কৃষিপ্রধান বাংলাদেশে কৃষিই অর্থনীতি ও জীবনের চালিকাশক্তি। বর্তমানে জিডিপিতে কৃষির অবদান ১১ দশমিক ২০ শতাংশ এবং এ পেশায় প্রত্যক্ষভাবে প্রায় ৩৭ দশমিক ৯১ শতাংশ (কৃ.শু/১৯) ও পরোক্ষভাবে প্রায় ৭০ শতাংশের অধিক শ্রমশক্তি নিয়োজিত রয়েছে। দেশে শিক্ষিত যুবক ও যুব মহিলা কৃষিকে পেশা এবং উদ্যোক্তা হিসেবে বেছে নিচ্ছে। বিপুল জনসংখ্যার দেশে ক্রমবর্ধিষ্ণু জনগোষ্ঠীর খাদ্য চাহিদা ক্রমহ্রাসমান জমি হতে মেটাতে কৃষি বিরাট অবদান রেখে চলেছে। কৃষি খাতের মধ্যে শস্য একটি উপখাত। শস্যের মৌলিক উপকরণ হলো বীজ, সেচ ও সার। শস্যের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিতে সেচ মুখ্য ভূমিকা পালন করে। আবার সেচের উৎস ভূগর্ভস্থ ও ভূ-উপরিস্থ পানি। বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনে তাপমাত্রা বৃদ্ধি, অতিবৃষ্টি, অনাবৃষ্টি, বন্যা, খরা, মৌসুম পরিবর্তন, ট্রিপিক্যাল সাইক্লোন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, নদীভাঙন ও সমুদ্র উপকূলে লবণাক্ততায় জীবজন্তুর ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলছে। ফলে ভূউপরিস্থ পানির প্রাপ্যতা কমে যাওয়ায় ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ বৃদ্ধি এবং অতিরিক্ত ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনে নিম্নগামিতা ও মরুময়তা প্রকট আকার ধারণ করছে। অন্যদিকে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে কৃষি মৌসুমে ফসলাদিতে সেচের প্রয়োজনীয়তা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে।
বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনে ক্ষতিগ্রস্ত দেশ হিসেবে দুবাইয়ে অনুষ্ঠিত কপ২৮ সম্মেলনে অংশগ্রহণ ও জোরালো ভূমিকা রেখেছে। ওই সম্মেলনে জানানো হয় যে এ শতাব্দীতে বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি সর্বোচ্চ ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে সীমাবদ্ধ রাখতে সঠিক পদক্ষেপ গ্রহণ না করা হলে ২০৫০ সালে এ খাতে গ্রিনহাউজ গ্যাস নিঃসরণ দ্বিগুণ হবে। কপ২৮ সম্মেলনে বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির জন্য জীবাশ্ম জ্বালানিকে দায়ী করা হয়েছে। সম্মেলনে বিশ্বে ২০২৪ সাল থেকে কার্বন নিঃসরণ কমানো শুরু করে ২০৪০ সাল নাগাদ জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার শূন্যের কোটায় নামিয়ে আনা এবং ২০৫০ সাল নাগাদ ব্যবহার বন্ধ করতে হবে বলা হয় (প্রথম আলো, ৬-১২ ডিসেম্বর, ২০২৩)। কপ২৮ সম্মেলনের ঘোষণা অনুযায়ী দেশে সেচকাজে ব্যবহৃত ডিজেলচালিত সেচযন্ত্রগুলো নবায়নযোগ্য শক্তিতে রূপান্তর করা সময়ের দাবি। বিশ্বে নবায়নযোগ্য শক্তিগুলো হলো—সৌর, বায়ু, জলপ্রবাহ, জৈব, ভূতাপ, সমুদ্রতরঙ্গ ও তাপ, জোয়ার-ভাটা, আবর্জনা ও হাইড্রোজেন সেল। এসব নবায়নযোগ্য শক্তির মধ্যে বাংলাদেশে সৌরশক্তির সর্বত্র সহজলভ্য ও প্রাপ্যতা রয়েছে। তাই প্রাথমিকভাবে সেচকাজে সৌরশক্তি ব্যবহার করা যেতে পারে।
দেশের বিশাল জনগোষ্ঠীর প্রধানতম খাদ্য ধান। কৃষির তিনটি মৌসুমেই কমবেশি ধান উৎপাদিত হয়। মোট কৃষিজমির প্রায় ৭৪ শতাংশ ধান চাষ করা হয়। এর মধ্যে রবি মৌসুমে বোরোতে প্রায় ৫৫ শতাংশ চাষ করা হয়। বর্তমানে বোরোতে প্রায় শতভাগ সেচ প্রদান করতে হয়। সারা দেশে ২০২১-২২ সেচ মৌসুমে সেচকাজে বিভিন্ন ধরন ও ক্ষমতার ক্ষেত্রায়িত মোট ১৭ লাখ ১২ হাজার ৫১৫টি সেচযন্ত্রের মধ্যে ১২ লাখ ৪৫ হাজার ৭৫৮টি ডিজেলচালিত সেচযন্ত্র চালু ছিল। ডিজেলচালিত সেচযন্ত্রের মধ্যে ছিল ৮০৪টি গভীর নলকূপ, ১০, ৬০, ৫২৫টি অগভীর নলকূপ ও ১ লাখ ৮৪ হাজার ৪২৯টি শক্তিচালিত পাম্প (সূত্র: বিএডিসির জরিপ প্রতিবেদন)। শুধু সেচ মৌসুমে ডিজেলচালিত সেচযন্ত্রগুলো পরিচালনায় প্রায় আট লাখ টন জীবাশ্ম জ্বালানি (ডিজেল ও মবিল) ব্যবহার হয়েছে। এক গবেষণায় জানা যায়, ছয় কিলোওয়াটের একটি ডিজেল ইঞ্জিন বছরে প্রায় সাত টন কার্বন সৃষ্টি করে (এইচআইআইই-হামবুর্গ, জার্মানি)। ফলে সেচ মৌসুমেই ডিজেলচালিত সেচযন্ত্রগুলো হতে মোট প্রায় ২১ লাখ টন কার্বন ডাই-অক্সাইড বায়ুমণ্ডলে যুক্ত হচ্ছে। যা বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনে দেশ, জাতি ও বিশ্ববাসীর জন্য মারাত্মক হুমকিস্বরূপ। অন্যদিকে বিপুল পরিমাণ জীবাশ্ম জ্বালানি বৈদেশিক মুদ্রায় ক্রয়ে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা প্রতি বছর ব্যয় করতে হয়।
দেশে কৃষিতে আধুনিকায়ন ও যান্ত্রিকীকরণে শস্যবিন্যাসের পরিবর্তন, নিবিড়তা বৃদ্ধিতে একই জমিতে দু-তিন বা চার ফসল চাষ করা হচ্ছে। বাংলাদেশ বন্যাপ্রবণ বিধায় কৃষকরা রবি মৌসুমে বোরো ধান রোপণ জানুয়ারির শেষ পর্যন্ত এবং কর্তন মধ্য মে পর্যন্ত চলে। ফলে মধ্য জানুয়ারি হতে মধ্য এপ্রিল পর্যন্ত সেচ বেশি লাগে। বাংলাদেশ গ্রীষ্মমণ্ডলে অবস্থানের ফলে সৌরতাপ ও আলোর সহজপ্রাপ্যতা রয়েছে। জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত প্রতিদিন প্রায় ১১-১২ ঘণ্টা সূর্যরশ্মির তাপ ও আলো বিরাজমান থাকে। এর মধ্যে ৮ ঘণ্টার অধিককাল সূর্যরশ্মির প্রখর আলোয় ফটোভোল্টিক (পিভি) প্রক্রিয়ায় সৌরবিদ্যুৎ প্রাপ্তির কার্যকারিতা পাওয়ায় যায়। সৌরশক্তিচালিত নলকূপ ও শক্তিচালিত পাম্পগুলো নেট মিটারিং পদ্ধতিতে জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিডে সংযোগের ফলে প্যানেলে উৎপাদিত বিদ্যুৎ গ্রিডে অথবা প্রয়োজনে গ্রিড হতে সেচযন্ত্রে গ্রহণ করা যাবে। এছাড়া সেচ মৌসুমের পর প্যানেলে উৎপাদিত বিদ্যুৎ নেট মিটারিং পদ্ধতিতে সমন্বয়ের মাধ্যমে সেচযন্ত্রের মালিকরা বিদ্যুতের মূল্যপ্রাপ্তিতে দেশের উন্নয়নে ভূমিকা রাখবেন। এক হিসাবে জানা যায়, প্রতিদিন পৃথিবীতে যে পরিমাণ সৌরশক্তি পৌঁছায় তা দিয়ে পুরো পৃথিবীর দুই বছরের বিদ্যুৎ চাহিদা মেটানো সম্ভব। তাই সৃষ্টিকর্তার অশেষ আর্শীবাদে পরিবেশবান্ধব সৌরশক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে সেচযন্ত্র পরিচালনা সাশ্রয়ী হবে।
দেশে ‘সেচকাজে ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবস্থাপনা আইন-২০১৮’ ও এর বিধিমালা-২০১৯ অনুযায়ী ডিজেলচালিত গভীর নলকূপ ও শক্তিচালিত পাম্পের কমান্ড এরিয়া সামঞ্জস্যপূর্ণ থাকলেও অগভীর নলকূপের কমান্ড এরিয়া বিধিমালায় ছয় হেক্টরের স্থলে চাষাবাদ হচ্ছে মাত্র ১ দশমিক ৮৭ হেক্টর। ফলে সেচ খরচ বৃদ্ধি এবং সেচ দক্ষতা ও পানির উৎপাদনশীলতা হ্রাস পাচ্ছে। দেশের অধিকাংশ কৃষক প্রান্তিক, ক্ষুদ্র ও মাঝারি। তাই মাঝারি, ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকের পক্ষে ডিজেলচালিত সেচযন্ত্র সৌরশক্তিতে রূপান্তরের বিপুল পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ করা সম্ভব নয়। এ অবস্থায় সরকারি সহায়তায় ক) প্রথম পর্যায়ে প্রত্যন্ত এলাকায় বিদ্যুৎ সংযোগবিহীন শক্তিচালিত পাম্প সৌরশক্তিতে পরিচালনা করা যেতে পারে। খ) দ্বিতীয় পর্যায়ে ডিজেলচালিত গভীর নলকূপকে সৌরশক্তিতে রূপান্তর করা যেতে পারে। গ) তৃতীয় পর্যায়ে ‘সেচকাজে ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবস্থাপনা বিধিমালা-১৯’ অনুযায়ী ডিজেলচালিত এক-তৃতীয়াংশ অগভীর নলকূপকে সৌরশক্তিতে রূপান্তরান্তে বিধিবহির্ভূতভাবে স্থাপিত অতিরিক্ত দুই-তৃতীয়াংশ নলকূপ উত্তোলন করতে হবে।
উপরোক্ত প্রযুক্তিতে ডিজেলচালিত সেচযন্ত্রগুলোকে শূন্য দশমিক ৫০ কিউসেক (১০ দশমিক ৬ কি.ও.) ও ১ কিউসেক (১৬ দশমিক ২ কি.ও.) সৌরশক্তিতে রূপান্তরে প্রায় ৯০ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হবে। অন্যদিকে সেচযন্ত্রগুলোয় ব্যবহৃতব্য আট টন ডিজেল ও মবিল ক্রয়ে প্রায় ১০ হাজার কোটি এবং সেচযন্ত্র অপারেটর ভাতা বাবদ প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা সাশ্রয় হবে। এছাড়া নেট মিটারিং সিস্টেম হতে প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকা আয় হবে। সর্বোপরি সৌরশক্তি পরিবেশবান্ধব এবং দেশ কার্বন দূষণের ক্ষয়ক্ষতি হতে মুক্তি পাবে। আগামী পাঁচ বছরে বিনিয়োগকৃত অর্থপ্রাপ্তি ঘটবে (সূত্র: বিএডিসি)।
দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতার প্রায় ৯৬ শতাংশ জীবাশ্ম জ্বালানি (ডিজেল, প্রাকৃতিক গ্যাস, এলএনজি, কয়লা, ফার্নেস অয়েল) এবং ৪ দশমিক ৩ শতাংশ নবায়নযোগ্য শক্তির ওপর নির্ভরশীল। দেশে প্রায় ১ হাজার ১৯৫ মেগাওয়াট নবায়নযোগ্য শক্তি উৎপাদন হচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় নবায়নযোগ্য শক্তি উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ২০৩০ নাগাদ ৩০ শতাংশ ও ২০৪১ সাল নাগাদ ৪০ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের যুগে মুক্তবাজার অর্থনীতিতে বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে উৎপাদন ক্ষমতা ও প্রযুক্তির আধুনিক কলাকৌশল উন্নয়ন অনস্বীকার্য। তাই দ্রুত বর্ণিত কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসরণ হতে পরিত্রাণের নিমিত্ত বিপুলসংখ্যক ডিজেলচালিত সেচযন্ত্র নবায়নযোগ্য সৌরশক্তিতে রূপান্তর হলে কার্বন নিঃসরণ বন্ধ হবে। অন্যদিকে পরিবেশের উন্নয়নে ব্যাপক অবদান রাখবে এবং পাশাপাশি ফসলের উৎপাদনশীলতা ও সেচ খরচ শূন্যের কোটায় নেমে আসবে। তাই কার্বন নিঃসরণমুক্ত ও পরিবেশবান্ধব নবায়নযোগ্য শক্তি টেকসই জ্বালানি নিরাপত্তায় কার্যকরী ভূমিকা রাখবে। এ অবস্থায় জীবাশ্ম জ্বালানি নির্গমন শোষণে কার্বন নিয়ন্ত্রণ ও সংরক্ষণ প্রযুক্তি গ্রহণ করতে হবে।
মো. জিয়াউল হক: অবসরপ্রাপ্ত সদস্য পরিচালক (ক্ষুদ্র সেচ) বিএডিসি










