মানুষের জীবনধারা অদ্ভুত। আর তার চেয়ে বেশি অদ্ভুত মানুষের মন। মানুষের অবচেতনায় জমে থাকা অতীত স্মৃতি অজানা নদী খাতের স্রোতের মতো ঝিরঝির করে বয়ে চলে। অনেকটা শুশ্রূষার জল ঝর্ণার ধ্বনির মতো। মহাবিশ্বে আমাদের অবস্থান নগণ্য। তেমনি নগণ্য কোনো জাতির ইতিহাসে ৫০ বছর। আজ থেকে ৫০ বছর আগে আমি ছিলাম দশম শ্রেণীর ছাত্র। সে সময়টিতে আমি থাকতাম ঢাকার গ্রিন রোডে। আমার খালুর বাসায়। খালু হলেন প্রয়াত কবি ও কথাসাহিত্যিক আবদুল হাই মাশরেকী। আজ আমি ৫০ বছর পেছনে ফিরে তাকাব। কারণ সে সময়ের একটি মধুর স্মৃতি আমার মনের মধ্যে কোমল ও সুগন্ধি হয়ে হানা দেয়। সে অতীত আমার মনে এক আশ্চর্য মোহ তৈরি করে রেখেছে। সে উজ্জ্বল মধুর আনন্দের স্মৃতি বলার জন্যই এ কাহিনীর অবতারণা।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন, ইতিহাসেরও একটি পূর্ব ইতিহাস থাকে। আর সে ইতিহাস হলো সন্ধেবেলায় প্রদীপ জ্বালানোর আগে সারা দিনের সলতে পাকানোর ইতিহাস। বাঙালি জাতীয়তাবাদের ভিত্তি ছিল বাংলা ভাষা। ভাষা আন্দোলন থেকেই শুরু হয় দিনবদলের পালা। অবাঙালি পাকিস্তানিদের শোষণমুক্তি ও শাসনমুক্তির জন্য যেটা করতে হলো, তার অন্য নাম মুক্তিযুদ্ধ। ৭ মার্চ তার সূচনা হয়। ২৬ মার্চ তার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা। আর এক নদী রক্ত পেরিয়ে ১৬ ডিসেম্বর তার সমাপ্তি। এসব আন্দোলন ও সংগ্রামের পেছনে সলতে পাকিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু। সে সলতে প্রথম প্রজ্জ্বলিত হলো ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে।
ইতিহাসে এমন ঘটনাও ঘটে, যার অভিঘাতে পুরো দেশ কেঁপে ওঠে। ৭ মার্চের জাতির পিতার বক্তৃতা ছিল তেমনি মহাকাব্যিক একটি ঘটনা। আমি অবাক হয়ে দেখলাম শান্ত ও সুন্দর শহর ঢাকায় নেমে এসেছে জনসমুদ্রের জোয়ার। বাঙালি জাতি যেন সব হারানোর মন্ত্রে দীক্ষিত হয়েছে। মার্চের প্রথম দিন থেকে বাংলার সুনীল আকাশে এক টুকরো কালো মেঘের আনাগোনা শুরু হয়। কিন্তু সেই কঠিন বিশ্রী গুমোট কেটে গেল। একদিন সন্ধ্যার দিকে আমার খালু ঘরে ফিরে এসে সবাইকে বললেন, ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধু ভাষণ দেবেন। বললেন, শিগগিরই স্বৈরাচারী সরকারের অবসান ঘটবে। তিনি প্রতিশ্রুতি দিলেন আমাকেও জনসভায় নিয়ে যাবেন। আমি মুক্তির নিঃশ্বাস ফেললাম। খালুর কথা শুনে আমার মধ্যে ফিরে এল ছাত্রজীবনের উল্লাস। সে সময়টিতে আমার মন ছিল অদ্ভুত রকমের তাজা, সবল ও আনন্দময়। তবে সে সময় ঢাকা শহরের রূপ ছিল ভিন্নতর। ঢাকা তখন সবে গড়ে উঠছে। শহরে অনেক ফাঁকা মাঠ ছিল। আর শুক্লপক্ষে ঢাকার আকাশ ভরে আলোর বান ডাকত। মাঠে হু-হু হাওয়া বইত। ‘ইটের পরে ইট মানুষ মাঝে কীট’—এমন অভিযোগ ছিল না। যাহোক, এসব কথার পটপরিবর্তন করে ফিরে যাই ৫০ বছর আগের স্মৃতিতে। খালুর হাত ধরে আমরা কয়েকজন উৎসাহী যুবক চলেছি প্রতিশ্রুত গন্তব্যে। সুন্দর রাজপথ। চারদিক সাহসী জনতার কলরবে মুখর। একটার আগেই আমরা পৌঁছে গেলাম ময়দানে। মনে পড়ে, ময়দানের মাঝে সবুজ ঘাসে আমরা বসে পড়লাম। বিকালের সোনালি রোদে মাঠের সবুজ বৃক্ষ জ্বলছে। আজ এ মাঠে ছুটে এসেছে আশাবাদী রাজনীতিবদ, সাহসী ছাত্র- যুবক, কারখানার শোষিত শ্রমিক, নিরন্ন কৃষকসহ সব পেশা-শ্রেণীর মানুষ। আমরা ব্যাকুলভাবে অপেক্ষা করছি। ‘কখন আসবে কবি।’ বাংলাদেশের মায়ায় জড়ানো প্রধান কবি নির্মলেন্দু গুণ সে সময়ের ছবিটি একটি অসাধারণ চিত্রকল্পে ফুটিয়ে তুলেছেন।
‘শত বছরের শত সংগ্রাম শেষে’
রবীন্দ্রনাথের মতো দৃপ্ত পায়ে হেঁটে
অতঃপর কবি এসে জনতার মঞ্চে দাঁড়ালেন।’
বঙ্গবন্ধু তার প্রিয় পোশাক সাদা পায়জামা-পাঞ্জাবি ও কালো রঙের মুজিব কোট পরে মঞ্চে প্রবেশ করলেন। যেন তিনি এক দিগ্বিজয়ী রাজা। এক অপরূপ রূপবান পুরুষ। মনে হলো সর্বত্যাগী এই পুরুষ বাংলাদেশের সব বৃক্ষের ওপর দিয়ে মাথা উঁচু করে আজ ময়দানে আসীন হয়েছেন। রাজনীতির কবিকে দেখে উল্লসিত জনতা আবেগ ও উত্তেজনায় ফেটে পড়ল। চারদিক থেকে ভেসে আসছে আকাশ কাঁপানো স্লোগানের আওয়াজ। ‘জয় বাংলা’, ‘তোমার আমার ঠিকানা, পদ্মা, মেঘনা, যমুনা’, ‘আপস না সংগ্রাম, সংগ্রাম, সংগ্রাম’, ‘ঢাকা না পিন্ডি, ঢাকা ঢাকা’, ‘পাঞ্জাব না বাংলা, বাংলা, বাংলা’, ‘তোমার দেশ আমার দেশ বাংলাদেশ বাংলাদেশ’।
এ রকমের জনসমুদ্র আমি জীবনে আর কখনো দেখিনি। মওলানা আবদুর রশীদ তর্কবাগীশ আন্দোলনে নিহত শহীদদের ওপর মোনাজাত পাঠ করলেন। বঙ্গবন্ধুকে আজ রাশভারী ও গম্ভীর মনে হচ্ছে। তিনি তার বক্তৃতা দেয়ার জন্য উঠে দাঁড়ালেন, সঙ্গে সঙ্গে উদ্যানজুডে নেমে এল এক আশ্চর্য নীরবতা। লাখ লাখ উদ্বেলিত মানুষ পিনপতন নীরবতার মাঝে তার বক্তৃতা শুনছে। জনতার মাঝে আজ বিপুল প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। অপমানিত বাঙালি জাতিকে তিনি নতুন নির্দেশনা দেবেন। আত্মত্যাগের নতুন অগ্নিদীক্ষায় দীক্ষিত করবেন। সভার নীরবতা মাঝেমধ্যে আকাশভাঙা স্লোগানে ভেঙে পড়ছে। এ রকমের প্রাণদায়িনী বক্তৃতা আমি আর কখনো শুনিনি। আজন্ম বাংলাদেশের লীলাময় প্রকৃতিতে আমি কালবৈশাখীর রুদ্র মূর্তি দেখেছি। সেদিন রেসকোর্সের ময়দানে বঙ্গবন্ধু অন্যায় ও শোষণের বিরুদ্ধে কী রুদ্রতেজে জ্বলে ওঠেন, তা নিজ চোখে না দেখলে তার কিছুই অনুভব করা যায় না। সেদিন বঙ্গবন্ধুর ভীম-ভৈরব রূপ দেখে আমি মুগ্ধ ও অভিভূত হয়েছিলাম। তার কণ্ঠস্বরে ছিল মহাসমুদ্রের গর্জন। কিন্তু সে ভাষণ ছিল যেমন শ্রুতিসুখকর তেমনি মনোবিমোহন। তার কথা যেন সুরস্রাবী ইন্দ্রধনু। রেসকোর্সের ময়দানে সে সময় অদ্ভুত সৌন্দর্য ফুটে ওঠে। বিকালের মাঠে সে এক অপূর্ব দৃশ্য। তার কণ্ঠস্বরে রুদ্র ভৈরবের রূপ। তিনি বললেন, ‘২৩ বছরের করুণ ইতিহাস বাংলার অত্যাচারের, বাংলার মানুষের রক্তের ইতিহাস। ২৩ বৎসরের ইতিহাস মুমূর্ষ নরনারীর আর্তনাদের ইতিহাস। বাংলার ইতিহাস এ দেশের মানুষের রক্ত দিয়ে রাজপথ রঞ্জিত করার ইতিহাস।’ স্বাধীনতাই যে বাংলাদেশের কাঙ্ক্ষিত, সেটা ৭ মার্চের জনসভায় বঙ্গবন্ধু জানিয়ে দেন। তিনি বললেন, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। জয় বাংলা।’ এ ঘোষণার মূল্যায়ন করে ঐতিহাসিকরা বলেন, ৭ মার্চ ১৯৭১ সালে রেসকোর্স ময়দানের বক্তৃতা ছিল ‘স্বাধীনতা ঘোষণার নামান্তর’। সে ঐতিহাসিক ভাষণ আজ সর্বদেশের সর্বকালের শ্রেষ্ঠ বক্তৃতার একটি। উল্লেখ্য, ব্রিটিশ ভারতের জনগণের মুক্তির পথ দেখিয়েছিলেন মহাত্মা গান্ধী। নবীন প্রজন্মের জওহরলাল নেহরু তাকে কীভাবে দেখেছিলেন তার পরিচয় আমরা পাই দ্য ডিসকভারি অব ইন্ডিয়া বইটিতে। তিনি বলেন, ‘টাটকা হাওয়ার একটা প্রবল প্রবাহের মতো ছিলেন তিনি। আমাদের জাগিয়ে দিলেন, গভীর নিঃশ্বাস নিলাম আমরা। তিনি ছিলেন আলোর ঝলকের মতো, যা অন্ধকার ভেদ করে আমাদের চোখের সামনের পর্দাগুলো খুলে দিল। ঝড়ের মতো এলেন তিনি, তাতে কত কি যে উড়ে গেল—সবচেয়ে উড়ে গেল মানুষের চিন্তাধারার পুরনো পদ্ধতি।’ ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুও এভাবে বাংলাদেশের কোটি মানুষের হূদয় থেকে বেরিয়ে এলেন। রেসকোর্সের ময়দানে ছড়িয়ে দেন কালবৈশাখীর ঝড়। উড্ডীন করলেন স্বাধীনতার নতুন কেতন।
মাঝে মাঝে এখন আমার পেছন ফিরে তাকাতে ভালো লাগে। ৭ মার্চের জনসভার আমি একজন শরিক ও সাক্ষী। ভাবতে ভালো লাগে যে বাঙালির ইতিহাসের মুক্তি ও আনন্দের একটি ঐতিহাসিক মহালগ্নে আমি উপস্থিত ছিলাম। সেদিনের সেই স্বর্গীয় রূপলোকের স্মৃতি এখনো জেগে আছে আমার মননে ও হূদয়ে।
মাসুদ সিদ্দিকী: সাবেক সচিব ও বিএটি বাংলাদেশের স্বতন্ত্র পরিচালক










