মূল্যস্ফীতির বেপরোয়া মনোভাব ফিরে এসেছে। যুক্তরাষ্ট্রে মূল্যস্ফীতির হার ২০২০ সালে ১ দশমিক ২ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০২১ সালে ৪ দশমিক ৭ শতাংশ হয়েছে, ২০২২ সালে এটি ৮ দশমিক ১ শতাংশে পৌঁছেছে। ২০২৩ সালের পূর্বাভাসে ৩ দশমিক ৫ শতংশের কথা বলা হচ্ছে, কিন্তু সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান এটি প্রত্যাখ্যান করছে। ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারির তথ্য অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্রের মূল্যস্ফীতির হার ৬ শতাংশ ছিল। কিন্তু প্রকৃত মূল্যস্ফীতি (পরিবর্তনশীল জ্বালানি ও খাদ্যমূল্য ব্যতীত) শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ বেড়ে ৫ দশমিক ৫ শতাংশে উপনীত হয়েছে।
ইউরো জোনেও মূল্যস্ফীতি একই চিত্র প্রদর্শন করছে। সেখানে বার্ষিক হার ২০২০ সাল থেকে শূন্য দশমিক ৩ শতাংশ থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ২০২১ সালে ২ দশমিক ৬ শতাংশ হয়, ২০২২ সালে এটি ৮ দশমিক ৪ শতাংশ হয়েছে। যখন মূল্যস্ফীতি ২০২৩ সালে ৫ দশমিক ৬ শতাংশেও উপনীত না হওয়ার প্রত্যাশা করা হয়েছিল। তখন যুক্তরাষ্ট্রের মতোই সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী এক্ষেত্রে হতাশাজনক চিত্র ফুটে উঠেছে। ফেব্রুয়ারিতে বার্ষিক মূল্যস্ফীতি সামান্য হ্রাস পেয়েছে। জানুয়ারির ৮ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে এটি ৮ দশমিক ৫ শতাংশে পৌঁছায়। যখন প্রকৃত মূল্যস্ফীতি জানুয়ারির ৫ দশমিক ৩ শতাংশ থেকে ৫ দশমিক ৬ শতাংশে বৃদ্ধি পায়।
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে আবদ্ধ থাকার চেয়ে উচ্চমূল্যস্ফীতি বৈশ্বিক অনুষঙ্গে পরিণত হয়েছে। তুরস্ক ও আর্জেন্টিনায় ৭০ শতাংশের ওপর মূল্যস্ফীতি দেখা দিয়েছে। মূলত বৃহৎ অর্থনীতির দেশগুলোর মধ্যে শুধু চীন ও জাপান মূল্যের স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে পেরেছে। এটি এমন এক প্যাটার্ন, যা নতুন করে পুরনো প্রশ্নগুলোর জন্ম দিয়েছে। ‘কী কারণে মূল্যস্ফীতি ঘটে এবং এটি প্রতিরোধের ক্ষেত্রে দেশের নীতিনির্ধারকদের কী করা উচিত?’
সামষ্টিক অর্থনীতির ক্রমপ্রবাহ
মূল্যস্ফীতির ক্ষেত্রে মূল্যের উপাদানের দিকে নজর দেয়া হয়। এক্ষেত্রে জ্বালানি মূল্যের বিষয়টি উঠে আসে, কয়েকজন পর্যবেক্ষক বর্তমান মূল্যবৃদ্ধিকে ‘পুতিনের মূল্যস্ফীতি’ হিসেবে গণ্য করেছেন। কেননা ইউক্রেনে রাশিয়ার আক্রমণ বাণিজ্যিক সংস্থা এবং গৃহস্থালির জ্বালানি খরচ গত বছর বাড়িয়ে তোলে। এ বর্ণনা আশা জাগায় ২০২৩ সালে মূল্যস্ফীতি অনেক কমে যাবে। এক্ষেত্রে চলতি বছর জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধি না পাওয়ার প্রত্যাশা করা হচ্ছে, এমনকি হ্রাস না পাওয়ার বিষয়টিও বলা হয়েছে। এ অনুসারে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে কয়েকজন বিশ্লেষক ঝুঁকির লক্ষ্য অতিক্রম করার ক্ষেত্রে ইউএস ফেডারেল রিজার্ভ ও ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংককে মুদ্রানীতি আঁটসাঁট করার বিষয়ে সতর্ক করেছেন।
এসব সতর্কতা আসলে অপরিপক্ব, যদি হিতে বিপরীত না হয়। বস্তুত দ্বিতীয় দফা প্রভাবের কারণে মূল্যস্ফীতি বজায় থাকার প্রবণতা কাজ করে। এ সময় শুধু উৎপাদক পর্যায়ে অধিক মূল্যবৃদ্ধি পেয়েছে এমন নয়, কিন্তু মূল্যের শৃঙ্খলের মধ্য দিয়ে পুরোপুরি অতিবাহিতও হয়নি। সর্বোপরি নামমাত্র মজুরি এরই মধ্যে বৃদ্ধি পেয়েছে এবং এ বছর আরো বৃদ্ধি পাবে। উদাহরণ হিসেবে ইউরোপিয়ান সেন্ট্রাল ব্যাংকের (ইসিবি) তথ্যানুসারে ইউরো জোনে ট্রেড ইউনিয়ন ও নিয়োগকর্তা সংস্থাগুলোর সম্মতিতে এরই মধ্যে ৫ শতাংশ মজুরি বাড়ানো হয়েছে। এক্ষেত্রে সংস্থাগুলো এ খরচ তাদের ক্রেতাদের ওপর চাপানোর চেষ্টা করবে। ফলে প্রকৃত মূল্যস্ফীতি পেশাজীবীদের বর্তমান পরামর্শের তুলনায় সম্ভবত বেশি থাকবে।
গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, মূল্যের উপাদানের প্রাসঙ্গিক শক্তির প্রতি মনোযোগ (জ্বালানির মূল্যের মতো) সামষ্টিক অর্থনীতির ওপর ব্যষ্টিক অর্থনীতির ভিত্তিকে বাড়িয়ে তুলেছে। মূল্যস্ফীতি সবসময় যা ছিল, এখনো তাই আছে, সামষ্টিক অর্থনীতি বরং চাহিদা ও সরবরাহের ভারসাম্যহীনতার ফলাফল থেকে উঠে আসছে এবং সেই সঙ্গে এটি মুদ্রা ও রাজস্ব নীতি দিয়ে প্রভাবিত হয়েছে।
এ সন্ধিক্ষণ চিত্রিত করার ক্ষেত্রে আমরা স্মরণ করতে পারি ২০২১ সালে যে অবস্থানে ছিলাম। যুক্তরাষ্ট্রে এরই মধ্যে মূল্যস্ফীতির হার ৪ দশমিক ৭ শতাংশই সর্বোচ্চ ছিল। ইউরো জোনে এটি বছরের দ্বিতীয়ার্ধে ত্বরান্বিত হতে শুরু করে। রাশিয়া ইউক্রেনে হামলা শুরুর আগেই ইউরো জোনে জ্বালানির মূল্য যথেষ্ট পরিমাণে বৃদ্ধি পেতে শুরু করে এবং মূল্যস্ফীতিতে দারুণভাবে প্রভাব ফেলে। আক্রমণের পর যুদ্ধের মূল্যের প্রভাবে যুক্তরাষ্ট্রের বাজার বিশেষভাবে আক্রান্ত হয়নি, কিন্তু মূল্যস্ফীতি ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছিল।
কীভাবে মূল্যস্ফীতির বিষয়টি সামনে এল? ২০২০-২১ সালে রাজস্ব ও মুদ্রানীতি সম্প্রসারিত হয়, যেভাবে নীতিনির্ধারকরা মহামারীর অর্থনৈতিক প্রভাব সীমাবদ্ধ করা ও অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করার রাশ টেনে ধরেছিলেন। এটি বৈশ্বিকভাবে ঘটলেও বিশেষ করে এটি যুক্তরাষ্ট্রে ঘোষিত হয়েছে, যেখানে ট্রাম্প ও বাইডেন প্রশাসনের মাধ্যমে রাজস্ব প্রণোদনা দেয়া হয়, এটি জিডিপিতে মহামারীর ধাক্কা থেকে বৃহৎ আকারের ছিল।
যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি এককভাবে আন্তর্জাতিক বাজারমূল্য প্রভাবিত করতে সক্ষম, দেশটি শুধু ইউরোপিয়ান মনিটারি ইউনিয়নের (ইএমইউ) অন্তর্ভুক্ত সর্বাপেক্ষা ক্ষুদ্র অর্থনীতির দেশগুলোয় নয়, অন্য দেশগুলোতেও মূল্যস্ফীতির ধাপ উগড়ে দিতে পারে।
মূল্যস্ফীতি বনাম মূল্যস্ফীতি
২০০৮ সালের অর্থনৈতিক সংকটের পর, দ্বিতীয় রানী এলিজাবেথ জিজ্ঞাসা করেছিলেন কেন কেউ দেখেনি যে এটি আসছে। কেউ একজন তো নতুন মূল্যস্ফীতি নিয়ে একই বিষয় জিজ্ঞাসা করতে পারতেন। যুক্তরাষ্ট্রে মুদ্রানীতিপ্রণেতা এবং অনেক বিশ্লেষক যুক্তি দেখিয়েছিলেন যে ২০২১ সালের মূল্যস্ফীতি শুধু সাময়িক ছিল। মতবিনিময়ের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক রাজস্ব সচিব লরেন্স সামারস এবং নিউইয়র্ক টাইমসের পল ক্রুজম্যান এ প্রসঙ্গে বারবার বলেছেন। ইউরোপে এ বিতর্কে শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তি ছিলেন ইসিবির প্রধান অর্থনীতিবিদ ফিলিপ লেন, যিনি ২০২২ সালেও মূল্যস্ফীতিকে সাময়িক ঘটনাপ্রবাহ হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন।
কিন্তু অনেকেই এ ব্যাখ্যার বিরুদ্ধে কথা বলেছেন, বিশেষ করে সামারস যিনি ২০২১ সালের বসন্তে রাষ্ট্রপতি জো বাইডেনের রাজস্ব প্রণোদনাকে অতিদীর্ঘ বলে বর্ণনা করেছেন। এ পরিস্থিতি তাকে ১৯৬০ সালের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছিল, যখন নীতিনির্ধারকরা সম্প্রসারিত রাজস্ব নীতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে আগ্রহের জায়গা থেকে অর্থনৈতিক সক্ষমতার ক্ষেত্রে সংক্ষুব্ধ চাহিদা ও সামাজিক উদ্বেগের পরিপ্রেক্ষিতে অতিমাত্রায় ধারণা করেছেন। ১৯৬৬ থেকে ১৯৬৯ সালের মধ্যে তেলের মূল্যে প্রথম ধাক্কার আগেই মূল্যস্ফীতি ২ শতাংশ থেকে ৬ শতাংশে উপনীত হয়েছিল। এখন সে সমান্তরাল অবস্থান আবারো হওয়া উচিত। বর্তমানের মূল্যস্ফীতি এরই মধ্যে রাশিয়ার আগ্রাসনের ফলে পশ্চিমা অনুমোদনের ভিত্তিতে সরবরাহ ধাক্কার পূর্বেই আবির্ভূত হয়েছে।
একইভাবে ২০২০ সালের ডিসেম্বরের বিখ্যাত ক্রিসমাস লেকচারে মিউনিখ বিশ্ববিদ্যালয়ের হান্স-ওয়ারনার সিন সতর্ক করে বলেছিলেন যে ইউরোজোনের অত্যন্ত সম্প্রসারণমূলক রাজস্ব এবং মুদ্রানীতির মিশ্রণ উচ্চতর মূল্যস্ফীতির ভবিষ্যৎকে পরিচালিত করবে।
সিনের দৃষ্টিভঙ্গি অনুসারে মুদ্রাপন্থীরা কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। তিনি জোর দিয়ে বলেছেন যে ইউরোজোনের মুদ্রার ভিত্তি সাম্প্রতিক বছরগুলোয় অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০১৪ সালের মার্চে ১ দশমিক ২ ট্রিলিয়ন পাউন্ড থেকে ২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে ৬ ট্রিলিয়ন পাউন্ড বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে তিনি ইএমইউর সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সরকারি ঋণ বৃদ্ধির বিষয়টিও তুলে ধরেন। ১৯৯৮ সালে জিডিপি ৭৩ শতাংশ থেকে ২০২০ সালে ৯৭ শতাংশ বেড়েছে, তার মধ্যে ২০০৭ সালে সর্বনিম্ন সংখ্যা (৬৬ শতাংশ) রেকর্ড করা হয়েছিল।
সিন তার বক্তব্যে ট্রান্সমিশন প্রক্রিয়া সঠিকভাবে বর্ণনা করেছেন। ইএমইউর সদস্য রাষ্ট্রগুলোর অর্থনীতি কভিডের ধাক্কায় আক্রান্ত হওয়ার ফলে সরবরাহ ও চাহিদা কমে যায়। ইসিবি ও সদস্য রাষ্ট্রের সরকারগুলো তখন সম্প্রসারণমূলক মুদ্রানীতি এবং রাজস্ব নীতির মাধ্যমে প্রতিক্রিয়া জানায়, সেটিই সামগ্রিক চাহিদাকে ঊর্ধ্বে রেখেছে। কিন্তু শ্রমবাজারের ঘাটতি, মূল্য শৃঙ্খলার ভঙ্গুরতা এবং অন্যান্য উৎপাদনগত সমস্যার জন্য সামগ্রিক সরবরাহ চাপের মধ্যে ছিল। খুব অল্পসংখ্যক পণ্যের জন্য অতিমাত্রায় অর্থ দেয়া হচ্ছিল, যার জন্য মূল্য ক্রমাগত বৃদ্ধি পেয়েছে।
দেখা যাচ্ছে, ২০২০ সালে সিন দূরদর্শী ছিলেন। কেন যে কেউ তার কথা শোনেনি? সিন তার বইয়ের মুখবন্ধে উল্লেখ করেছেন যে তার ক্রিসমাস লেকচার ২০২০ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২১ সালের গ্রীষ্মকালীন সময়ের মধ্যে অনলাইনে ১ দশমিক ৬ মিলিয়ন ভিউ পেয়েছে। কিন্তু যদি তার যুক্তি শোনা হতো তার পরও সেটা ধোপে টিকত না। কারণ আধুনিক সামষ্টিক অর্থনীতিবিদরা বিশ্বাস করেন যে মুদ্রাবাদী চিন্তাধারা সেকেলে। প্রকৃতপক্ষে, সিন বছরের পর বছর ধরে সতর্ক করে আসছিলেন যে ইসিবির মুদ্রানীতি উচ্চমূল্যস্ফীতি সৃষ্টি করবে, তবে ইউরোজোনের মূল্যস্ফীতি ২০১৫ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত কমই ছিল।
রাজস্ব ফ্যাক্টর
রাজস্ব নীতি ও মুদ্রানীতির মধ্যে পার্থক্য নির্ণয় করা উচিত। অপ্রচলিত মুদ্রানীতির পূর্ববর্তী সময়ে যখন ইসিবি মূলত পাবলিক সেক্টর পারচেজ প্রোগ্রামের (পিএসপিপি) মাধ্যমে সম্পদ ক্রয় করত তখনো তারল্যের ইনজেকশনটি মূলত ইউরোপীয় ব্যাংক খাতের কাছে ছিল, যেখানে তারা মুদ্রানীতি কর্মসূচি থেকে লাভের বিপরীতে অলাভজনক ঋণগুলো রাইটঅফ করার অনুমতি দিয়ে ব্যাংকের ব্যালান্স শিট সমন্বয়ে সহায়তা করেছিল। এর বিপরীতে মহামারীর সময়ে প্যানডেমিক ইমার্জেন্সি পাবলিক প্রোগ্রামের (পিইপিপি) সদস্য রাষ্ট্রগুলোর সম্প্রসারণমূলক রাজস্ব নীতি সরাসরি পুনঃঅর্থায়ন তৈরি করেছে। এ প্রক্রিয়া কার্যকর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সিনের মুদ্রা ওভার হ্যাংয়ের ধারণা বা অনুরূপবিষয়ক যুক্তির আর কোনো প্রয়োজন ছিল না।
যেকোনো ক্ষেত্রে অত্যধিক পাবলিক ঋণের প্রভাবের ওপর জোর দিয়ে সিন তার বইটিতে মূল্যস্ফীতির পুনরুজ্জীবনের বিষয়ে সতর্কবাণী দেয়া অন্যান্য সাম্প্রতিক কাজেরও প্রশংসা করেছেন। উদাহরণস্বরূপ ২০২০ সালে লেখা লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকসের চার্লস গুডহার্ট এবং মনোজ প্রধানের বই ‘দ্য গ্রেট ডেমোগ্রাফিক রিভার্সাল’ এ হেড মাইক্রো সম্পর্কে বলা হয়—সামাজিক বার্ধক্য অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে ধীর করবে, পরিবারের সঞ্চয় কমাবে এবং রাজস্বের বোঝা বাড়াবে। কারণ তরুণদের ছোট দলগুলো অবসরপ্রাপ্তদের একটি বড় অংশকে দেখাশোনা করবে। আর এ শক্তিগুলো নিজেরাই মূল্যস্ফীতির চাপ তৈরি করবে এবং বিশ্বায়নের গতিশীলতা কমে যাওয়ার ফলে তাদের মধ্যে সংযোজিত হবে, যেখানে কাঠামোগত উপাদান অপসারণ করা হবে, যা মূল্য হ্রাস করেছিল।
২০১৩ সালে আরেকজন দূরদর্শী যিনি মূল্য সংযম সমাপ্তির ঝলক দেখেছিলেন, তিনি হলেন কুইন মেরি ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনের অধ্যাপক ব্রিগিট গ্রানভিল, তিনি ‘রিমেম্বার ইনফ্লেশন’ বইয়ে লিখেছিলেন, যেখানে ঐতিহাসিকভাবে মূল্যস্ফীতিতে রাজস্ব নীতির ভূমিকার ওপর জোর দেয়া হয়েছিল।
মূল ভিত্তিতে ফিরে আসা
মূল্যস্ফীতির ফিরে আসা থেকে বেশ কয়েকটি শিক্ষা রয়েছে। প্রথমত, মূল্যস্ফীতি একটি সামষ্টিক অর্থনৈতিক ঘটনা। শুধু নির্দিষ্ট মূল্যের উপাদান যেমন জ্বালানির দিকে তাকানোটাই আসলে যথেষ্ট নয়, সেখানে জ্বালানির মূল্য শিগগিরই শীর্ষে পৌঁছে যাবে এমন আশায় সান্ত্বনা নেয়া তো বহু দূরের চিন্তা। দ্বিতীয়ত, আজকের উচ্চমূল্যস্ফীতি খুব কম পরিমাণ পণ্য ও পরিষেবার জন্য অত্যধিক ব্যয়ের ফল হিসেবে এসেছে। যেমন মূল্যস্ফীতি এবার অনেক বাজার অংশগ্রহণকারীর দাবির চেয়েও বেশি স্থায়ী হতে পারে। তৃতীয়ত, মুদ্রানীতি, রাজস্ব নীতি ও আর্থিক স্থিতিশীলতার মধ্যকার আন্তঃসম্পর্ক মূল্যস্ফীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে এবং ঋণের স্থায়িত্ব ও প্রত্যাশাকে গুরুত্বপূর্ণ কারণ করে তোলে। এ শিক্ষা তিনটি ব্যাপক নীতির ওপর প্রভাব রাখে। প্রথমত, বর্তমান উচ্চমূল্যস্ফীতি মোকাবেলার জন্য মুদ্রানীতি সীমাবদ্ধ করা দরকার। দ্বিতীয়ত, মুদ্রানীতির রক্ষণাবেক্ষণের সঙ্গে রাজস্ব নীতি সাংঘর্ষিক হওয়া উচিত নয়। এবং তৃতীয়ত, রাজস্ব নীতিকে অবশ্যই আরো বিশ্বাসযোগ্য এবং টেকসই অবস্থানে ফিরে আসতে হবে। প্রাথমিক উদ্বৃত্ত অর্জনের পথে ফিরে আসা রাজস্বের জন্য স্থান তৈরি করবে এবং বিশ্বাসযোগ্যতা হ্রাস না করে ভবিষ্যতের সংকটের বিরুদ্ধে প্রাথমিক ঘাটতিগুলো মোকাবেলা করার এক ধরনের অনুমতি দেবে।
এ ধরনের নীতিগত পরিবর্তন অবশ্যই কিছুটা ঝুঁকি বহন করবে। আমরা সাম্প্রতিক অবস্থা থেকে বুঝতে পারি যে মুদ্রানীতি ও রাজস্ব নীতির মধ্যে মিথস্ক্রিয়া আর্থিক স্থিতিশীলতা প্রভাবিত করতে পারে। যদিও ব্যাংকগুলো ঝুঁকিমুক্ত সম্পদ হিসেবে প্রচুর পরিমাণ সরকারি বন্ড রাখে, তার পরও স্বল্পমেয়াদি আমানত দীর্ঘমেয়াদি ঋণে পরিণত করার ক্ষেত্রে তারা পরিপক্বতার সঙ্গে জড়িত। যখন সুদহার বৃদ্ধি পায়, তখন সরকারি বন্ডগুলো বাজারমূল্য হারায়। এর ফলে ব্যাংকগুলোর ব্যালান্স শিট রাইটঅফ করা হয়। সুতরাং ব্যাংকগুলোর এ ক্ষতি সামলানোর জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণ রিজার্ভ প্রয়োজন। যদি তা না হয়, তবে ব্যাংকে রান* তৈরি হতে পারে। *(ব্যাংকে রান হচ্ছে এমন একটা অবস্থা যখন ব্যাংক গ্রাহকরা মনে করেন যে নিকট ভবিষ্যতে নির্দিষ্ট কোনো ব্যাংক বন্ধ হয়ে যেতে পারে এবং অনেক গ্রাহক একসঙ্গে ওই ব্যাংক থেকে তাদের আমানত তুলে নেয়)।
এ অবস্থায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক বেলআউট প্রদান করতে অথবা সুদহার বৃদ্ধি স্থগিত করতে বাধ্য হতে পারে। মুদ্রানীতির আর্থিক আধিপত্য তাই মূল্যস্ফীতি অব্যাহত রাখতে ভূমিকা রাখবে। যারা সতর্ক করছে যে অধিক মুদ্রানীতি রক্ষণাবেক্ষণের সংশোধনী ‘কিছু না কিছু ভেঙে ফেলবে’—তাদের কথায় যুক্তি আছে। কিন্তু সে যুক্তি মূল্যস্ফীতির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে শেষ পর্যন্ত বিপরীতমুখী।
[স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট]
লারস পি. ফেল্ড: ইউনিভার্সিটি অব ফ্রেইবার্গের অর্থনীতির অধ্যাপক এবং ওয়াল্টার ইউকেন ইনস্টিটিউটের পরিচালক










