশের মধ্যবর্তী ও পূর্বাঞ্চল। উত্তর ও দক্ষিণাঞ্চলে সূলভ মূল্যে গ্যাস সরবরাহ না করায় সেখানে শিল্পায়ন হয়নি সেভাবে। যে শিল্প-কারখানা বিদ্যমান ছিল, সেগুলোও ঝুঁকির মুখে, অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে।

সংগত কারণেই দেশের অন্য অঞ্চলের তুলনায় পিছিয়ে পড়া অবহেলিত উত্তরাঞ্চলের জন্য পৃথক উন্নয়ন নীতিমালা করা দরকার। শিল্প-কারখানার প্রসারে অন্যতম উপাদান জ্বালানি শক্তির জোগান। এ শক্তি হিসেবে ব্যবহূত প্রাকৃতিক গ্যাসের সরবরাহ যে অঞ্চলে যত আগে নিশ্চিত করা যাবে, সে অঞ্চলে শিল্প-কারখানার বিস্তার তুলনামূলকভাবে তত বেশি হবে। উত্তরাঞ্চলে গ্যাস সরবরাহ না থাকায় শিল্পের প্রসার নেই বললেই চলে। স্থানীয় ব্যবসায়ীরা মনে করেন, গ্যাসের বিকল্প হিসেবে অন্য কোনো জ্বালানি ব্যবহার করে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা সম্ভব নয়। এতে বিশাল অর্থনৈতিক বৈষম্য সৃষ্টি হয়। উত্তরাঞ্চলে গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব হলে ওই অঞ্চলজুড়ে গড়ে উঠবে একের পর এক শিল্প-কারখানা। সংগত কারণেই রাজধানী ঢাকায় শিল্প-কারখানার চাপও কমে আসবে।

কয়লা, প্রাকৃতিক গ্যাস, চীনামাটিসহ বিভিন্ন খনিজ সম্পদে সমৃদ্ধ হলেও এ অঞ্চলের শিল্পায়ন থমকে গেছে। ব্রিটিশ আমলে নীলফামারীর সৈয়দপুরে রেলওয়ের ওয়ার্কশপ ঘিরে ভারী শিল্পের যাত্রা হয় উত্তরবঙ্গে। এ শিল্পকে ঘিরে ওই অঞ্চলে অর্থনৈতিক কর্মপ্রবাহ সৃষ্টি হয়। কিন্তু কাঁচামাল ও নানা সংকটে কারখানা দুটি এখন সংকটাপন্ন। আখ উৎপাদনের প্রাচুর্যের কারণে ব্রিটিশ ও পাকিস্তান আমলে উত্তরবঙ্গে নাটোর, জয়পুরহাট, রংপুর, ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড়, সেতাবগঞ্জ, পাবনায় গড়ে ওঠে চিনিকল। এসব কারখানাকে কেন্দ্র করে একসময় বড় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিকাশ হয়। কিন্তু গত কয়েক দশকে ক্রমাগত লোকসানের মুখে পড়ে এসব কারখানা টিম টিম করে জ্বলছে। এর বাইরে প্রথাগত শিল্পের মধ্যে রংপুরের হারাগাছে তামাক ও শতরঞ্জির মতো কুটির শিল্প উত্তরাঞ্চলের কোথাও কোথাও সীমিত পরিসরে বিকশিত হয়েছে। তাঁত শিল্পও একসময় বড় অবদান রেখেছে উত্তরাঞ্চলের অর্থনীতিতে। আধুনিকায়নের অভাবে আজ তা মৃতপ্রায়। উত্তরাঞ্চলের এসব প্রথাগত শিল্প-কারখানা একসময় অর্থনীতিতে বড় ভূমিকা রাখলেও বর্তমানে সেগুলো পড়তির দিকে। সূলভে গ্যাসের সরবরাহ না মেলা ও আধুনিকায়ন না হওয়ায় লোকসানের মুখে পড়ছে সেগুলো। উৎপাদিত পণ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কৃষিপণ্যভিত্তিক নানা ধরনের শিল্প-কারখানা গড়ে তোলার বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে উত্তরবঙ্গে। এর মাধ্যমে বদলে যেতে পারে সেখানকার মানুষের জীবনমান। নীলফামারীতে উত্তরা ইপিজেড গড়ে তোলায় সেখানকার প্রায় এক লাখ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা সম্ভব হয়েছে। রংপুর, সৈয়দপুরসহ অন্যান্য এলাকায় এমন ইপিজেড গড়ে তোলা গেলে বিপুল কর্মসংস্থান তৈরি হবে। এটি ওই অঞ্চলে সম্পদের প্রবাহ নিশ্চিত করবে, যা বৈষম্য ও দারিদ্র্যের হার কমাতে সহায়ক ভূমিকা রাখবে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, উত্তরাঞ্চলে অর্থনৈতিক গতিশীলতা বাড়াতে হলে এ রকম বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল আরো গড়ে তুলতে হবে। অর্থনীতির বহুমুখীকরণ ছাড়া উত্তরবঙ্গে দারিদ্র্য হটানো সম্ভব নয়। প্রচুর শস্য ও ফসল উৎপাদন হয়। আলু, টমেটোর মৌসুমে এত উৎপাদন হয় যে সেগুলোর দাম পান না কৃষকরা। অনেক সময় রাস্তায় ফেলে দিতে হয়। কিন্তু প্রক্রিয়াকরণের শিল্প-কারখানা থাকলে তাতে লাভবান হতেন কৃষকরা। উত্তরবঙ্গে শিল্পায়নের জন্য রাষ্ট্রকে এগিয়ে আসতে হবে। শিল্পায়নের জন্য নিরবচ্ছিন্ন ও সহজলভ্য জ্বালানির নিশ্চয়তা দিতে হবে। আর এ কারণে পাইপের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট অঞ্চলে দ্রুত গ্যাস নিয়ে যেতে হবে।